অটোয়ায় শুদ্ধ রাজনীতিক আ ফ ম মাহবুবুল হকের স্মরণসভা

22

নতুনদেশ ডটকম: শুদ্ধ রাজনীতিক আ ফ ম মাহবুবুল হক তাঁর আদর্শিক এবং নৈতিক রাজনীতি চর্চার কারণেই চিরদিন অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন। শুদ্ধ রাজনীতি চর্চায় তার নাম আলোকবর্তিকা হয়ে ইতিহাসে উজ্জল থাকবে।
গত শনিবার কানাডার রাজধানী অটোয়ায় আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা এই মন্তব্য করেন। অটোয়ায় বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলা ক্যারাবানের উদ্যোগে এই স্মরনণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা একাডেমী পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ বখত, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক, মুক্তিযোদ্ধা এবং বন্ধু ফারুক হোসেন, সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন মুকুল, সাবেক ছাত্রনেতা আবু হাসান কাসেম, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও খালাতো ভাই মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়া। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রয়াত আ ফ ম মাহবুবুল হকের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও স্ত্রী কামরুন্নাহার, একমাত্র কন্যা উৎপলা ক্রান্তি এবং জামাতা মোহাম্মদ কায়েসুর রহমান। ‘অটোয়া সিটিজেন’ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সামগ্রিক অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টরন্টো থেকে প্রকাশিত ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক শওগাত আলী সাগর।
প্রসঙ্গত, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক-বাহক, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর আহ্বায়ক আ ফ ম মাহবুবুল হক গত ৯ই নভেম্বর, ২০১৭ বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১১-০৭ মিনিটের সময় অটোয়া সিভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে স্মরণসভা শুরু হয়। প্রথমেই প্রয়াত আ ফ ম মাহবুবুল হক ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। অটোয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী টরন্টো, মন্ট্রিয়ল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই স্মরণসভায় যোগ দেন।
মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ বখত দেরাদুনে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আ ফ ম মাহবুবুল হক সেখানে সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিদিনকার অস্ত্রচালনা এবং যুদ্ধের সামরিক কৌশল প্রশিক্ষণের বাইরেও রাতে ৩/৪ ঘন্টা করে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি বলেন, কেবল অস্ত্র চালনা করতে পারাই একজন যোদ্ধার জন্য যথেষ্ট নয়, তার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং চেতনা থাকতে হয়। আ ফ ম মাহবুবুল হক মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনায় রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হোসেন বলেন, আ ফ ম মাহবুবুল হক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষক। তিনি আজীবন বিপ্লবী। দেশের শোষিত মানুষকে ভালোবেসে তাদের মুক্তির জন্য তিনি রাজনীতি করেছেন। আমৃত্যু তিনি শোষিত মানুষের রাজনীতিতেই নিজেকে মগ্ন রেখেছেন। তাঁর মৃত্যু, সুস্থধারার আদর্শিক রাজনীতির জন্য বড় ক্ষতি।
সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন মুকুল বলেন, আ ফ ম মাহবুবুল হককে বিভিন্ন সময় মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। বারবারই তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সর্বশেষ জঙ্গী হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকে তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন।
সাবেক ছাত্রনেতা মুকুল বলেন, আমরা স্পষ্ট করেই দাবি করেছিলাম- আ ফ ম মাহবুবুল হককে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলার তদন্ত হউক, অপরাধীদের খুঁজে বের করা হউক। কিন্তু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আদর্শিক রাজনীতিকের হত্যা প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশে বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।
একমাত্র কন্যা উৎপলা ক্রান্তি বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, বাবা সব সময় আদর্শিকভাবে বড় হওয়ার দিকেই গুরুত্ব দিতেন। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো বলে তিনি একমাত্র মেয়ের নামও রেখেছিলেন বাংলায়। উৎপলা ক্রান্তি বলেন, নিজে সব পরীক্ষায় মেধা তালিকায় থাকলেও ছোটবেলা থেকেই বাবা শিখিয়েছেন সার্টিফিকেটের চেয়েও ভালো মানুষ হওয়াটা জরুরি।
জামাতা কায়েছ বলেন, ‘বাবার তো একা একা চলাফেরা করতে অসুবিধা হতো। তাই তাঁকে দেখাশুনার জন্যে বাসায় নার্স আসতো। বাবা যখন খেতে বসতেন তখন তাদেরকেও খেতে ডাকতেন। বাবার কড়া নির্দেশ ছিল প্রতিদিন নার্সদেরকে খেতে দিতে হবে বিশেষ করে সব সময় চা দিতে হবে’।
আ. ফ. ম মাহবুবুল হকের জীবনসঙ্গীনী কামরুন নাহার বেবী আ ফ ম মাহবুবুল হকের সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে নেওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় রমনা পার্কে কতিপয় অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতিকারীদের হামলার শিকার হন। হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তার স্টাফদের কথা অনুযায়ী, ‘এটা কোন গাড়ি চাপা ছিল না, কোনও ছিনতাইও ছিল না। মাথায় একটি আঘাত ছাড়া শরীরের আর কোথায়ও কোন আঘাত এর চিহ্নই ছিল না’।
তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে তিনি ফোনে বলেছেন- ওরা মেরে গেছে।’ এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আ. ফ. ম মাহবুবুল হককে হত্যা করার জন্যেই সেদিন সেই হামলা করা হয়েছিল।
সভাপতির বক্তৃতায় শিশু সাহিত্যক, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন বলেন, দুর্বৃত্তায়িত এবং কলুষিত রাজনীতির এই কালে আ. ফ. ম. মাহবুবুল হকের মতো শুদ্ধ এবং আদর্শিক রাজনীতিকের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তিনি না ফেরার দেশে চলে গিয়েও তার কর্ম, আদর্শ এবং নৈতিকতা ও শুদ্ধ রাজনীতি চর্চ্যার জন্যই মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শেয়ার করুন