ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াস’ : মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ থেকে মুজিব বাহিনী (কিস্তি : ৪০)

14

সাইফুল আলম চৌধুরী
‘বিএলএফ’য়ের যাত্রারম্ভ, মুজিব বাহিনীর বয়:প্রাপ্তি আর সর্বশেষে ক্ষয়-লয়প্রাপ্তি- পাঁচটি পৃথক ধারায় বিলীন :
২৯-৩০ মার্চ ১৯৮০ : জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের কাউন্সিল অধিবেশন ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, যাতে দলের নতুন খসড়া গঠনতন্ত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য কাউন্সিলের পূর্বে হাসানুল হক ইনুকে আহ্বায়ক মনোনীত করে বাহাত্তরে নির্মিত জাসদের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সময়োপযোগী করার উদ্দেশ্যে সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছিলো, যাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- আগামী ছয় মাসের মাঝে বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন তলব করে দলের গঠনতন্ত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। উল্লেখ্য, সেই বিশেষ কাউন্সিল প্রায় বছর খানেক পর ২৮-২৯ মার্চ ১৯৮১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আশি সালের মাঝামাঝি সময়ে জাসদে নবতর পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি জন্ম নিয়ে যাত্রারম্ভ করে। সেই সমন্বয় কমিটিতে জাসদ সমর্থিত প্রত্যেক গণসংগঠন হতে পদাধিকার বলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক- এই দুইজন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। সেই নিয়মানুযায়ী জাসদ হতে মেজর জলিল ও আ স ম আবদুর রব, শ্রমিক লীগ থেকে মোহাম্মদ শাজাহান ও রুহুল আমিন ভুঁইয়া; কৃষক লীগ হতে খন্দকার আবদুল মালেক ও হাসানুল হক ইনু; ছাত্রলীগ থেকে মুনির উদ্দিন আহমেদ ও আবুল হাসিব খান এবং ‘দায়িত্বশীল আর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন’ আরো চারজন সাথী নেতাদের- সিরাজুল আলম খান, নূরে আলম জিকু, মির্জা সুলতান রাজা ও শাজাহান সিরাজ- অন্তর্ভুক্ত করে সর্বমোট ১২ জন সদস্য বিশিষ্ট সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়েছিলো। তারা যৌথভাবে সংগঠন, আন্দোলন, কর্মসূচী নিয়ে তাত্তি¡ক পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণ নির্মাণে সচেষ্ট হন। বলাই বাহুল্য, সেই বিশ্লেষণে জাসদ এবং গণসংগঠনসমূহে ভাঙনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিলো, যার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ভ‚মিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো : “… আমাদের অনৈক্যের রূপ ও চরিত্র নির্ধারণ করার প্রশ্নে আমাদের চিন্তায় উল্লেখযোগ্য অনৈক্য বিদ্যমান। … বিতর্কের ঝড়ের ঝাপটায় আন্দোলন ও সংগঠনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল । … অনেকের কাছে অতীত (১৭ মার্চ ১৯৭৪ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও; বিপ্লবী গণবাহিনী গঠন; ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য সহকারে সিপাহী অভ্যুত্থান; ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে অপহরণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা ইত্যাদি – লেখক) একটা হাস্যরতের বিষয় হলেও … ইতিহাসের কোনো ব্যর্থতাকে … খাটো করে দেখার মধ্যে আনন্দ নেই।”
আশির দশকের প্রারম্ভেই জাসদ পুনর্গঠিত হবার ম আম-জনতার নিকট মুজিব বাহিনীর একাংশকে নিয়ে সৃষ্ঠ রাজনৈতিক দলটির প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। নানাবিধ কারণ উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
প্রসঙ্গত : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালীন সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে জাসদের আবেদন গণমানুষের নিকট হ্রাস পেতে থাকে।
দ্বিতীয়ত: নিকট সময়ের পরিধিতে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের নামে এবং ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ রাষ্ট্রদূত অপহরণের ব্যর্ত নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে হাস্যকর, বালখিল্য ও হঠকারী কর্মকা সমূহ জাসদকে গণবিচ্ছিন্ন ও অজনপ্রিয় করে তোলে।
তৃতীয়ত: স্বৈর ও সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার শাসনামলে জাসদ আর গণসংগঠনসমূহের হাজারো কর্মী-নেতাদের কারাবাস, নির্যাতন, গুম, হত্যা, ফাঁসির শিকার হবার কারণে দলে আর অঙ্গ সংগঠনে হতাশা, ক্ষোভ, দ্রোহ বৃদ্ধি পেলে অনেকেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয়তো সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়ে তৎকালীন শাসক সৃষ্ঠ দলে ভিড়ে যায়।
চতুর্থত: জাসদের কতিপয় নেতা-কর্মী ‘অস্ত্র সমর্পণ’ করে প্রকাশ্য রাজনীতির জগতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ নেয় ১৯৭৮ সালে; অনেকে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে গতানুগতিক ধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে; কয়েকজন সংসদ সদস্যও বনে যেতে সক্ষম হন।
পঞ্চমত: বিপ্লবের প্রচ তম সম্মোহনী নেশায় জাসদ-গণবাহিনীর সিংহভাগ সদস্য ও কর্মীগণ জেনারেল জিয়ার শাসনামলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে দেশান্তরী হতে আরম্ভ করে জার্মান, ফ্রান্স, বৃটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। অবশ্য পরবর্তীতে তাদের অনেকে আমেরিকা-কানাডায় ঘর-বসতি স্থাপন করে।
ষষ্ঠত: জাসদ-গণবাহিনী, সৈনিক সংস্থার অনেকে বামপন্থী রাজনীতিতে তখনো অবধি নেশাগ্রস্থ থেকে ফিলিস্তিন এবং লিবিয়া গমন করেন যুদ্ধে অংশ নেবার জন্যে। তাদের অনেকে সেইসব দেশে মানবেতর জীবন কাটিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে কপর্দকহীন অবস্থায় ফিরে আসেন, অনেকে অন্য রাষ্ট্রে গমন করেন। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত হত্যাকারী ফারুক-রশিদের ‘ফ্রিডম পার্টি’তে যোগ দেয় দিকভ্রান্ত হয়ে।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, লে: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হতে অবসরে যাবার পর নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে সী-ট্রাক ইউনিটের ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত ছিলেন, ১৯৭৩ সালের ১৩ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি লিখে আবেদন করেছিলেন প্যালেস্টাইনের যোদ্ধাগণের সঙ্গে মিলে ইসরাইলের বিপক্ষে লড়াইয়ে যোগ দিতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। সেই আবেদন পত্রে তিনি উল্লেখ করতে বিস্মৃত হননি, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে শিয়ালকোট সেক্টরে এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সর্ববৃহৎ সেক্টরের অধিনায়ক থাকাকলে ঢাকা শহর মুক্তকরণে তার অধীনস্ত তরুণ-যোদ্ধাগণ সর্বাগ্রে ছিলো।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট সমর ইতিহাসের কতিপয় বিদেশী সেনা অধিনায়কদের শারীরিক পঙ্গুত্ব নিয়েও বৃটিশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল ব্যাম ব্রাউন, জার্মান সেনাবাহিনীর জেনারেল কাউন্ট ভন স্টাউফেনবার্গ, বৃটিশ বিমান বাহিনীর ডগলাস বাদের, এমনকি যিওনিস্ট ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল মোশে দায়ান- যুদ্ধের ময়দানে লড়েছিলেন, সেইসব স্মরণে আনেন। তবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্যালেস্টাইন যাবার অনুমতি কর্নেল তাহের পেয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে ইতিহাস পুনর্পাঠে উদ্ধার করা যায়নি।
২৪ মার্চ ১৯৮০ : এই দিন জাসদের সভাপতি মেজর আবদুল জলিলকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কারা জীবন হতে মুক্তি দেয়া হয়। পূর্বে সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রবকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হলে তিনি চিকিৎসা নেবার উদ্দেশ্যে পশ্চিম জার্মান গমন করেন। উল্লেখ্য, মেজর জলিল কারাবন্দি অবস্থায় অসুস্থ হলে তাকে পিজি হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানসহ মেজর জলিলকে দেখতে যান।
১ মে ১৯৮০ : জাসদ পরিবারের কর্ণধার ও তাত্তি¡ক সিরাজুল আলম খানকে এইদিন ময়মনসিংহ কারাগার হতে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো। ‘রাষ্ট্র বনাম মেজর জলিল ও অন্যান্য’ মামলার অভিযুক্তদের মাঝে তিনি ছিলেন সর্বশেষ ব্যক্তি যিনি কারাগার জীবন হতে অব্যাহতি লাভ করেন।
ময়মনসিংহ হতে কমলাপুর রেল স্টেশন পৌঁছে তিনি সরাসরি পিজি হাসপাতালে গমন করেন আর সেখানে বেশ কিছু দিন চিকিৎসাধীন থাকেন।
সিরাজুল আলম খানের ‘স্বপ্নভগ্ন’- জাসদে ভাঙ্গন পর্বের সূচনা :
ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিরাজুল আলম খান তার রাজনৈতিক গুরু বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্যে স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র নির্মাণের নির্মোহ স্বপ্ন দেখেছিলেন, মূলধারার রাজনৈতিক প্রকাশ্য কর্মসূচী ও কর্মযজ্ঞের বৃত্তের বাইরে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’, সামান্য পরে ‘জয় বাংলা বাহিনী’ এবং ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) প্রতিষ্ঠা ছিলো তার স্বপ্নের এক একটি ধাপ উত্তরণ। একাত্তরে ভারতের মাটিতে যার নামকরণ ও পরিণতি ঘটে ‘মুজিব বাহিনী’ হিসেবে। স্মরণে রাখতে হবে, পূর্ব বাংলায় সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনসমূহের গতি পরিবর্তিত হয়েছিলো বস্তুত ষাটের দশকে, গোপন এবং প্রকাশ্য প্রক্রিয়া ও ঘটনাগুলোর মাধ্যমে। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের অপ্রতিদ্ব›দ্বী নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু এবং নেপথ্যে-নিবৃত্তে সেইসব আন্দোলন-অভ্যুত্থানে আদিঅন্তহীন ইন্ধন, সাহস, তত্ত¡াবলী, আগুন যুগিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান। বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিরোধ্য ইমেজ, আপোষহীন নেতা আর পূর্ব বাংলার আপামর বাঙালিজনের একচ্ছত্র সিংহ পুরুষের ‘কাল্ট’ নির্মাণের কারিগর ছিলেন তিনি। অথচ তার নাম, ছবি, লেখা এবং বহুল, বিস্তৃত, রহস্যময় কর্মজীবনের তথ্যাবলী এবং রাজনৈতিক বিপ্লবী বা স্বাভাবিক তৎপরতার সংবাদ দুঃখজনকভাবে একেবারেই অপ্রতুল।
সিরাজুল আলম খানের কর্মতৎপরতাকে প্রধান দুই ভাগে বিন্যস্ত করা যায়। প্রথমত: ছাত্রজীবনে ষাটের পুরো দশক এবং সত্তুরের প্রথম দুই বছর, সেই সময়ের পরিধিতে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন আন্দোলন, অভ্যুত্থান, বিপ্লব, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য স্বপ্ন ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র অর্জন।
দ্বিতীয়ত: তার জীবনের সত্যিকারের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরম্ভ হয় বাহাত্তর সালে। মোহভঙ্গ ঘটে যযখন রাজনৈতিক-সাংগঠনিক গুরু বঙ্গবন্ধুর সাথে সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হয়, দূরত্ব নির্মিত হয় নানাবিধ কারণে। দ্রোহের আগুনে দগ্ধ হয়ে অন্ধভক্ত-অনুসারী, সমর্থকদের নিয়ে জাতীয়তাবাদী ধারণাকে অগ্রসর করেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে।
বাহাত্তর থেকে আশি, মূলত নিত্যনতুন সমীকরণ-নতুন সমাজতান্ত্রিক দল গঠন- ব্রাজিলের ম্যারিগোল্লা, ভারতের শিবদাস ঘোষ, শ্রীলঙ্কার রোহানা উইজেউইরা, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারা, হলান্ডের পিটার কাস্টার্স, কার্ল মার্কস-লেলিন, মাও সে তুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন প্রমুখের বিপ্লবের তত্ত্বাবলীর এক্সপেরিমেন্ট- এমনকি বৃটিশ ভারতে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অবিস্মরণীয় সূর্যকুমার সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত প্রমুখের বিপ্লব অনুপ্রেরণা এবং ক্রমান্বয়ে সর্বহারা পার্টির ন্যায় সন্ত্রাসবাদী প্রবণতাসমূহ সিরাজুল আলম খানের চিন্তা-চেতনায়, মস্তিস্কে-মনস্তত্তে¡র এক অদ্ভুত রকমের মিশেল নির্মাণ করেছিলো। জাসদ ও গণসংগঠনসমূহের রাজনীতি তিনি আরম্ভ করলেও নিয়ন্ত্রণ শেষাবধি তার হাতে আর থাকেনি।
এই প্রসঙ্গে জাসদ রাজনীতির নৈকট্য লাভকারী লেখক, গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ‘জাসদের উত্থানপতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: “… জাসদ রাজনীতির জমিতে চাষ দিয়েছে, বীজ বুনেছে, মই দিয়েছে, কিন্তু ফসল তুলতে পারেনি। ফসল চলে গেছে অন্যের ঘরে।”
তাসের ঘরের মতো তার স্বপ্ন-স্বাদের, বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক সংগঠন ভাঙ্গতে-টুকরো টুকরো হতে আরম্ভ করে। ৩১ অক্টোবর বাহাত্তরে দলটির যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলো মেজর জলিল ও আ স ম আবদুর রব, সেই বছরের ২৩ ডিসেম্বর এম এ জলিল দলের সভাপতি আর আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন।
১৯৮৪ সালে মেজর জলিল জাসদ হতে নানাবিধ কারণে পদত্যাগ করে হাফেজ্জি হুজুরের নেতৃত্বে এগারো সংখ্যক ইসলামী দলের ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ জোটে যোগ দিলে বিবর্তিত জাসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন চিত্তরঞ্জন গুহ। সেই বছরেই জাসদ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে- মির্জা সুলতান রাজা মনোনীত হন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হন শাজাহান সিরাজ। অন্যদিকে সমান্তরালভাবে দুইভাবে বিভক্ত হয়ে ব্র্যাকেটবন্দি দলে পরিণত হয়। জাসদ (রব) সভাপতি হন আ স ম আব্দুর রব, সাথে নেন নুরে আলম জিকুকে সাধারণ সম্পাদক পদে।
১৯৮৫ সালে ‘ভারপ্রাপ্ত’ হতে মির্জা সুলতান রাজা ও শাজাহান সিরাজ নিষ্কৃতি পান। সেই বছরই রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াস’ জন্মদাতাদের অন্যতম কাজী আরেফ আহমেদ জাসদ একাংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে, সাথে নেন কুষ্টিয়ারই আরেক সন্তান ও মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষক হাসানুল হক ইনুকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
১৯৭ সালে কাজী আরেফ আহমেদ জাসদের ‘পূর্ণাঙ্গ সভাপতি’ হতে ইচ্ছে পোষণ করলে তার দলেরই বিরুদ্ধবাদী নেতাগণ কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে দল থেকে সভাপতির পদ বিলুপ্ত করে ‘সভাপতি ম লী’ বা প্রেসিডিয়াম পদসমূহ চালু করেন। জাসদের এই অংশে নেতৃবর্গের মাঝে তখন তিনি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মণি), শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মির্জা সুলতান রাজা প্রমুখ। তবে কাজী আরেফ আহমেদ প্রেসিডিয়ামের ‘এক নম্বর’ সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করা গেলো, ব্র্যাকেটবন্দি জাসদের এই অংশে হাসানুল হক ইনুর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ভীষণভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
১৯৯৭ সালে একাধিক ভগ্নাংশের জাসদ পুনর্গঠনে ‘ঐক্য প্রক্রিয়া’র উদ্যোগ নেয়া হলে আ স ম আবদুর রব সভাপতি এবং হাসানুল হক ইনু সাধারণ সম্পাদক মনোনী হয়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়।
প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ৭ নভেম্বর ১৯৮০ সালে ব্যক্তি দ্ব›দ্ব ও ব্যক্তি বলয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল তথাকথিত তাত্তি¡ক মত-পার্থক্যে প্রধান দুটি টুকরায় পর্যবসিত হয়। একটি সিরাজুল আলম খানের জাসদ, অন্যটি নতুন সংস্করণে বাজারে আসে ‘বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল’ (বাসদ) নামে। এই নবতর মেরুকরণের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্নতরো, রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্পাঠে জানা যায়, ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাস হতে ছাত্রনেতা মান্না ও আখতার ‘সমান্তরাল কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কৃত হন। সেই সময় তারা যথাক্রমে ডাকসু’র নির্বাচিত সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
জনপ্রিয় সাবেক ছাত্রনেতা আ ফ ম মাহবুবুল হক, ভারতের শিবদাস ঘোষের ‘এসইউসি-আই’ মতাদর্শের খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া ও মবিনুল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ মান্না-আখতারের পক্ষাবলম্বন করলে জাসদ জাতীয় কমিটি হতে উল্লিখিত নেতৃবৃন্দসহ হাবিবুল্লাহ চৌধুরী ও ইকরামুল হককে বহিস্কার করা হয়।
৭ নভেম্বর ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিভাকে বাসদ প্রতিষ্ঠা হলে খালেকুজ্জামান ভ্ুঁইয়া দলের আহŸায়ক মনোনীত হন। মাহবুবুল হক, মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান জাসদপন্থী ছাত্রলীগে অত্যধিক জনপ্রিয় ছিলেন বিধায় সিংহভাগ ছাত্রছাত্রী বাসদ রাজনীতির সমর্থক হয়।
সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ সালে বাসদ দুই-টুকরা হয় : একাংশের আহ্বায়ক হন আ ফ ম মাহবুবুল হক, অপরাংশে খালেকুজ্জামান ভ‚ঁইয়া থেকে যান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের পুনর্বার ভাঙন আসে এপ্রিল ২০১৩ সালে। এক পক্ষের আহ্বায়ক হলেন মবিনুল হায়দার চৌধুরী, অন্যপক্ষের বৈঠাখানি আজো অব্দি ধরে রেখেছেন খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া।
ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একীভ‚ত জাসদ থেকে পুনরায় আ স ম রব বেরিয়ে ২০০১ সালে জাসদ (জেএসডি) প্রতিষ্ঠা করে দলের সভাপতি হন, সাথে আবদুল মালেক রতনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নেন। অন্যদিকে হাসানুল হক ইনু জাসদ (ইনু)’র সভাপতি হয়ে জাফর সাজ্জাদ খিচ্চুকে সাধারণ সম্পাদক বানান। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ইনু সভাপতি আর আম্বিয়া সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাদের দলের কাউন্সিল অধিবেশনে। সা¤প্রতিক সময়ে ইনু ও আম্বিয়াও বিভক্ত হয়ে ব্যক্তিসর্বস্ব ব্র্যাকেটবন্দি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেছেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাসদ (রব) চারটি ও জাসদ (সিরাজ) তিনটি আসন পায় সংসদে। ১৯৮৮ সালে আ স ম রবের নেতৃত্বে একটি জোট সংসদে উনিশ আসন লাভ করে সম্মিলিত বিরোধী দলের নেতা হন আর জাসদ (সিরাজ) পুনরায় তিনটি আসন পায়। এই সবই ঘটেছিলো স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদের অবৈধ শাসনামলে। এই আমলে জাসদের রুহুল আমিন ভুঁইয়া, এবিএম শাহজাহান, গোলাম মোস্তফা, আবদুল মতিন মিয়া, সরদার আবদুর রশীদ, আবদুল বারেক, মকসুদ আজিজ ইবনে লামা, আবদুস সালাম, হুমায়ুন কবির, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু প্রমুখ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন।
১৯৯৬ সালে আবদুর রব আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে জাসদ আরেকবার একীভ‚ত হলেও ২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পুনরায় পৃথক হয়। এই দলের মূল নেতৃত্ব বর্তমানে হাসানুল হক ইনুর নিকট, চৌদ্দ দলীয় জোটের শরিক হয়ে ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনসমূহে ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, ইনু জোটে থেকে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার সদস্য হন।
বিপ্লবী, তাত্তি¡ক সিরাজুল আলম খানের স্বপ্নের এইভাবেই অপমৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে, তিনি রাজনীতি, তত্ত¡, দর্শন বিষয়াবলীতে অনেকটা নিশ্চুপ-নির্বাক হয়ে রয়েছেন। (অসমাপ্ত/চলবে)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও কলামিস্ট। sakil19@hotmail.com

শেয়ার করুন