ইন্সুরেন্সের কথা, ইন্সুরেন্স নিয়ে কথা

91

শওগাত আলী সাগর
লাইফ ইন্সুরেন্স নিয়ে প্রশ্ন : পলিসি ম্যাচিউর করলে আমি কতো ডলার বেনিফিট পাবো? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নয়, স্পষ্টভাবেই তিনি প্রশ্নটা করলেন। একবার নয় কয়েকবার। রিটার্ণ সম্পর্কে উনি নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন বোধ হয়।
কথা হচ্ছিলো লাইফ ইন্সুরেন্স নিয়ে। ফলে পলিসি ম্যাচিউর করলে বেনিফিটের বিষয়টা আমার কাছে কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছিলো না। তিনি নিজেই পরিষ্কার করে দিলেন। ধরুন, আমি ২০ বছরের জন্য ইন্সুরেন্স পলিসি করলাম। ২০ বছর পর তো এটি ম্যাচিউর করবে। তখন এই পলিসি থেকে আমি কতো ডলার পাবো?
কেবল উনিই না। এর আগেও এই প্রশ্নটা শুনতে হয়েছে। প্রশ্নটা এসেছে আসলে বাংলাদেশের লাইফ ইন্সুরেন্সের ধারণা থেকে। বাংলাদেশে নাকি পলিসি হোল্ডার টার্ম শেষে রিটার্ণসহ ভালো একটা বেনিফিট পান?
ইন্টারেস্টিং রিয়েলি। সমস্যা হচ্ছে কানাডার লাইফ ইন্সুরেন্স সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। এখানে লাইফ ইন্সুরেন্সের বেসিক হচ্ছে ডেথ বেনিফিট। যিনি লাইফ ইন্সুরেন্স করলেন তিনি মারা যাওয়ার পর তার বেনিফিসিয়ারি কাভারেজ পরিমান ডেথ বেনিফিট পাবেন। সেটা হবে ট্যাক্স ফ্রি।
ধরুন, আমি ২০ বছরের জন্য ইন্সুরেন্সটা করলাম। বিশ বছর পর আমি কি পাবো?
প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার আগে একটু ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। আপনি ২০ বছরের জন্য ইন্সুরেন্স করেছেন, মানে আপনার আগামী ২০ বছরের জীবনের ঝুঁকিটা ইন্সুরেন্স কোম্পানি নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আপনি মারা গেলে, আপনার বেনিফিসিয়ারি ট্যাক্স ফ্রি ডেথ বেনিফিট পাবে? নির্দিষ্ট সময় ধরে আপনি যখন ইন্সুরেন্স করেন, তাকে বলা হয় টার্ম ইন্সুরেন্স। এই ইন্সুরেন্সে টার্মের মধ্যে আপনি মারা গেলেই কেবল বেনিফিট পাবেন। আপনি মারা না গেলে, ২০ বছর মেয়াদ শেষে এটি শেষ হয়ে যাবে। আপনি কিছুই পাবেন না। এমন কি আপনি যে প্রিমিয়াম দিয়েছিলেন তাও না। এটাই লাইফ ইন্সুরেন্স।
এই মেয়াদটা আপনি ঠিক করে নিতে পারেন। ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০ বা তার চেয়ে বেশি মেয়াদের টার্ম ইন্সুরেন্স হতে পারে। এর বাইরে অবশ্য পারমানেন্ট ইন্সুরেন্স আছে, সেটি আমৃত্যু সক্রিয় থাকে। আপনাকে প্রিমিয়ামও দিতে হয় সেই হারে।
কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানে টার্মের জন্য যখন লাইফ ইন্সুরেন্স করেন, তখন সেটি টার্ম এর পর আর কাজ করে না। মেয়াদ শেষে টার্ম ইন্সুরেন্স আপনাকে কোনো বেনিফিট দেবে না। কিন্তু টার্মের সময়ের জন্য এই ইন্সুরেন্স আপনার ঝুঁকিটা নিচ্ছে। মনে রাখবেন, বাংলাদেশে যে লাইফ ইন্সুরেন্সের সাথে আপনার পরিচয় ঘটেছে কানাডায় সেটি একেবারেই পাবেন না।
আরইএসপি নিয়ে আলোচনা: রেজিস্টার্ড এডুকেশন সেভিংস প্ল্যান (আরইএসপি) নিয়ে মানুষের মনে নানা রকমের জিজ্ঞাসা আছে, সংশয়ও আছে। এমনি কিছু প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এই আলোচনা।
প্রশ্ন করেছেন, এই স্কিম বাচ্চাদের পোস্ট সেকেন্ডারি পড়ার খরচ জমানোর জন্য জানি। কিন্তু এতে টাকা জমালে পরে বাচ্চা কি গভর্নমেন্ট থেকে টাকা পাবে না কিংবা টিউশন ফি ওয়েইভ পাবে?
ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন নিসন্দেহে। তবে টিউশন ফি ওয়েব পাওয়ার ব্যাপারটা আরইএসপির সাথে মোটেও সম্পর্কিত নয়, এটি আপনার ফ্যামিলি ইনকামের সাথে সম্পর্কিত। আপনার ফ্যামিলি ইনকাম ৫০ হাজার ডলারের নীচে থাকলে ছেলে মেয়েরা টিউশন ফি ওয়েব পাবে প্লাস অফেরতযোগ্য আর্থিক সুযোগও পাবে।
আরেকটা কথা, পড়াশোনায় কেবল টিউশন ফি খাতেই খরচ হয় না আরো খরচ আছে। বই কিনতে হয়, যদি ডরমে থাকে সেটার খরচ আছে, খাওয়া আনুসঙ্গিক খরচাদি আছে। এগুলোও তো শিক্ষা ব্যয়। কাজেই এই খরচের যোগানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার। আরইএসপিতে জমানো ডলার কেবলমাত্র টিউশন ফি খাতেই ব্যবহার করা যাবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পড়াশোনার আনুষঙ্গিক খরচ নির্বাহের জন্যও এই তহবিল ব্যবহার করা যাবে।
প্রশ্ন: আমরা বেশি জমালে পরে বেশি রিটার্ন পাবো, নাকি বেশি জমাইছি তাই কম পাবো?
বেশি-কম জমানোটা আপনার উপর। তবে আপনি চাইলেই ইচ্ছামতো বেশি জমাতে পারবেন না। একজন সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত আপনি জমাতে পারবেন। কমের পরিমাণটা আপনার পছন্দ।
রিটার্নের হারটাও নির্দিষ্ট। সরকার আপনাকে প্রতি সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ৭ হাজার ২০০ ডলার পর্যন্ত দেবে। এর পুরোটা পাওয়ার জন্য আপনাকে ৫০ হাজারের লিমিটি টাচ করতে হবে। আপনার জমা এর কম হলে আনুপাতিক হারে সরকারের টাকাটাও কমে যাবে।
এর বাইরে আরইএসপির আয় হচ্ছে বিনিয়োগ থেকে আয়। আপনি কম টাকা বিনিয়োগ করলে কম আয় হবে, বেশি টাকা বিনিয়োগ করলে বেশি আয় হবে। সহজ হিসাব।
প্রতি মাসে কত করে জমালে ভাল?
এটি সম্পূর্ণই আপনার সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। সম্ভব হলে আমি কোটার পুরোটাই ব্যবহার করার পক্ষে। কেননা এই টাকাটা শেষ পর্যন্ত সন্তানের লেখাপড়ারর জন্য তহবিল তৈরি করছে।
আমাদের বড় মেয়ের এখন ৫ বছর। আর ছোটটি অন দ্য ওয়ে। এক্ষেত্রে বড়টার জন্য প্রতি মাসে বেশি করে আর ছোটটার জন্য কম করে রাখলে কি হবে?
ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন! আপনি ফ্যামিলি প্ল্যান করতে পারেন। একজন কোনো কারনে পড়তে না গেলে (গড ফরবিড) বাকিজন সেই তহবিল ব্যবহার করতে পারবে।
বাড়ী ইন্সুরেন্স ও প্রাইভেট মর্টগেজ: মর্টগেজ কোম্পানি শর্ত না দিলে বাড়ী কেনার সময় আপনি কি বাড়ীর ইন্সুরেন্স নিতে চাইতেন? এর সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। মর্টগেজ কোম্পানি যেহেতু বাড়ীটাতে অর্থায়ন করে, তারা নিশ্চিত হতে চায়- কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের বিনিয়োগের অর্থটা তারা ফেরত পাবে।
মর্টগেজ কোম্পানি যে পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করলো- তার পুরোটাই যে ইন্সুরেন্স কোম্পানি কাভার করবে- তার কিন্তু গ্যারান্টি নেই। বিষয়টা ইন্সুরেন্স কোম্পানিও জানে। ফলে তারা চায়- গ্যারান্টিড রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট। আপনি বাড়ীটা কতো দিয়ে কিনেছেন- ইন্সুরেন্স কোম্পানি সেটা কাভার করে না। একই মানের একই রকম একটা বাড়ী নতুন করে বানাতে কতো খরচ হতে পারে- সেটা কাভার করে ইন্সুরেন্স কোম্পানি। এটাকে বলে রিপেলসমেন্ট কষ্ট।
বাড়ীর বয়স, আপডেট, স্কয়ার ফুটেজ ইত্যাদি মিলিয়ে ইন্সুরেন্স কোম্পানি একটা রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট বের করে। স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানিগুলো এই রিপ্লেসমেন্ট কষ্টটা গ্যারান্টিড করে দেয়। একটা কথা, ৫০০ হাজার ডলারে কেনার বাড়ীর রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট কিন্তু ৩০০ হাজারও হতে পারে। কিন্তু রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট যখন গ্যারান্টিড তখন মর্টগেজ কোম্পানি সেটা এক্সেপ্ট করে। রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট ‘গ্যারান্টিড’ না হলেই মর্টগেজ কোম্পানি আপত্তি করে। সেক্ষেত্রে মর্টগেজের সমপরিমান কাভারেজ তারা চায়।
মর্টগেজ কোম্পানির যেমন কাভারেজ নিয়ে পছন্দ অপছন্দ আছে, ইন্সুরেন্স কোম্পানিরও মর্টগেজ কোম্পানির ব্যাপারে বাছ বিচার আছে। অধিকাংশ স্ট্যান্ডার্ড ইন্সুরেন্স কোম্পানিই ‘প্রাইভেট লেন্ডারের’ কাছ থেকে মর্টগেজ থাকলে ইন্সুরেন্স কাভারেজ দেয় না। তারা সরাসরি ডিক্লাইন করে দেয়। আবার কোনো কোনো কোম্পানি প্রাইভেট লেন্ডার এক্সেপ্ট করে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে। প্রাইভেট লেন্ডারকে অবশ্যই ‘লেন্ডার’ হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে। লেন্ডার হিসেবে তার একটা নিবন্ধন নম্বর থাকতে হবে।বাড়ীর দাম এবং মর্টগেজের পরিমানটাও তারা দেখে। লেন্ডারের সাথে বাড়ীরওয়ালার কোনো ধরনের সম্পর্ক আছে কী না সেটিও খতিয়ে দেখে তারা।
প্রাইভেট লেন্ডার এর মর্টগেজ থাকলে ইন্সুরেন্স পেতে ‘হাই রিস্ক’ কোম্পানিগুলোর কাছে যেতে হয়। একাধিক মর্টগেজ থাকলেও তারাই ভরসা। কেননা স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানিগুলোর অনেকেই একাধিক মর্টগেজ থাকলে সেটি তারা এক্সেপ্ট করে না। ‘হাই রিস্ক’ কোম্পানিগুলো আবার গ্যারান্টিড রিপ্লেসমেন্ট কষ্ট কাভারেজ দেয় না।
লেখক: শওগাত আলী সাগর, ইন্সুরেন্স ব্রোকার। ইমেইল: shaugat@gmail.com

শেয়ার করুন