“সুরের ধারা-৬”- যা থাকছে, থাকছে না

50

সাজ্জাদ আলী

“জঞ্জালময় তথাকথিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো আমাদের টানে না, শুধুই শব্দ-সর্বস্ব মনে হয়। এর মাঝে আপনাদের সুরের ধারাতে যেন প্রাণ খুঁজে পাই।” এ কথাটুক ক’দিন আগে আমার ইনবক্সে লিখে পাঠিয়েছেন ফেসবুক বন্ধু তৌহিদ জামান। তিনি বলছিলেন বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র ধারাবাহিক মঞ্চ-সংগীতায়োজন “সুরের ধারা” নিয়ে। টরন্টোতে মি: জামান সুরের ধারা’র একাধিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন বলেই জানি। আবার কবে নাগাদ এই সিরিজের পরবর্তী অনুষ্ঠানটি হবে, সেই খোঁজ নেবার উদ্দেশ্যেই তাঁর এই নোটটি লেখা।
বাংলা টিভি’র সুরের ধারা নিয়ে শ্রোতা তৌহিদ জামানের এ আগ্রহ ও মন্তব্যটি বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখছি না। বরং নির্দিষ্ট একটি শ্রোতা-গোষ্ঠির মনের কথাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। প্রশ্ন আসে এই “শ্রোতাগোষ্ঠি” কারা, এদের স্বরূপটি কি? শ্রোতা হিসেবে তাদের চাহিদাটাই বা কি? এ সম্পর্কিত আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এরা নিরিবিলি পরিবেশে খানিকক্ষণ গান শুনতে চান। গানটি যেন সুরে হয়, তালে থাকে, শ্রবণে চিত্ত যেন বিনোদিত হয়, মনন যেন আন্দোলিত হয়- একটি গানের অনুষ্ঠান থেকে এ রকম খুবই সাধারণ চাওয়া ওদের।


আর গান শোনার ‘পরিবেশ’ নিয়েও ওদের চাওয়াটা তেমন বেশি কিছু নয়। ওরা চান পাশে উপবিষ্ট সহ-শ্রোতাও যেন মন দিয়ে গানটি শোনেন। কেউ একজন তন্ময় হয়ে গান শুনছেন, আর তার পাশের শ্রোতা (!) ফোনটি হাতে নিয়ে টেক্সট পাঠাচ্ছেন বা ছবি তুলছেন অথবা নিচু স্বরে কথা বলছেন! কিংবা ঘুমের ঝিমটি কাটছেন! গানের আসরের জন্য এ বড়ই অনভিপ্রেৎ পরিবেশ। এহেন অমনোযোগী শ্রোতা প্রকৃত শ্রোতাদের জন্য বিরক্তির কারণ বৈকি!
“বোদ্ধা শ্রোতা” শব্দযুগল নিয়ে যথেষ্ট তর্কের সুযোগ রয়েছে। কে বোদ্ধা, আর কে নন? বোধের বিষয়টি কি হওয়া উচিত, ইত্যাদি বহু প্রশ্ন তর্কে আসতে পারে। কেউ হয়তো লঘু সংগীত মন প্রাণ উজাড় করে দিয়ে শোনেন, কিন্তু উচ্চাঙ্গ সংগীত তার ধাতে সয় না। কোন শ্রোতার হয়তো তাল ও মাত্রা জ্ঞান প্রখর। গানের সাথে সাথে তালের মাত্রাগুলো আঙ্গুলের কর গুণেগুণে যাচাই করে নেন। শ্রোতা হিসেবে কারো বা কান শতভাগ তৈরি। গাইবার সময় শিল্পীর কন্ঠ সামান্যতম সুরচ্যুত হলেই তার কান ঝালাপালা করে উঠে। এ রকম আরো বহু বিচিত্র বিভাজনে বিভাজিত শ্রোতাগোষ্ঠি।
তো ‘বোদ্ধা’ হিসেবে আমরা কাকে রাখবো, বা কে বাতিল হবেন? আবার কাউলে বাতিল বা গ্রহণ করার অথোরিটিই বা কাকে কে দেবে? আসলে গান শোনার ক্ষেত্রে “শ্রবণ” আর “মনোসংযোগ” এই শব্দযুগল একটি আরেকটির পরিপূরক। মন দিয়ে না শুনে তো আর শ্রোতা বনে যাওয়া যায় না। আমি বলবো সংগীতকে যাঁরা যেভাবেই চুলচিরে শোনেন, তারা প্রত্যেকেই কোন না কোন বিবেচনায় ‘বোদ্ধা’। তাদের অন্তরের অন্তস্থলে সংগীত অনুরণন সৃষ্টি করে। সংগীত তাদের আগ্রহের জায়গা, এটাই মোদ্দা কথা।
পরিশীলিত এই শ্রোতৃমন্ডলীর কথা বিবেচনায় রেখে বাংলা টেলিভিশন কানাডা সুরের ধারা সিরিজের অনুষ্ঠানগুলো আয়োজন করে থাকে। বিগত বছরগুলোতে বাংলা টিভি’র পর্দায় দর্শকদের গান শুনিয়েছেন, এমন শিল্পীদের মধ্য থেকে যোগ্যতমদেরই পর্যায়ক্রমে আমরা সুরের ধারায় গাইবার জন্য নির্বাচন করে থাকি। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে (এখনও) সম্পৃক্ত নন, এমন কাউকে আমরা সুরের ধারার মঞ্চে তুলি না। এমনকি বিদেশ থেকে শিল্পী এনে (বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলা) আমরা অনুষ্ঠান আয়োজনও করি না। অমন আয়োজকদের কোন ঘাটতি নেই টরন্টো শহরে। আমাদের কর্ম পরিসর স্থানীয় মেধাবীশিল্পীদের নিয়েই। সুরের ধারা সিরিজের বিগত পাঁচটি অনুষ্ঠান তার সাক্ষ্য বহন করে।
আসছে নভেম্বরের ১৮ তারিখে টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে “সুরের ধারা-৬” অনুষ্ঠানটি। এই আসরটিকে নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে সাজানো হবে, এটিই বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নীতিগত সিদ্ধান্ত। একটি সংগীতানুষ্ঠানকে সার্থক রূপ দিতে বেশ কয়েকটি কার্যকারণের সফল সমন্বয় ঘটাতে হয়। তারমধ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কারণ তিনটি। (১) শিল্পী নির্বাচন, অর্থাৎ কে গাইবেন এবং কি গাইবেন। মোটাদাগে কাকে দিয়ে কি গাওয়ানো হবে। (২) সে গানগুলো কারা শুনতে আসবেন? অর্থাৎ যে ধরণের গান পরিবেশিত হবে, উপস্থিত শ্রোতাদের পছন্দের সাথে তা যায় কিনা? (৩) আয়োজকদের মানসিকতার নান্দনিক দিক এবং অনুষ্ঠান সংগঠনের দক্ষতা ও নেপথ্য সমন্বয়।
প্রত্যাহিক “গানের চর্চ্চা” করছেন এবং গাইবার “প্রেজেন্ট ফর্ম”-এই দুটো বিষয়ই শিল্পী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমাদের কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সূচক। আর এ সূচকগুলোকে তুষ্ট রাখে, টরন্টোতে এমন বন্ধু-শিল্পীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের মধ্য থেকে চূড়ান্ত বিবেচনায় এবারের সুরের ধারা-৬ অনুষ্ঠানের জন্য আমরা তিনজন শিল্পীকে নির্বাচন করেছি। পন্ডিৎ প্রসেনজীৎ দেওঘরীয়া গাইবেন নজরুলগীতি, আর মোনালিসা চৌধুরী ও শাহজাহান কামাল গাইবেন রবীন্দ্রনাথের গান। নির্বাচিত এই শিল্পীদের প্রত্যেকেরই এ ধরণের গান গাইবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নিয়মিত চর্চ্চা রয়েছে। তাঁদের সকলেরই গাইবার দক্ষতা ও শ্রোতার মনকে পরিতৃপ্ত রাখবার সক্ষমতা প্রশ্নাতীত।
শিল্পী ভাল গাইছেন, যন্ত্রীরাও ভাল বাজাচ্ছেন- তো পূরণ হলো প্রথম শর্ত। কিন্তু দ্বিতীয় শর্তটি পুরণ না হলে, অর্থাৎ শ্রোতা মনোযোগী না হলে, শিল্পীর গায়ন মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। শিল্পী ও শ্রোতা একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছাড়া নয়, এদের চলন রেখা সমান্তরাল হওয়া চাইই। শিল্পীর গায়ন যদি শ্রোতার মননে গুঞ্জন না তোলে, তো সে গান গানই নয়। আবার শ্রোতা অমনোযোগী হলে শিল্পী কিছুতেই গেয়ে উঠতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে বহুল শ্রæত সেই রবীন্দ্র পংক্তিটি আবারো স্বরি তবে, “একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুইজনে; গাহিবে একজন খুলিয়া গলা, আরেকজন গাবে মনে।” সুরের ধারা-৬ আসরের শ্রোতা নির্বাচনে বাংলা টেলিভিশন কানাডা সচেতন রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের গানের প্রেমিকেরা এ আসরের দর্শক সারিতে থাকবেন, এই আমাদের অনুনয়। অনুষ্ঠানটি উপভোগের জন্য সম্মানিত শ্রোতাদের কোন অর্থ খরচ করতে হচ্ছে না, অর্থাৎ আমরা টিকিট বিক্রি করছি না। গান-পাগল বন্ধুদের জন্য আমরা বিনা খরচে গান শোনার ব্যবস্থা রাখছি। যাঁরা নজরুল-রবীন্দ্রগানের ভক্ত, অনুগ্রহ করে তাঁরা বিটেলিভিশন@ইয়াহু.কম-এ ইমেইল পাঠিয়ে বা ৪১৬-৮৭৯-৭১৪১ নম্বরে ফোন করে আপনার আসন আগেভাগে নিশ্চিত করতে পারেন। অনুষ্ঠানের দিনে অডিটরিয়ামের সিকিউরিটি টিম অতিথি তালিকার বাইরে কোন ওয়াক-ইন শ্রোতাকে সমাদরে সক্ষম নাও হতে পারে।
শ্রোতাদের শ্রবণ নির্বিঘœ রাখতে আমরা নেপথ্যে নিরলস খাঁটাখাটুনি করছি। এ অনুষ্ঠানটি থেকে বাংলা টিভি’র কোন অর্থ-প্রাপ্তিযোগ নেই, উপরন্তু আমাদের সময়, মেধা এবং নিজস্ব তহবিলের অর্থ এর পেছনে ব্যয়িত হবে। এ সত্য আমরা জানি এবং বুঝিও। পাওয়ার কিছু না থাকলেও আমাদের একটি বিষয় চাইবার আছে। অনুষ্ঠানে আগত শ্রোতারা গান শুনে তৃপ্ত-চিত্তে বাড়িতে ফিরুক, এটুকুই চাওয়া আমাদের। সে লক্ষেই আমাদের সকল পরিশ্রম নিবেদিত।
এবারে তাহলে “সুরের ধারা-৬” অনুষ্ঠানটিতে যা থাকছে না, তেমন দু-চারটা বিষয় বলি। শাড়ি-চুরি, গহনাগাটির দোকানপাট বা সেলস পারসনদের কোন ষ্টল থাকছে না। এ আয়োজনটি কোন “মেলা” বা “বাজার” নয়, অতিথিরা গান শুনতে এসে দেখবেন যে সারি সারি স্টলে দোকানিরা পণ্য সাজিয়ে বসেছে- এমনটা আমাদের আয়োজনে হবে না কখনও, হয়ওনি। অডিটরিয়ামের ভেতরে বা বাইরে কোথাও বিজ্ঞাপনদাতাদের ব্যানার থাকছে না, অথবা বিজ্ঞাপনদাতারা মাইকে “দু-কথা” বলার সুযোগও পাচ্ছে না। আবার স্পন্সরদের মঞ্চে তুলে পদক (!) দেওয়াও হচ্ছে না। আসলে সেই অর্থে ওই শ্রেণীর কোন বিজ্ঞাপনদাতার অর্থ আমরা গ্রহণও করি না। শুধুই “বাণিজ্য সর্বস্ব চিন্তা” নয়, শিল্পের প্রতি অনুরাগ আছে- এমন বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্য থেকেই বরাবরের মতো আমরা মাত্র একজন স্পন্সরেরই সাহায্য নেবো।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় কথাটুকু ছাড়া কারো কোন বক্তব্যই শ্রোতাদের শুনতে হবে না। অনুষ্ঠানের শুরুতে বা মাঝে কোন বিশিষ্টজনের (!) বক্তব্য থাকছে না। একটি গানের অনুষ্ঠানের সংগীতশিল্পী এবং যন্ত্রশিল্পীরাই একমাত্র “বিশিষ্টজন”, তাঁদের গায়ন-বাদনই প্রতিটি মাইক্রোফোন ধারণ করে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সারা অডিটরিয়ামে অনুরণিত করবে। আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের শ্রোতারা আমাদের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র গান শুনতেই আসেন, কারো বক্তব্য নয়।
অডিটরিয়ামের কোন আসন সংরক্ষিত থাকছে না। প্রত্যেক শ্রোতাই আমাদের কাছে “বিশেষ” এবং সমমর্যাদায় আদৃত। সেই বিবেচনা থেকে বাংলা টেলিভিশনের “আগে আসলে আগে বসবেন” নীতি। অডিটোরিয়ামের মধ্যে কোন ফোনালাপ থাকছে না। শ্রোতা-শিল্পী-আয়োজক সকলের ফোনই বন্ধ থাকছে। তবে জরুরী প্রয়োজনে লবিতে গিয়ে ফোনালাপ সারা যেতেই পারে। অডিটোরিয়ামের মধ্যে শ্রোতাদের জন্য ভিডিও বা স্টীল, কোন ধরণের ক্যামেরা ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। ছবি তোলার কাজটি লবিতেই সারতে হবে। বাংলা টিভি’র একাধিক টেলিভিশন ক্যামেরা অনুষ্ঠান চলাকালে সচল থাকবে এবং আমাদের নিজস্ব ক্যামেরাম্যান স্টীল ছবিগুলো তুলবেন। ধারণকৃত স্টীল ও ভিডিও ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রকাশ করবো এবং অনুষ্ঠানে গীত গানগুলোও বাংলা টিভি’র নিয়মিত অনুষ্ঠানে চ্যানেল অমনি ২-তে ব্রডকাষ্ট করা হবে।
বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র টিভি শো’গুলোর নিয়মিত সঞ্চালক ফ্লোরা শুচি “সুরের ধারা-৬” অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন। টরন্টো শহরে যাঁরা রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের গান শুনতে আগ্রহী তাঁদের আমরা সাদরে বরণ করতে চাই। দোলন সিনহা’র তবলা বাদন, অরূপ মুখার্জী’র মন্দিরার টোকা, আর মামুন কায়সারের কি-বোর্ডের সুরের মূর্ছনার সাথে শিল্পীরা সেদিন কন্ঠ মেলাবেন। গান নির্বাচনে শিল্পীরা সুরের বিভিন্নতা এবং তাল বৈচিত্রের দিকে সচেতন আছেন। যাতে করে পরপর গীত গানগুলো শ্রোতাদের কাছে একঘেঁয়ে মনে না হয়।
পাদটিকা: বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র মূল কাজ টেলিভিশন প্রডাশনের জন্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করা। শ্রমসাধ্য এবং আর্থিকভাবে লোকসানি এই ধরণের মঞ্চ আয়োজন আমাদের জন্য “বাড়তি কাজ।” যতদিন শ্রোতাদের অনুষ্ঠানটি নিয়ে আগ্রহ থাকবে এবং আমরা তাঁদের থেকে কাঙ্খিত সহযোগিতা পাবো, ততদিনই আমরা এই “বাড়তি কাজটি” করবো। (লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

শেয়ার করুন