আক্ষেপ

10

তাজুল ইসলাম : প্রবাসে আমাদের শিশু ও আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে মাতৃভাষার নব চেতনায়। তাদের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, আসক্তি। তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে মাতৃভাষার প্রকৃত ইতিহাস ও রক্তস্নাত জন্মকথা। মনে রাখা জরুরি যে, শিশু হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের একটি। এটি বাস্তবিক সত্য। আজকের শিশুরা আগামী প্রজন্মের নির্মাতা। প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনার বাতিঘর। শিশুদের প্রতিই আমাদের মনযোগ নিবিড় হওয়া উচিৎ সর্বাগ্রে। শিশু শিক্ষার সবচে সঙ্গত, স্বাভাবিক ও কার্যকরী মাধ্যম হলো তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষা। মাতৃভাষাই হলো শিশু শিক্ষার মূল ভিত্তি। শিশু শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার দ্বারা এটি আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। শৈশবে ভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভের ফলে ভাব ও ভাষার প্রকৃত সেতুবন্ধন গড়ে উঠে না।
এর করুণ পরিণতি সম্পর্কে বিখ্যাত কবি রবিন্দ্রনাথ “শিক্ষার হেরফের” প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সহিত ভাব পাই না আবার বয়স হইলে তাহার বিপরীত ঘটে, যখন ভাব জুটিতে থাকে তখন ভাষা পাই না।” সুতরাং ভাব ও ভাষার সুষম বিকাশের লক্ষ্যে প্রয়োজন শিশুকে তার মাতৃভাষায় যথাযথ শিক্ষিত করা। আজকের দিনে বিশ্ব যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে ইংরেজি ভাষাসহ অন্যান্য ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বাস্তবতায় যে কেউ ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করতে পারেন। কেবল ইংরেজি কেন, নিজেকে সম্মৃদ্ধ করতে বিশ্বের আরো বহু ভাষা আয়ত্বিকরণও কোন বাধা নেই।
কিন্তু শিশু শিক্ষার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মাতৃভাষার পরিপূর্ণ শিক্ষা। বাঙালি শিশুর জন্যে বাংলা ভাষার গাঁথুনি মজবুত হলে অন্যান্য ভাষা শিক্ষায় তা বরং সহায়ক হবে। বহুতল অট্টালিকা তৈরীর জন্য যেমন মজবুত ভিত্তির প্রয়োজন তেমনি বহু ভাষাবিদ হওয়ার জন্যে সবার পূর্বে মাতৃভাষায় যথার্থ দখল থাকা আবশ্যক। আপনার শিশুর বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জন অবশ্যই প্রশংসনীয়। উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠায় তা অত্যন্ত কার্যকরী গুণ। কিন্তু নিজ মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে অন্য ভাষার প্রতি যত্নবান হওয়া কিছুতেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মাতৃভাষা শিক্ষায় আপনার সন্তানকে সহযোগিতা করুন। তার মাঝে সৃষ্টি করুন মাতৃভাষার ভালোবাসা। তার শিক্ষামাধ্যম নিশ্চিত করুন মাতৃভাষাতেই। আপনার সন্তানের দ্বারাই সম্ভব মাতৃভাষার আগামীর পথচলা।
তারাই পারবে আমাদের মায়ের ভাষার অস্তিত্ব ধরে রাখতে আগামীতে। তারাই পারবে আমাদের রক্তার্জিত বাংলা ভাষার গায়ে নতুন প্রাণ দিতে। প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষা তাদের নিকট অমূল্য রত্ন। একটি জাতির অহংকার তাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা একটি জাতির পরিচয় ও পরিচায়ক। মাতৃভাষার পরিচর্যায় যত্নবান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। মায়ের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় সচেতন থাকা আবশ্যক সব শ্রেণীর মানুষের।
আমাদের সন্তানদের জন্য কী ধরনের শিক্ষা দরকার? এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জীবন যেমন হওয়া উচিত, শিক্ষাও তেমন হওয়া উচিত। জীবন ও শিক্ষা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাই জীবনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম সে রকম শিক্ষা চাই। আলবার্ট আইনস্টাইন বলতেন, জ্ঞানের চেয়ে বড় হচ্ছে কল্পনাশক্তি। আইনস্টাইন খুব বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন, সত্যি কথা বলতে কী তিনি কত বড় বিজ্ঞানী সেটা বোঝার মতো বিজ্ঞানীও পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। সেই আইনস্টাইন জ্ঞান থেকেও কল্পনাশক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার নিশ্চয়ই একটি কারণ আছে। কারণটি সহজ, জ্ঞান অর্জন করা যায় কিন্তু কল্পনাশক্তি অর্জন করা যায় না। মানুষ কল্পনাশক্তি নিয়ে জন্মায়, সেই অমূল্য শক্তিকে খুব যত্ন করে লালন করতে হয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। পৃথিবীতে সবচেয়ে মহান কাজগুলো হয়েছে এই কল্পনাশক্তির কল্যাণে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে কল্পনাশক্তির দরকার, যাদের কল্পনাশক্তি নেই তাদের এই পৃথিবীকে দেওয়ার কিছুই নেই। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সেই কল্পনাশক্তি এবং সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।
এই সুদূর প্রবাসে আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে হলে আমাদের সন্তানদের সাথে অবশ্যই ঘরে-বাইরে বাংলা চর্চা করতে হবে। তাহলে তারা অন্য ভাষার প্রতি আরো বেশি যত্নশীল হবে এবং গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিবেনা। কথায় কথায় “ই-ও, ই-ও” করবে না। বাংলার মতো একটি প্রগতিশীল ভাষাই পারে ভাবের সাথে সম্মান বোধকে জাগিয়ে তুলতে। নতুবা দেখবেন আমরা যারা সর্বস্ব বির্ষজন দিয়ে সুদূর প্রবাসে পরে আছি আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে তারা বাংলা ভাষার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে স্বরণ করা দূরের কথা আমাদের কথা একবারের জন্যও ভাববেনা। এক অজানা সংশোধনাতীত ক্য- নিয়ে আমাদের বিদায় নিতে হবে।
তাজুল ইসলাম, এমআরটি (রেডিওলোজী)

শেয়ার করুন