নেতা

57

তাজুল ইসলাম
নেতা কোন সাফল্যের নাম নয়, সাফল্যতো একটা বৈষয়িক বিষয়, একটা বস্তুগত ব্যাপার, সাফল্য একটা দক্ষতা। অনেক সময় চোর বাটপারওতো সফল হয়। যেটাকে সাফল্য মনে করা হয় সেটা হলো স্বার্থকতা বা ফুলফিলমেন্ট। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ পৃথিবীতে জন্মেছি তাকে পরিপূর্ণভাবে, সুচারুভাবে সম্পূর্ণ করা, সমাপ্ত করা। আসল কথা নিজের বিশ্বাসটাকে বাস্তবায়ন করা। এ বাস্তবায়নের জন্যই সকল চেষ্টা বা প্রচেষ্টা। একজন নেতার স্বপ্ন হবে, যে ব্যথায় ব্যথিত হয়ে সে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন সেই উদ্দেশ্য মাফিক তার কর্মীবহিনী এবং সাথে সাথে নিজেকেও ঐ বিশ্বাসের উপর পরিচালনা করা।কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ তার স্বার্থক জনম আমার কবিতায় লিখেছেন, “স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।স্বার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে।”
এই স্বার্থক শব্দটা আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত। নেতা সব সময় নিজেকে প্রস্তুত রাখবে, যাতে করে নেতা তার জীবন থাকা পর্যন্ত লক্ষ্যচ্যুত না হয়।
কেউ যদি নেতা হতে চায় কোন দিন সে কাউ কে মানবে না। একমাত্র মানবে নিজের বিবেককে, নিজের বিচার বুদ্ধিকে। নিজের ভিতরকার মনুষত্বকে। এটাকে যদি মান তাহলে নেতা হওয়া যায়। আজকাল সারা পৃথিবীতে নেতা শব্দটি খুবই সহজে ব্যবহার হয়।
নেতা কিন্তু কোন একটি বিশেষ মানুষ না। নেতা হচ্ছে অনেকগুলো মানুষের সমষ্টি। যে মানুষের মধ্যে অনেক মানুষ থাকে। সে হচ্ছে নেতা। আমরা কথায় কথায় নেতা বলি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতা বলি। নেতা জিনিষটা ঐভাবে আমার কাছে মনে হয় হয় না।
অনেকে মনে করে সাফল্য খুব বড় জিনিষ। আমি সাফল্যকে খুব বড় মনে করি না। সাফল্য একটা খুব নিন্ম শ্রেণীর জিনিষ। লিডারশীপ যার সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, “আমি মানি না” এই কথাটি মনে হয়। আমরা জানি আজকের এই বিরাট চীন, এই চীনকে যিনি বিরাট শক্তিতে পরিণত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন মাও সে তুং। মাও সে তুং এর যে কংগ্রেস ছিল। সেই কংগ্রেস এ তিনি যে প্রস্তাব তুলতেন, তোলার পর জিজ্ঞেস করতেন “আপনারা কি এতে সবাই রাজি? না কারো কোনো এ বিষয়ে দ্বিমত আছে”।
সবাই বলতো রাজি, শুধু একজন ছোট্ট বেটে এতটুকু মানুষ ছোট্ট একটা হাত উঁচু করে বলতেন “আমি মানি না।” মাও সে তুং বলতেন “দেং এখনো তুমি আমার বিরুদ্ধে।” সেই দেংই কিন্তু মাও সে তুং এর পরবর্তি চীনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই মানুষই নেতৃত্ব দিতে পারে যে বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। হযরত মোহাম্মদ (স:) যখন আরবে এলেন তখন সেইখানে ইশ্বর কত জন ছিল? কতগুলো পুতুল ছিল? ৩৬০টি ঈশ্বর রূপি ভুত ছিল। হযরত মোহাম্মদ (স:) কাউকে মেনেছিলেন? একজনকেও না। ইনি হচ্ছেন নেতা, যিনি যেটা অযৌক্তিক, যেটা অগ্রহণযোগ্য, যেটা অসন্তোষজনক, যেটা ভুল, যেটা মিথ্যা, সেটার প্রতিবাদ করতে পারেন।
গৌতম বুদ্ধ যখন আসেন তখন জাতিভেদ প্রথা হিন্দুদের মধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারন করেছিলো। তিনি সেই জাতিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গ্যালিলিও, কোপারনিকাস কারো কথা শুনেছিলেন? সে যুগের ক্রিশ্চিয়ান চার্চকে মেনেছিলেন? মানেন নাই।
রবীন্দ্রনাথ কি মাইকেলের মতো কবিতা লিখেছিলেন? নজরুল কি রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা লিখেছিলেন? জীবনানন্দ দাশ কি নজরুলের মতো কবিতা লিখেছিলেন? নেতা কোনদিন আরেক জনের মতো হয় না। নেতা সেই ব্যক্তি যে একা এবং আলাদা।
রবার্ট কে. গ্রিনলিফ তাঁর বই The Servant as Leader-এ বলেছেন, “কল্পনা শক্তি হচ্ছে এমন কিছু যা একজন নেতাকে নেতৃত্ব দেয়, একজন নেতাকে পথ দেখায়। যখন তিনি তার এই কল্পনা শক্তিকে হারিয়ে ফেলেন এবং অন্য ঘটনা দ্বারা চালিত হতে বাধ্য হন তখন তিনি কেবল নামমাত্র নেতা। এই কল্পনা শক্তি বা ভবিষ্যৎ জানতে পারার জ্ঞান এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে নেতৃত্বের পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করে।”
সকল মহান নেতারই একটি করে উদেশ্য ছিল যা তারা সম্পন্ন করেছেন। সেই স্বপ্নই তাদের প্রতিটি চেষ্টার পিছনে শক্তি জুগিয়েছে। তাদেরকে অন্য সব সমস্যা অতিক্রম করার শক্তি দিয়েছে। একজন নেতা একটি সুন্দর স্বপ্ন সাথে নিয়ে সব জায়গায় যান এবং এটি একটি সংক্রামক চেতনার মতো যা সকলের আত্মাকে স্পর্শ করে। তারপর সকলে সেই একই চেতনা নিয়ে নেতার পাশে দাঁড়ায় ও এগিয়ে যায়।
একটি উদেশ্যকে অনুধাবন করতে একতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সানন্দে বহু ঘণ্টার শ্রম দেওয়া যায় সেই লক্ষ্য পূরণে। ব্যক্তিগত চাহিদা একপাশে সরিয়ে রাখা হয় কারণ তার চেয়ে ঐক্যবদ্ধ দলের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রকৃত নেতা হতে হলে ব্যাক্তিগত চাহিদার উপরে উঠে যেতে হয়। তখন নিজের চাওয়া পাওয়ার কিছু থাকে না।
নেতা সকলের চাওয়া-পাওয়াকে সর্বাগ্রে নিয়ে আসে এবং সেটাকে বাস্তবায়ন তার একমাত্র ব্রতী হয়ে উঠে। সময় চলে যায়, আদর্শ জেগে ওঠে, নায়োকচিত গল্প বলা হয় এবং স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার ধীরে ধীরে বাস্তবে জেগে ওঠে। কেন? কারণ নেতার একটি সমাজ পরিবর্তনের কল্পনা শক্তি আছে!
একবার হেলেন কেলারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “অন্ধ হয়ে জন্ম নেওয়ার চেয়ে খারাপ কী হতে পারে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “দৃষ্টি আছে কিন্তু স্বপ্ন নেই।”
দুঃখের বিষয় হচ্ছে অনেক লোকদেরই একটি পরিকল্পিত স্বপ্ন ব্যতীত সংগঠনের নেতৃত্ববান পদে বসানো হয় এবং তাদের থেকে নেতৃত্ব আশা করা হয়। সহজ কোথায় নেতৃত্বের সৃষ্টি করা হয় না, উপর থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয় বা নেতা বানানো হয়। আর তারাই সমাজে সব অপকর্ম করে বেড়ায়। সকলের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজে অনধিকার চর্চা করে। নিজের ভোগ বিলাসের জন্য গড়ে তুলে বিশাল ধন সাম্রাজ্য।
উদেশ্য ব্যতীত, শক্তি নিম্নগামী, সময়সীমা অনুযায়ী কাজ হয় না, ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে, উৎপাদন নিম্নগামী এবং লোকজন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, এদিক-ওদিক চলে যায়। আসলে তাদেরকে কেউ মনে রাখে না। মানুষ খুব কৃতজ্ঞ জাতি। তারা যার কাছ থেকে পায় তাদের কথা যুগের পর যুগ শতাব্দীর পর শতাব্দী মনে রাখে।
সকল মহান নেতাই দুই জিনিষের অধিকারী ছিলেন: তারা জানেন তারা কোথায় যাচ্ছেন এবং তারা অন্যদেরকে নিজেদের অনুসারী করতে সক্ষম।
যদিও বিশ্বে কল্পনাশক্তি শব্দটি গত কয়েক দশক ধরে অতিমাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে, তবুও এটার কার্যকারিতা সম্পূর্ণ অক্ষত। একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রথম কাজ হচ্ছে লোকজনকে তাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য একটি বাক্যে বোঝানো। অন্যরা আপনার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাবে যদি আপনি আপনার রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্দেশ্য বলতে না পারেন। এজন্য একটি সংগঠন তাদের অনুসারীদের তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়।
আপনার রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য কেন একটি উদ্দেশ্য থাকা দরকার? এটার দুইটি কারণ আছে। প্রথমত, সংগঠনের করণীয় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, যার দিকে সমগ্র রাজনৈতিক সংগঠনের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে। এটা একটি পরিষ্কার বাক্য যা এই অস্থির সমাজ ব্যবস্থায় উজ্জ্বল হয়ে আগামী প্রজন্মকে ডেকে আনবে। এটাই নেতার বেঁচে থাকার প্রকৃত কারণ।
থিওজের হেসবুর্গ বলেছেন, “নেতৃত্বের জন্য একটি ভিশন থাকা অত্যাবশ্যক যা আপনি প্রতিটি উপলক্ষ্যে স্পষ্টভাবে ও জোরালোভাবে উপস্থিত করবেন। আপনি অনিশ্চিত কোন কারণে বিজয় ডঙ্কা বাজাতে পারেন না।”
যার ভিশনের অভাব রয়েছে কিংবা যে অন্য কারও স্বপ্নের নেতৃত্ব দিতে চায় , সেই ব্যক্তিই অনিশ্চিত কোন কারণে বিজয় ডঙ্কা বাজায়।
কিন্তূ যে তার নিজের ভিশনের নিশ্চিত কারণে বিজয় ডঙ্কা বাজায়, সেই প্রকৃত নেতা। অনুসারীরা তাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে।
বহু মহান ব্যক্তি তাদের জীবন দারিদ্র্য থেকে আরম্ভ করেছে। তাদের জন্ম হয়েছিল কুঁড়েঘরে। অল্প শিক্ষা ও বিশেষ কোন সুবিধা ছাড়াই। থমাস আ. এডিসন ট্রেুনে সংবাদপত্র বিক্রি করতেন। এন্ড্রু কার্নেগি মাসে ৪০০ ডলার বেতনে কাজ আরম্ভ করেন। জন ডি. রকফেলার মাসে ৬০০ ডলার বেতনে কাজ আরম্ভ করেন। আব্রাহাম লিংকন একটি একঘরের বাসায় জন্ম গ্রহণ করেন, কিন্তূ অবিস্মরণীয় ব্যাপারটি হচ্ছে, তিনি সেই একঘরের বাসা থেকে বের হয়ে দেখিয়েছেন।
ডিমসদেনেস প্রাচীন পৃথিবীর একজন মহান বক্তা ছিলেন, অথচ তার তোতলানোর সমস্যা ছিল! প্রথমবার যখন তিনি লোকজনের সামনে বক্তৃতা দিলেন, সামনে বসা লোকজন তার বক্তব্য শুনে হেসেছিল। জুলিয়াস সিজার ছিলেন একজন মৃগীরোগী। ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়নকে এখন অনেকেই ভাগ্যবান ও প্রতিভাবান বলে কিন্তূ তিনি এগুলো থেকে বহুদূরে ছিলেন। সেনা একাডেমির ৬৫জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৬তম ছিলেন তিনি।
বিঠোফেন ছিলেন বধির, থমাস এডিসনও তাই। চালর্স ডিকেন্স ছিলেন পঙ্গু, হেনডেলও তাই। হোমার ছিলেন অন্ধ, প্লেটো ছিলেন কুঁজো, স্যার ওয়ালটার স্কট ছিলেন প্যারালাইজড।
এই মহান পুরুষদের ভেতরে কী ছিল যা তাদেরকে এমন কঠিন সব বাঁধা অতিক্রম করে সফল করেছে? এই ব্যক্তিদের মধ্যে প্রত্যেকেরই মনের ভেতর একটি স্বপ্ন ছিল। যে স্বপ্ন আগুনের মতো জ্বলতো। এই আগুন তাদেরকে বাধার সামনে হার মানতে দেয়নি। মহান কল্পনা শক্তির আরম্ভই হয় একজন ব্যক্তির ভেতর থেকে।নেতা তখনি স্বার্থক যখন রিক্ত সিক্ত হাতে একটা জাতির হৃদয়ের ভালোবাসায় আজীবন সিক্ত হতে পারেন।
নেপোলিয়ন হিল তার ‘Think and grow rich’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আপনার কল্পনা ও স্বপ্নগুলোকে লালন-পালন করুন যেন এগুলো আপনার আত্মার সন্তান; আপনার চরম সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার মানচিত্র।’
একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তি একটি কল্পনাশক্তিকে দেখে কেবল কল্পনার চোখে। সেই ব্যক্তির কাছে কেবল কল্পনাশক্তিই যথেষ্ট।
স্বপ্নটিই যেন কাজ করবে। তিনি এটা বুঝতে ব্যর্থ যে, কল্পনাশক্তির একটি সমর্থন বা আশ্রয় লাগে।
সেই সমর্থন বা আশ্রয় হচ্ছে আপনি স্বয়ং। আপনার একটি ভিশন আছে, তারমানে আপনাকে প্রথমে সেই কল্পনাশক্তির যোগ্য হয়ে দেখাতে হবে।
একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি জানেন, লোকজন ভিশন গ্রহণ করার আগে নেতাকে দেখে। অভিজ্ঞ নেতারা বোঝেন লোকজনের চরিত্র হচ্ছে পরিবর্তনশীল ও স্বপ্নগুলো হচ্ছে ঠুনকো। কিন্তু লোকজন যা দেখে তা ভুলে না। লোকজন যদি দেখে নেতার মধ্যে সেই দৃঢ়সংকল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সে কাজেও সেই কল্পনাশক্তিকে তুলে ধরেছে, তবেই লোকজন নেতাকে ও তার ভিশনকে বিশ্বাস করবে ও নেতাকে তার কাজগুলো করতে সমর্থন দিবে। নেতা হতে হলে তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
তাজুল ইসলাম, এম আর টি (রেডিওলোজি)

শেয়ার করুন