আয়নায় নিজের মুখ- ৩৩

51

লুনা শিরীন
ক্ষয়ে যাওয়া ছোট ছোট সাবানের টুকরো দিয়ে ক্ষারের পানি বসানো হোতো একটা বড় পাতিলে, আমাদের ছোটবেলার দিনগুলোতে- মনে পড়ে? রংপুরের নানা বাড়িতে পাঁচ বছর থাকাকালীন সময়ে নানীর সংসারে অনেকগুলো কাজের ব্যবহার মায়ের বাসাতেও দেখতাম। নানী বসাতেন ক্ষারের পানি। বিশাল এক পুরোন আধা ভাঙ্গা ডেকচিতে ফুটানো পানির ভিতরে ছোট ছোট সাবানের টুকরোগুলো গলে যেতো। সেই ডেকচির ভিতরে ফুটতো ঘরের ব্যবহারের নানান কাপড়। যেমন- হাত ধোঁয়া নুছনি, ডেকচি ধরা কালো হয়ে যাওয়া কিছু কাপড় বা ঘর মোছা কাপড়। পরে কড়া রোদে শুকোতে দিতাম সেগুলো।
মনে পড়ে একদম ম্যাট্রিক অব্ধি, মাসে শরীর খারাপের কাপড়ও বেশ ফুটিয়ে ধুঁয়ে তুলে রাখা হোতো পরের মাসের জন্য। পাতলা নরম কাপড় সেগুলো। এসব শিখেছিলাম খুব গোপনে। তখনো বাজারে দামী  স্যানেটারী প্যাড আসেনি বা আসলেও আমাদের চারবোন ও মা মোট ৫ জনের জন্য সারা মাসে সেটা কিনে পোষানো সম্ভব না। যেমন ক্ষারের পানি ব্যবহার করে নানী ও মা সাবানের সাশ্রয় করতেন, তেমনি নরম কাপড় বাঁচাতো কিছু কষ্টার্জিত টাকা। এমনি অসংখ্য ফেলে আসা স্মৃতি, টুকরো টুকরো সময়ের সব অতীত মনে করে বিদেশে দিন পার করি আমরা। হয়তো আমার মতো অনেকেই যারা ৩৬ বা ৩৭ এর পরে বিদেশে এসছেন, যাপিত জীবনের দহন একটু সয়ে নেবার  জন্য- কিন্তু দেশে ফেলে এসেছেন জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার আর উজ্জল আলোর মতো  প্রথম ৩০ বছর। নিজের বেড়ে উঠার সেই দুর্বার স্বর্ণ সময় ফেলে এসেছেন নিজের দেশে। আমাদের আর দেশে ফেরা হয়তো হবে না। কিন্তু নতুন করে বাঁচাও হবে না। অতীত বুকের ভিতরে বহন করলে কি নতুনকে বরণ করা যায়? সবাই কি পারে জীবন থেকে সব ঝেড়ে ফেলতে? যারা পারে তাদেরকে বিপ্লবী সালাম। কিন্তু আমি পারি না। আর পারার  চেষ্টাও  করি না।
নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতে ছুটির দিন এসে হাজির হয় সামনে। আমি অপেক্ষা করি। নাইয়ার কাছে বার বার বলি বাবু, প্লীজ- মাত্র দুই ঘণ্টা। এই কাজটা সেরেই আমি লিখতে বসবো। নাইয়া হেসে গড়ায় বলে, মা তুমি বুঝো না কেন? কেউ তোমার লেখা পড়ে না, কেঊ তোমার বই পড়ে না, পড়বে না, কেন তুমি ডলার খরচ করে বই বের করো? আমার মাথার ভিতরটা দপ দপ করতে থাকে, নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করি। ভাবি, না রাগ হলে চলবে না। এটা আমার জীবন। আমার জুতা নাইয়ার পায়ে নেই, আমার ইমোশন আমার ছেলে বুঝবে না। আমি ঠাণ্ডা হয়ে বলি, না পড়ুক বাবু, আমি পড়বো। আমি যখন ওল্ড হবো তখন আমার সব বই নিয়ে আমি বেঁচে থাকবো। এটা আমার জীবন বাবু, এটা আমার অর্জিত ডলার, আমি তো তোমার কাছে কিছু চাইনি সোনা? নাইয়া হেসে চলে যায়। আমি বসে যাই নেটে।
নীরব দুপুর। চারপাশে শুনশান পিনপতন নিঃসঙ্গতা। আমার টাইপ করার শব্দ আমার কানেই বাজতে থাকে জোরে জোরে। শুধু কথা বলতে চাই নিজের সাথে। বার বার নিজেকে জিজ্ঞেস করি মানুষ কি বদলায়? মনে পড়ে? সুচিত্রা উত্তমের ছবি- সবার উপরে। যেখানে বিনা অপরাধে ছবি বিশ্বাসকে জেলে রাখা হয়েছিলো ৩০ বছর। নিজের ছেলে উত্তম কুমার বড় হয়ে লইয়ার হয়। বাবাকে ছাড়িয়ে আনে। সেই ছবিতে ঐ সেই মৃত প্রায় সৎ পুলিশ উত্তমকে বলে- মনে রেখ বাবা, প্রতিটা অপরাধী তার জীবনীতেই অপরাধের পষ্ট ছাপ রেখে যায়। অপরাধীকে ধরার জন্য সবার আগে তার জীবনের ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করা দরকার। সেটা করলেই অপরাধীকে সহজেই সনাক্ত করা যায়। অপরাধীর জীবন যাপনেই সেই ছাপ প্রবল।
আমি ১০০ ভাগ বিশ্বাস করি সে কথা।
আমি লুনা যা ছিলাম ৪০ বছর আগে, তার ছাপ আজো রয়ে গেছে আমার ভিতরে প্রবলভাবেই। ভালো-মন্দ দুই-ই সেখানে ভীষণভাবে সত্যিই। কোনদিন ধীরে ধীরে গলা নামিয়ে কথা বলতে শিখিনি আমি। কোনদিন ছলাকলা করে জীবনযাপন শিখিনি। কোনদিন ম্যানেজ করে চলা কাকে বলে সেটা জানিনি। কোন দিন খোঁজখবর করে কাউকে ভালোবাসা শিখিনি। নিজের মাকে দেখেছি, সব মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছেন। আমরাও তাই শিখেছি ছোটবেলা থেকে। তাহলে আজ কি করে  শিখবো সেটা? কথাগুলো বলে নিলাম নিজের কারণেই। যে সেনা অফিসার তনুকে ধর্ষণ করেছে সে আরো দশজনের কাছে একই হিংস্র থাবা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেই মানুষের মা, বোন, বাবা, আত্মীয় স্বজনেরা সে ইতিহাস বহু আগে থেকেই জানে। যদি এই পিচাশের বউ থাকে সেও সবার আগেই জানে। এক নরপিশাচ তার স্বামী, কই এরা কেউ এতদিন এই পিচাশকে আটকায়নি? কেন করা হয়নি কাজটা আগেই?
আজকে তনু বলি হবার পরে যদি তার পরিবার-পরিজনদের গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কেন এই নরপিচাশকে নিজ দায়িত্বে পুলিশে দেননি আপনারা? এর আগেও তো এই জানোয়ার এই সব কুকর্মে লিপ্ত ছিলো, কেন প্রশয় দিয়েছেন এই হারামীকে, এই জারজকে? কি উত্তর দেবে এই অমানুষের পরিবার? জানতে ইচ্ছে করে ভীষণ। যেমন জানতে ইচ্ছে করে আমার  প্রিয় দেশের কোটি কোটি মা-বোন আর স্ত্রীর কাছে, এই যে একই পরিবারে আপনার ভাই, আপনার ছেলে, আপনার স্বামী, মাগিবাজী করে, ঘুষ খায়, অন্যায় করে, প্রতারণা করে এই আপনাদেরকেই এইসব জানোয়াররা প্রথম অসম্মান করে। আপনাদের সামনেই দিনের পর দিন অপরাধ করে হাসি মুখে ভাত খায়, ঘরে বাইরে হাঁটাচলা করে- কই কোনদিন তো আমি এমন নিউজ পরিনি। একজন মহিলা (মা, বোন, স্ত্রী) সাহস করে মিডিয়াতে দাঁড়িয়ে বলেছে এই জানোয়ার আর পশুর ভাত খাওয়ার চেয়ে আমি ভিক্ষা করে খাবো? কই আমি তো বাংলাদেশের কোন ঘুষ খোর মন্ত্রীর বউ মা বা মেয়েকে বলতে শুনিনি, এই হারামখোরের টাকা আর সম্পত্তি আমি চাই না। আমি তো দেশের কোন অসৎ সচিবের বউকে বলতে শুনিনি, এই চারপেয়ে পশুর সাথে আমি থাকবো না। কেউ শুনেছেন বা পরেছেন এমন নিউজ?
বাংলাদেশে ৬৫%  মধ্যবিত্ত  শিক্ষিত এম এ পাশ মহিলারা রিটেন লিখে দিয়েছে, যে  স্বামী ভাত কাপড় দেয় সেই স্বামী দুই একটা চড় থাপ্পড় দিলে কিছু হয় না।
বাংলাদেশে ৮০ ভাগ বেশ্যা পাড়ায় যাওয়া আসা করা ছেলেরা বিবাহিত। সেই সমাজে এক তনু প্রকাশ্যে ধর্ষণ হলে মিছিল বের হয়। এক রুমানা মঞ্জুরের চোখ তুলে ফেলার পরে আমরা অল্প একটু নড়ে বসি। এই আমরাই (মেয়েরা) তো সবচেয়ে বড় নরপিচাশ। আমরাই তো পেলে পুষে বড় করি এই সব জাতশুঁয়োরদের (আমাদের স্বামী, আমাদের ভাই, আমাদের বাবা)। এদের  সাথেই সংসার করি আমরা। এদের পাশে নিয়ে ছবি তুলি। এদের কথা ভেবে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকি। আর কতদিন এইরকম নিকষ কালো আয়না নিয়ে জীবন পাড় করবো আমরা? আর কত যুগ পরে একদম নিজের ঘরের মানুষের মুখোশ টেনে খুলতে শিখবো আমরা? ক্ষারের বলক  উঠা পানিতে প্রথম ধুতে হয় নিজের পরনের কাপড়, পরে না অন্য কথা।  লুনা শীরিন, টরন্টো

শেয়ার করুন