কাকার ডক্টর দর্শন

16

ডঃ বাহারুল হক
গত শতাব্দির আশির দশক। আমি প্রভাষক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। সে সময় আমি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেলাম পিএইচ-ডি করার জন্য। আমার জন্য নির্ধারিত হলো স্কটল্যান্ডের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়। আমি স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। আমার সুপারভাইজর প্রফেসর জর্জ টিপেটও প্রস্তুত হচ্ছেন আমাকে রিসিভ করার জন্য। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে সব এলোমেলো হয়ে গেল। আমার আর যাওয়া হলো না। আমার যে পেশা সেখানে পিএইচ-ডি ডিগ্রি না থাকাটা অমর্যাদাকর।
এদিকে পরের বছর আবার যে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পাবো তার কোন নিশ্চয়তা নাই। ফলে হাতে থাকা ইন্ডিয়ান গভঃ স্কলারশিপ নিয়েই আমি চলে গেলাম ইন্ডিয়া। পিএইচ-ডি স্কলার হিসেবে স্থান পেলাম দক্ষিণ ভারতের প্রখ্যাত কর্নাটক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুপারভাইজর হিসেবে পেলাম ভারতের অত্যান্ত প্রেস্টিজিয়াস সি এস ভাটনগর এওয়ার্ড পাওয়া কর্নাটক বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক প্রফেসর এস কে সাইদাপুরকে। চার বছর কাটিয়ে দিলাম কর্নাটক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর পেলাম বহু আকাক্সিক্ষত পিএইচ-ডি ডিগ্রি। আব্বা গত হয়েছেন বহু বছর আগে। আব্বার একমাত্র ছোট ভাই আমার কাকা আমিনুল হক (প্রাক্তন মহাপরিচালক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ) আমার সব। কাকা তখন অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায়। দেরী না করে চিঠি লিখে কাকাকে জানালাম আমার ডক্টর হওয়ার খবরটা। খবরটা পেয়েই আমাকে লিখতে বসে গেলেন কাকা। লম্বা এক চিঠি। উল্লেখ্য, লেখায় কাকার দারুন হাত; বাংলা পিডিয়ার বিশেষজ্ঞ পন্ডিতদের তালিকায় এই অধম প্রাণিবিজ্ঞানীর নামের সাথে ভ‚মি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার কাকার নামও অন্তর্ভুক্ত আছে। যথা সময় চিঠিটা ক্যানবেরা থেকে পৌঁছে গেল আমার কর্মস্থল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। চিঠিটা পড়লাম। আবার পড়লাম। বার বার পড়লাম। অবর্ণনীয় খুশিতে আমার চোখ ভিজে উঠলো। চিঠিটির প্রতিটি বর্ণে, শব্দে, বাক্যে অকুন্ঠভাবে প্রকাশ পেয়েছে আমার ডক্টর হওয়ায় কাকার বুকের মধ্যে খুশির যে বান ডেকেছে তার আওয়াজ। কতবার লিখলেন- ‘তুমি আমাদের গর্ব, আমাদের পরিবারের প্রথম ডক্টর’।
আমাকে চিনেন আত্মীয়দের মধ্যে যাকে পান তাকেই খুশিতে চন মনে ভাব নিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমাদের বাহার পিএইচ-ডি করেছে’। তারপর পিএইচ-ডি করলো কাকার অতি আদরের কন্যা, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সংগীত শিল্পী ঢাকা ইউনিভার্সিটির তখনকার শিক্ষক আফরীন হক। ডঃ আফরীন হক আমাদের পরিবারের দ্বিতীয় ডক্টর। সে ডক্টর হলে কাকার বুকে দ্বিতীয় বারের মত আনন্দের বান ডেকেছিল। আমার খুব ভালো লাগে এটা ভেবে যে আফরীন আমার মিস করা স্টারলিং ইউনিভার্সিটি থেকেই কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে গিয়ে পিএইচ-ডি ডিগ্রি নিলো। ইন্টরেস্টিংলি আমার আর ডঃ আফরীনের গবেষণার প্লাটফরমও প্রায় এক রকম। সে কাজ করে ‘জেন্ডার ইন বিজনেস’ – এর উপর, আর আমার কাজের প্লাটফরম ছিল ‘জেন্ডার ইন ভার্টিব্রেটস’। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলাম প্রভাষক হিসেবে। সময় এবং যোগ্যতার নিরীখে উত্তীর্ণ হয়ে আমি একদিন প্রফেসর হলাম। নয়া প্রফেসর ঢাকা গেলাম কাকার সাথে দেখা করতে। কাকা অধীর আগ্রহে বাসায় আমার অপেক্ষায়। বেল বাজালে কাকা নিজেই দরজা খুললেন। দুহাত বাড়িয়ে কাকা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কাকার মায়া-মমতা-ভালোবাসার পরশে আমার মনের মধ্যে সেদিন যে অফুরন্ত খুশি সঞ্চারিত হয়েছিল তাতে আমার দুচোখ ভিজে উঠেছিল। তারপর কত গল্প, কত কথা! কথা আর শেষ হয় না। কাকা রাজ্যের সব কথা জমা করে রাখেন আমাকে বলার জন্য। আবার নিজেই বলেন, “তোর সাথে কথা বলে যে আনন্দ পাই তা অন্য কারো সাথে বললে পাই না”। আসলে আমরা দুজনে পরস্পর পরস্পরের পাল্স বুঝি ভালোভাবে; সে জন্যই জমে ভালো। ডঃ আফরিন হকের কথায় আসি এবার। ডঃ আফরীন হক ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে অবস্থিত পাবলিক ইউনিভার্সিটি, রয়েল মেলবোর্ণ ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আর-এম-আই-টি) তে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছে অনেক আগে। এখন সে এসোসিয়েট প্রফেসর। বুকে সংঙ্গীতের সা- রে -গা -মা -পা আর মস্তিস্কে এন্টারপ্রিনারশিপের জটিল সব তত্ব নিয়ে অনেক ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে তার দিন কাটে। নানা রকম এওয়ার্ডে ভূষিত গুণী, অত্যান্ত মেধাবী এই শিক্ষক, ডঃ আফরীন হক শীগ্রই একদিন অস্ট্রেলিয়ার তার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরের একটি পদও লাভ করবে। কিন্তু পিতার অসীম মমতা ভরা বুকে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে খুশিতে যে চোখ ভেজাবে সে সুযোগ তার আর কোন দিন হবে না। কারণ কাকা এখন ওপারে অমর্তলোকবাসী। দিব্যচোখে আমরা কোন দিন কাকাকে আর দেখবো না। ডঃ আফরীন হক প্রফেসর হলে পিতাকে স্মরণ করে শুধু বেদনায় তার চোখ ভেজাবে, খুশিতে পিতাকে জড়িয়ে ধরে নয়। এখানেই ডঃ আফরীন হকের সাথে আমার একটু পার্থক্য।
ডক্টরের কথা যখন উঠলো তখন আমাদের পরিবারের তৃতীয় ডক্টরের নাম বাদ যাবে কেন? তৃতীয় ডক্টর হলো আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে পিএইচ-ডি করা আমার ছোট ভাই ডঃ শহিদুল হক। অত্যান্ত খুশির বিষয় হলো যে কাকা পরিবারের তৃতীয় ডক্টরও দেখে যেতে পেরেছেন।

শেয়ার করুন