আত্মানুসন্ধানে বাঙালি সংস্কৃতি

94

ইসরাত জাহান
বাঙালি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে বৈশাখের গান। গণমানুষের কন্ঠে কন্ঠে তা’ই ধ্বনিত হয়ে আসছে বৈশাখের গান-
এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক
এসো এসো…
পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে আবহমানকাল থেকে নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে নববর্ষকে বরণ করার রীতি চলে আসছে। বাংলাদেশে বর্ষবরণ উৎসব নানা অঞ্চলে নানা রীতিতে উদযাপিত হয়। প্রাচীনকাল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে তিনদিনব্যাপী এ বর্ষবরণ উতসব পালিত হয়ে আসছে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মৈত্রীর বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে বৈশাখের নানা আয়োজন। দেশের সকল ুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সামাজিক উতসব হলো এ বর্ষবরণ। একে আমরা সকল ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্টীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য সার্বজনীন একটি উৎসব বলে মনে করা হয়।
পহেলা বৈশাখ, পহেলা মানে প্রথম বাংলাপঞ্জিকার ১ম মাস অর্থাৎ বৈশাখের ১ তারিখ পহেলা বৈশাখ, “নববর্ষ! বাংলা সনের এ দিনটিকেই বলা হয় “নববর্ষ”। দিনটিকে বাংলাদেশের মানুষ খুব উৎসবের সঙ্গেই পালন করে আসছে যুগযুগ ধরে। শুভ “নববর্ষ” উদযাপনে সকল শ্রেণি-পেশা ও ধর্মের মানুষ (জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে) অংশ গ্রহণ করে থাকে। বাঙালি মেয়েরা ঐতিহ্যবাহী শাড়ি এবং পুরুষেরা পাজামা-পাঞ্জাবিসহ রংবেরং এর পোষাক পরিধানে খুবই বিনোদন বোধ করে।
প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিশেষ ধরণের খাবার তৈরি হয়। যেমন: পান্তা-ইলিশ, নানা রকমের পিঠাপুলি, সন্দেশ, বাতাসা, ক্ষীরসহ হরেক রকমের খাবার। বাঙালি জাতি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সব স্তরে নতুন বছরের প্রথমে ভালো খাবার খায় এবং মানুষদের প্রতি ভেদাভেদ দূর করে মানবতাবোধকে জাগ্রত করে এ বিশেষ দিনটি। নববর্ষের এ দিনটিতেই দরিদ্র, অসহায় ও নিপীড়িত, মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণার দেয় নববর্ষ! যা একটি জাতীয় ঐতিহ্যের গৗরবোজ্জল পটভ‚মি।
বাঙালিদের উৎসবের যতগুলো দিন আছে, অনুভুতি রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সর্বজনীন দিন হলো ১লা বৈশাখ। মাতৃভ‚মি ও এর সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসায় এখন দেশে বিদেশে পালিত হয় বাংলা “নববর্ষ”। বাঙালি সংস্কৃতি এখন বিশ্বে একটি আলোচিত ও সমাধৃত সংস্কৃতি।
বাঙালি সংস্কৃতির জন্য যারা সামান্যতম ভালোবাসা অনুভব করেন তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন কৃষি, ঋতু ও নদী কেন্দ্রীক এ সংস্কৃতিই আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তিমূল।
সুদূর অতীত কাল থেকে পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন ধার্য হয়ে আসছে নববর্ষ হিসেবে। লোকউৎসবের প্রধান দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ দিবসটি। প্রতিবছর ১৪ই এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) দিনটিকে নিয়ে উৎসবে মশগুল থাকে বাঙালি সমাজ।
বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর এ সংস্কৃতির শুভ সূচনার দিন অর্থাৎ নববর্ষ এখন বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিনোদন বিবেচনায় বিশ্বজগতে বাঙালি জাতির সর্বজনীন সংস্কৃতির পরিচিতির অন্যতম কারণ পোষাক-আষাক।
নির্দিষ্ট করে এ দিন সরকারি ছুটির দিন। বাঙালি জাতির সর্বজনীন সংস্কৃতি লোকউৎসবের পাশাপাশি পারিবারিক পরিমন্ডলে ও এদিবসটির গুরুত্ব অসীম। প্রবাসে ও এর ছাপ লক্ষণীয়।
বাঙালি পরিবারগুলো দেশের আদলে নববর্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আয়োজন করে রকমারি খাবার-দাবারের।
শুধু আনন্দ উৎসবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন থেমে নেই । প্রবাসীরা বাঙালি সংস্কৃতিনির্ভর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরার যেকোন সুযোগকে হাতছাড়া করতে রাজি নন । এবারের বৈশাখী উৎসব ও ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ সরকার এই উৎসবকে স্বীকৃতি দিয়েছে চাকরিতে বোনাস প্রবর্তন করেছে। সংস্কৃতি উৎসব বোনাস গত বছর হতেই শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে দাবি উঠেছে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এ দিনটিকে জাতীয় হেরিটেজ দিবস হিসেবে ঘোষনা করার জন্য। এর যুক্তিকতা এখন প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, এর সংস্কৃতি, যা এখন ক্রমবিকাশমান। প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতিকে ভিন্ন ধারায় তুলে ধরতে আত্মানুসন্ধানে বাঙ্গালী সমাজ। বাঙালি সংস্কৃতিই আমাদের শেকর, আমাদের আত্মোপলব্ধি.
লেখিকা : ইসরাত জাহান, প্রজেক্ট সুপারভাইজার, আল্টা কেয়ার রিসোর্সেস, এডমন্টন।

শেয়ার করুন