জলের ভাষায় বাংলার সুর কানাডায়

16

গাউস রহমান পিয়াস : রক্তলাল চারটি খুঁটির এক ছাউনি। একজন মানুষ একটি খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, খুঁটির লাল রং যেন একুশের রক্তদানেরই প্রতীক। তিনি চোখ বন্ধ রেখেই আঙুল বুুলিয়ে পড়ে যান : ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ফর দি এম্পটি মাউথ হোয়াট ড্রিমস আর ফর ক্লোজড আইজ- নির্বাক মুখের জন্যই ভাষা, যার স্বপ্ন দেখে নিমীলিত চোখ। লাঠিতে ভর দিয়ে এরপর তিনি এগিয়ে যান আরেকটি খুঁটির কাছে। ‘ভাষা এমন এক শহর, যা গড়ার সময় প্রতিটি মানুষ একটি করে পাথর বয়ে এনেছে।’ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষটি ব্রেইলি হরফের বিন্দু ছুঁয়ে ছুঁয়ে এবার পড়েন রালফ ওয়ালডো ইমারসনের লেখা এই লাইন।
দৃশ্যটি সাজানো; কিন্তু অবান্তর নয়। কানাডার লিঙ্গুয়া আকুয়া নামের ভাষাসৌধ এ রকম অদ্ভুতভাবেই মানুষের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক মূর্ত করেছে। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী এই স্থাপত্যের কাছে দাঁড়িয়ে আবেগে ভাসে। আর বছরে একটি দিন বিয়ার ক্রিক পার্ক গার্ডেনে সৌধটিকে ঘিরে ভিড় জমে যায়। এদিন পার্কের ধূলিকণা ছুঁয়ে এগিয়ে যায় উন্মুক্ত পায়ের সারি। সুদূর আটলান্টিকের ওপারে সারে নগরীর এক বাগানে সম্মিলিত গলায় শোনা যায় করুণ সুর : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?।
কানাডার রাষ্ট্রীয় অর্থায়নেই এই ভাষাসৌধ নির্মিত হয়েছে। মাতৃভাষা মনুমেন্টটি নির্মাণশৈলীতে উত্তরাধুনিক; আবেগে বহুমাত্রিক। সব ভাষার প্রতিনিধিত্ব করলেও এর শিকড় বাংলাদেশে। ২০০৮ সালে সারে সিটির পাবলিক অ্যান্ড কমিউনিটি আর্ট বিভাগের ‘লিঙ্গুয়া আকুয়া’ প্রকাশনায় বলা হয়, ‘দ্য সিটি অব সারে কমিশন্ড দিস আর্টওয়ার্ক অ্যাজ এ ট্রিবিউট টু মাদার ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড ইন রিকগনিশন অব ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’—মাতৃভাষাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে স্বীকৃতি দিতেই আমাদের এই ‘জলের ভাষা’ শিল্পকর্ম।
লাতিনে লিঙ্গুয়া অর্থ ভাষা; আর আকুয়া জল। ভাষার সঙ্গে আমাদের প্রথম সম্পর্ক ঘটে জন্মেরও আগে। এ জন্যই এমন নাম। ওয়াল্টার মার্চ লেখেন, ‘মায়ের পেটে যখন বয়স সাড়ে চার মাস, আমরা প্রথম শুনতে শুরু করি। তার পর থেকে মৃদু শব্দতরঙ্গে আমাদের স্নানবিলাস চলে প্রতিনিয়ত, অবিরত। মায়ের গলার স্বরের সংগীত, তার নিঃশ্বাসের মৃদু ঝাঁকুনি, তলপেটের কাঁপন, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক—একের পর এক শব্দ আমাদের শ্রবণযন্ত্রে আলতোভাবে ছুঁয়ে যায়।’ ভাষার সঙ্গে মানুষের এই যে প্রথম পরিচয়, তা-ই তুলে ধরা হয়েছে লিঙ্গুয়া আকুয়ার স্থাপত্যে, নকশায়, শব্দে, জলের মিলিত ঐকতানে। এর পানি গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ যেন সেই মধুর সংগীত, যা শিশু তার মাতৃগর্ভের জলে ভেসে ভেসে শুনেছিল। সৌধে আছে ঊর্ধ্বমুখী জলের ফোয়ারা, যা মানুষের কথা বলার প্রতীক। এর নির্মাণশৈলী এমন—দর্শনার্থীরা পাশে দাঁড়ালে চৌবাচ্চায় প্রতিফলিত হয় তার নান্দনিক ছবি। চৌবাচ্চার জলের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করছে সিঙ্গেল চ্যানেলের ভিডিও এবং চার চ্যানেলের অডিও। বর্তমানে বাংলাসহ অনেক ভাষা বাজে এই জলে, জলচিত্রে। ছাউনিটি দাঁড়ানো যে চারটি খুঁটিতে—দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সেগুলো লেখা হয়েছে ব্রেইলি হরফে ভাষাবিষয়ক উক্তি। ব্রেইলি হরফ মানেই অসংখ্য ছিদ্রের সমাহার। খুঁটির এসব ছিদ্র দিয়ে ভেসে আসে বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ। ওপরের ছাউনিটি কাচের। এটিও বাংলাসহ পৃথিবীর চলমান ও বিলুপ্ত ভাষাগুলোর অক্ষর দিয়ে সাজানো। যেমন একুশের মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী এই সৌধ। এটি পৃথিবীর সব সংস্কৃতি ও ভাষার বিলুপ্তি রোধে দৃশ্যমান চেতনা হয়ে আছে। কানাডায় অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের অলিম্পিকের ১০টি ট্যুরিস্ট স্পটের একটি ছিল এই লিঙ্গুয়া আকুয়া। কানাডার এক দল শিল্পী গড়েছেন এই জলের ভাষা। তবে এর স্বপ্নদ্রষ্টা কানাডাপ্রবাসী একজন বাংলাদেশি, আমিনুল ইসলাম মাওলা। নির্মাণের নেতৃত্ব দিয়েছেন আমিনুল। তবে তাঁর স্বপ্নপূরণের সারথি ছিল অনেকে। জানা যায়, আন্তর্জাতিক মাত্রভাষা দিবসের রূপকার আব্দুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম একুশে পদক প্রাপ্তির সঙ্গে যে প্রাইজ মানি পেয়েছিলেন, তা দান করে দেন এই স্মারক নির্মাণ তহবিলে। কিন্তু দরকার তো অনেক অর্থ। সারে সিটি ২০০৮ সালের জন্য কানাডার কালচারাল ক্যাপিটাল ঘোষিত হয়। এ উপলক্ষে স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার জন্য আট লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হলো। সারে আর্ট কাউন্সিলের প্রধান শিলা ম্যাককিন আমিনুলকে এই বরাদ্দ থেকে প্রয়োজনীয় এক লাখ ৩০ হাজার ডলার সংগ্রহের পরামর্শ দেন। সারে সিটি বিমুখ করেনি। দীর্ঘ অভিযাত্রা অন্তে ২০০৯ সালের ১১ জুলাই উদ্বোধন করা হয় কানাডার প্রথম মাতৃভাষা মনুমেন্টের। স্থানীয় এমপি ডোনা কাডমান, সারে সিটি কাউন্সিলর জুডি এ ভিলেনি, শিল্পী মাইকেল ফিলিমোউইকজের সঙ্গে ঐতিহাসিক মুহূর্তটিতে উপস্থিত ছিলেন আব্দুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর বাংলাদেশের একার হয়ে নেই। এই দিনে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মাতৃভাষা দিবস। যেখানে বাঙালি, সেখানেই বাংলা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অর্জনের পর গর্বের সঙ্গে বলাই যায়, বাংলা ভাষার কোনো সূর্যাস্ত নেই।

শেয়ার করুন