শহীদ মিনারের ডিজাইন পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়

10

টরণ্টো: প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা, আপনারা আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। “Let every city of Canada be proud to have a Mother Language Monument.” “মাতৃভাষা শহীদ মিনার হয়ে উঠুক কানাডার প্রতিটি মহানগরীর অহংকার।” এই স্লোগানকে সামনে নিয়েই এগিয়ে চলেছে Mother Language Monuments of Canada. আপনারা সবাই জানেন, গত ২১ ফেব্রুয়ারি এই সংগঠনের উদ্যোগেই শপার্স ওয়ার্লড প্রাঙ্গনে পালিত হলো মহান একুশের ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনের কর্মসূচী। দিবসের প্রথম প্রহরে যোগ দিয়েছিলেন টরণ্টো মহানগরীর মেয়র জন টোরি, কানাডা-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারী গ্রুপের চেয়ার, নাথানিয়েল আর্সকাইন-স্মিথসহ শ্রদ্ধা নিবেদনে হাজারো মানুষ। ফ্রিজিং রেইন এর বৈরী আবহাওয়া হার মেনেছিল হৃদয়ের উষ্ণতার কাছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ALBION নির্মিত শহীদ মিনার দৃষ্টি কেড়েছিল সবার। কণ্ঠে ছিল একুশের গান, হাতে পুষ্পার্ঘ।
টরণ্টো মহানগরীতে ১৭০ টি ভাষার দু’শতাধিক কমিউনিটির বসবাস থাকলেও একুশ উদযাপনে বাংলাদেশীরাই অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে থাকেন। সন্দেহ নেই, সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক এই দিবসের আবেদন যেমন বাড়বে, তেমনি অংশগ্রহণও বেড়ে যাবে বহুগুন। শতাধিক কমিউনিটির অংশগ্রহণে মহান একুশ একদিন মানবসভ্যতাকেই এগিয়ে দেবে অনেকটা পথ। আমরা চাই টরণ্টোর শহীদ মিনার হবে এই মহানগরীর অন্যতম ল্যান্ডমার্ক। বহুসংস্কৃতি এবং বহুভাষার এই দেশে মাতৃভাষা শহীদ মিনার নির্মাণের দায়িত্ব কেবল একক কোন কমিউনিটির নয়, এটা প্রতিষ্ঠার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। মিউনিসিপাল সরকারের তহবিল না থাকলে দায়িত্ব নেবে প্রাদেশিক কিংবা ফেডারেল সরকার। একটি পকেট কমিটি দিয়ে এরকম একটি মহৎ উদ্যোগ কখনোই সফল হতে পারে না। প্রয়োজন একাধিক কমিউনিটির সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। এছাড়া কেবলমাত্র একটি দিবস পালনকে কেন্দ্র করে একটি শহীদ মিনার নির্মান অর্থহীন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষা শহীদ মিনার হচ্ছে-মানবাধিকারের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রতীক, বাকস্বাধীনতার প্রতীক, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রতীক, সাম্য এবং সমঅধিকারের প্রতীক। এই মিনার কেবলই কোন দিন উদযাপনের জন্য নয়, যারা এটাকে ডে মনুমেন্ট বিবেচনা করেন, তাঁরা এই শহীদ মিনারের চেতনা সম্পর্কে সামান্যতম ধারণাও রাখেন না।
এই শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে বহু ভাষার লাইব্রেরি, ভাষা নিয়ে গবেষনা করবেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। বহু ভাষার সাংস্কৃতিক উৎসব হবে বছরব্যাপী, চলবে বইমেলা, চলচিত্র উৎসব, সেমিনার ইত্যাদি। এক কথায় কানাডার মাল্টিকালচারালিজমকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে। সুতরাং এই শহীদ মিনার কেবলমাত্র এক দিনের পুষ্পার্ঘ অর্পণের কোন স্থান নয়, এটি মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার এক অনন্যসাধারন প্রতীক।
সাংবাদিক বন্ধুরা, আপনারা জানেন, শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রাহমান ছিলেন একজন বাংলাদেশী কানাডিয়ান। তাঁর নকসা পরিবর্তনের অধিকার কারো নেই। কারন এটি একটি শিল্পকর্ম। হামিদুর রাহমান নিজেই বলেছেন, “এই মিনারের ডিজাইন সহজ করা হয়েছে যাতে এটিকে অনুকরণ করে দেশের অন্যত্রও নির্মান করা যায়। আকার বড় ছোট হতেই পারে।” ডিজাইন পরিবর্তনের অধিকার তিনি কাউকে দেন নি।
কেউ যদি দাবী করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত শহীদ মিনারের ডিজাইন আলাদা, সেসব হয়েছে অর্থনৈতিক এবং অসতর্কতার কারনে। একুশ তখন আন্তর্জাতিক মর্যাদাও পায়নি। এখন স্থান-কাল এবং পাত্রের পরিবর্তন হয়েছে। একুশ একসময় ছিল কেবল বাঙ্গালীর আজ তা বিশ্ব-সম্প্রদায়ের। ছিল কেবল বাংলার, আজ হাজার ভাষার। এই সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। ভুল সিদ্ধান্ত কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

শেয়ার করুন