বিএলআরসি’র লেখক আড্ডায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভ‚ত কানাডীয় ঔপন্যাসিক আরিফ আনোয়ার

25
বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) আয়োজিত লেখক-আড্ডায় এপ্রিলের অতিথি ছিলেন হারপারকলিন্স, কানাডা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টর্ম’ উপন্যাসের লেখক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরিফ আনোয়ার (ডানে)। বামে উপবিষ্ট অদিতি জহির, অন্যন্যা ঐশ্বর্য রাফা এবং প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক তাসমিনা খান।

মানজু মান আরা: গত ৭ এপ্রিল টরন্টোর আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) আয়োজিত বছরব্যাপী ইংরেজিতে বাংলা সাহিত্যের বইপড়া প্রকল্পের অতিথি ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় ঔপন্যাসিক আরিফ আনোয়ার। উল্লেখ করা যেতে পারে কানাডার প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা হারপারকলিন্স থেকে এই মার্চ মাসেই প্রকাশিত হয়েছে আরিফের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য স্টর্ম’। একজন আমেরিকা-প্রবাসী বাংলাদেশির দেশে ফিরে যাবার যন্ত্রণার কথা রয়েছে বইটিতে। আরও রয়েছে ১৯৭০ সালে ভোলার প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের কথা। স্মরণ করা যেতে পারে, আরিফের কথা শুনতে ও পরিচিতি হতে এদিন মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরী, কবি ইকবাল হাসানসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবি, লেখক এবং বিশিষ্ট জন।
শুরুতে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক তাসমিনা খানের সূচনা বক্তব্যের পর মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া হয় অন্যন্যা ঐশ^র্য রাফার হাতে। রাফা চমৎকারভাবে ঔপন্যাসিকের পরিচয় তুলে ধরেন শ্রোতা-দর্শকদের সামনে। তার কথায় ওঠে আসে তার লেখক-জীবন ইতিহাস এবং প্রকাশনার বর্ণনা। রাফার উপস্থাপনা থেকে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা ঔপন্যাসিক ও তাঁর উপন্যাস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন।
এরপর পরই শুরু হয় লেখক আরিফ আনোয়ারের সাথে আড্ডা পর্ব। আড্ডা পর্বটি দু’ভাগে ভাগে বিভক্ত ছিল: প্রথম ভাগে অদিতি জহির লেখককে নির্ধারিত কিছু প্রশ্ন করেন এবং পরবর্তীকালে দর্শকদের মধ্য থেকে লেখককে উন্মুক্ত প্রশ্ন করা হয়।
বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানান তার লেখক জীবনের প্রারম্ভিক ইতিহাস এবং আগ্রহের বিষয়গুলি। তার ‘দ্য স্টর্ম’ বইটির বিষয়বস্তু এবং এর বিভিন্ন চরিত্রগুলি প্রসঙ্গে তিনি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশিদের বিশে^র বাজারে সমাদৃত করার জন্য তিনি তার লেখার মাধ্যমে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষার জন্য বিশেষভাবে গর্ব বোধ করেন। তার কথায় উঠে আসে কিছু উপদেশ যা, লেখকদের জন্য পথ প্রদর্শক হয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, ভাল লেখক হতে হলে প্রচুর পড়তে হবে, লিখতে হবে এবং নিজের লেখাকে ভালোবাসতে হবে।
আরিফ নিজের জীবনে উৎসাহী প্রদানকারী কিছু লেখকদের নামও তুলে ধরেন। জানা যায়, ঝুম্পা লাহিড়ী, হুমায়ূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ইমদাদুল হক মিলন তাঁর প্রিয় লেখকদের কয়েকজন। আরও জানা যায়, আরিফ পড়তে খুব ভালোবাসেন এবং এ ভালোবাসা তাকে লেখক হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। এছাড়া তিনি তার পারিবারিক অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। তাকে পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধব থেকে লেখালেখির ব্যপারে অনেক উৎসাহ দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারছেন।
দর্শক সারি থেকে যারা প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেন তারা হচ্ছেন: কবি ইকবাল হাসান, মৌ মধুবন্তী, সাঈদ এম. হাসান, মানজু মান আরা, কাজী জহির, সুরজিৎ রায় মজুমদার, সুজিত কুমার পাল প্রমুখ।
দর্শকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঔপন্যাসিক আরিফ বলেন, লেখকদের উচিৎ লেখা ছাপানোর জন্য প্রকাশক খুঁজে বের করা। কারণ তাদের সাথে বিভিন্ন বড়ো বড়ো বইয়ের দোকানগুলোর সাথে যোগাযোগ থাকে। এর ফলে লেখকের বইয়ের প্রচার এবং প্রসার বাড়ে।
লেখকদের লেখক ফোরামে যোগদানের কথা বলেন যাতে করে তারা তাদের লেখা সম্পর্কে গঠনমূলক মতামত বা প্রতিক্রিয়া পেতে পারেন এবং লেখাকে আরো বেশি শাণিত করতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি ইউঅফটি’র রাইটিং কোর্সে অংশগ্রহণের পরামর্শও দেন। এছাড়া বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি তার বইয়ের বাংলা অনুবাদের ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে জানান যে, তিনি ভবিষ্যতে এর অনুবাদ করার আশা রাখেন এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন।
ভ‚মিকা বক্তব্যে তাসমিনা খান বিএলআরসি’র পরিচিতি, বইপড়া প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং নিয়ম কানুন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রতি মাসের প্রথম শনিবার সকাল ১১টায় একজন করে কানাডিয়ান সাহিত্যিক উপস্থিত থাকছেন এই বিএলআরসি-র লেখক-আড্ডায়। তাসমিনা তার উপস্থাপনায় বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ায় উৎসাহী করা এবং বাংলা সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার স্বপ্ন নিয়ে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিএলআরসি। এটি মূলতঃ এক বছরের প্রকল্প এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে শুধু ১৪ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা এ বইপড়া প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে। তারা সারাবছর বইপড়া শেষে আগামী আগস্ট মাসে বাংলা সাহিত্য বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লিখে জমা দেবে। যার মধ্য থেকে ১০ জনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারকারীকে পুরস্কৃত করা হবে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার শেষ সময় ১৭ আগস্ট, ২০১৮।
জানা যায়, আমেরিকা-প্রবাসী চিকিৎসক ও দার্শনিক দেবাশিস মৃধার আর্থিক সহযোগিতায় আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতি মাসের প্রথম শনিবার চলবে বই নেওয়া এবং দেওয়ার এ কার্যক্রম। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে। বিএলআরসি কর্তৃক সংগৃহীত বইয়ের তালিকায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, নাসরীন জাহান প্রমুখ রচিত ২৯০টি গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণ। আরও আছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জীবনী গ্রন্থও। আছে লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিমের রচনাসমগ্র। এছাড়া রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদজননী জাহানারা ইমামের গ্রন্থও।

শেয়ার করুন