জিয়ার অবৈধ ও প্রতারণামূলক শাসনের কথাও তো আছে!

48

শওগাত আলী সাগর
ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে  সুপ্রীম কোর্টের রায় এবং রায়ে প্রধান বিচারপতির এস কে সিনহার পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিএনপি মহলে বেশ একটা ‘ঈদ ঈদ’ ভাব দেখা যাচ্ছে। দলটির  নানা পর্যায়ের কর্মীরাও একধরনের উচ্ছ¡াসের মধ্যে আছে। পার্টির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের এক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল দলের এই অবস্থান প্রকাশ করেন।
আমরাও মনে করি এই সুপ্রীম কোর্টের এই রায়টি ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের রাজনীতিকে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার যে ইতিহাসটা এতোদিন বিজ্ঞজনেরা বলতেন, সেটি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি পেলো। শুধু তাই নয়, দুই দুই জন জেনারেল যে জনগণের সাথে প্রতারণা করে অবৈধ শাসনকে বৈধ করেছে সেই কথাও এই রায়ে বলা হয়েছে। অর্থাৎ মির্জা ফখরুল ইসলামের দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউর রহমান তার অবৈধ শাসনকার্যকে বৈধ করার জন্য গণভোট, ভোটে কারচুপি এমন কি বিনাভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ নানা ধরনের প্রতারণামূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন সেই তথ্যটি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নথিভুক্ত হয়ে রইলো। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে জিয়া ও  এরশাদ দুজনকেই কেবল অবৈধ শাসক নয়, প্রতারক শাসক হিসেবেও অভিহিত করা যায়। মির্জা ফখরুল রায়কে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করার সাথে সাথে আজকের বিএনপি যে শামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতারণামূলক রাজনীতির উত্তরাধিকার এই কথাটি মেনে নিয়েছেন কি না তা অবশ্য জানা যায়নি।
আদালতের রায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা  তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, “১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আমাদের কোনো গণতন্ত্র ছিলো না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর আমাদের মাত্র সাড়ে তিন বছর গণতান্ত্রিক সরকার ছিলো। এরপরই দেশ ইতিহাসের বিভৎসতম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। কেবলমাত্র জাতির পিতাই নন, দুই কন্যা বাদে চার বছরের শিশু সন্তানসহ পুরো পরিবারকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়। এরপরই দেশ বন্দুক এবং জেনারেলদের হাতে পড়ে, এরা সামরিক শাসনের মাধ্যমে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে যা চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। অবর্ণনীয় ত্যাগ এবং সংগ্রামের মাধ্যমে সামরিক জান্তাকে ক্ষমতাচুত করা হয়। ২০০১ সালে দেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে।”
লক্ষ্যণীয়, আদালত বলছেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের পর দেশ ‘বন্দুক এবং জেনারেলদের হাতে’ পড়ে। ৭৫ এর পনের আগষ্টের পরবর্তীকালের ক্ষমতাপল্লীর ইতিহাস এবং ঘটনাপ্রবাহ সবারই জানা। প্রথমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের সাথে নানাভাবে সম্পৃক্ত জেনারেলরা আড়ালে থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়লেও পরবর্তীতে তারা সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। প্রধান বিচারপতি যে “বন্দুক ও জেনারেলদের হাতে দেশ পড়ে’ বলে উল্লেখ করেছেন, জিয়াউর রহমান হলেন সেই  প্রথম জেনারেল। তিনি সামরিক শাসনের মাধ্যমে সন্ত্রাসের রাজত্বও কায়েম করেছিলেন। এই সব ঘটনা ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক সত্য। বিএনপি নেতারা সেটি কখনোই প্রকাশ্যে তো নয়ই গোপনেও স্বীকার করেন না।  প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে এই সত্য ইতিহাসটুকু বেরিয়ে এসেছে।
রায়ের পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রধান বিচারপতি দুই জেনারেল (জিয়া ও এরশাদ) এর শাসন নিয়ে আরো কিছু মন্তব্য করেছেন।  তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে দুই জেনারেল এবং তার সঙ্গী সাথীদের ‘আন হোলি এলায়েন্স অব পাওয়ার মঙ্গার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার পরই বলেছেন এরা দুইবার দেশকে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ বানিয়ে ফেলেছিলো। ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ এর ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন তার পর্যবেক্ষণে ‘যেখানে জনসাধারনকে পণ্য হিসেবে দেখা হয় এবং নিজেদের অবৈধ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য প্রতারষণামুলক কর্মকান্ডের আশ্রয় নেওয়া হয়’। দুই জেনারেলের প্রতারণামূলক কাজের উদাহরণ দিতে গিয়ে পর্যবেক্ষণে ‘গণভোট, ভোটে কারচুপি এবং ভোটার বিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জেনারেল জিয়া এবং এরশাদের জেনারেলদের শাসনামল সম্পর্কে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে,  তারা জনগণকে ক্ষমতা দেয়নি, বরং তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং তাদের ক্ষমতার খেলা প্রলম্বিত করার জন্য গণভোট, ভোট কারচুপি, ভোটার বিহীন নির্বাচনের মতো নানা প্রতারণামূলক কৌশল ব্যবহার করেছে। আর এইভাবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনীতির আবেদনটিই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’  অর্থ্যাৎ আদালত বলছেন, জেনারেল জিয় ও এরশাদের হাত দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির আদর্শিক আবেদনটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। রাজনীতি সম্পূর্ণভাকেব নষ্ট করার যিনি হোতা তার আদর্শ নিয়েই তো বিএনপির এই সময়ের রাজনীতি। বলা চলে জিয়ার নষ্ট রাজনীতির উত্তরাধিকার হচ্ছে একনকার বিএনপি।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণেও এই ভাবনার সমর্থন পাওয়া যায়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “ওই অগণতান্ত্রিক শাসনামলের (জিয়া ও এরশাদ) নষ্ট রাজনৈতিক চর্চা সাধারণ রাজনীতিকেও কলুষিত করে দিয়েছে। ফলে রাজনীতি আর মুক্ত রাজনীতিতে থাকেনি, সেটি হয়ে ওঠেছে বাণিজ্যিক পণ্য, টাকা যার গতি এবং গন্তব্য নিয়ন্ত্রণ করে।”
ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিব্রত হওয়ার কথা বিএনপির, সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা বিএনপির। কেননা বিএনপি যাকে নিয়ে, যার আদর্শের কথা বলে রাজনীতি করে সেই প্রতিষ্ঠাতা পুরুষকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ এবং প্রতারণার শাসন পরিচালনার দায়ে অভিযুক্ত করেছে, নোংরামি দিয়ে রাজনীতিকে নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছে। অথচ বিএনপি এই রায়টিকে ঐতিহাসিক বলছে, আর যতো  ক্ষোভ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে শাসক দল। তার কারণ কি?
লেখক: শওগাত আলী সাগর, টরন্টোর বাংলা পত্রিকা নতুনদেশ এর প্রধান সম্পাদক।

শেয়ার করুন