বিদায় নায়করাজ

78

আতোয়ার রহমান
আমার ছোটবেলায় রংপুরে তিনটি সিনেমা হল ছিল। এখন এগুলোর একটি কাপড়ের গোডাউনে পরিণত হয়েছে। যতদুর মনে পড়ে সত্তরের দশকের শেষের দিকে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লক্ষী সিনেমা হলে রাজ্জাক অভিনীত মতিমহল ছবিটি দিয়ে আমার প্রথম সিনেমা দেখা শুরু।স্কুল পড়ুয়া কয়েক বন্ধু মিলে আমরা তখন প্রায়ই সিনেমা দেখতাম-সেগুলোর অধিকাংশই ছিল রাজ্জাক অভিনীত। সঙ্গদোষে একইদিনে দুটো সিনেমাও দেখেছি। এভাবে আমি তো ছোটবেলা  বেড়ে উঠেছি রাজ্জাক-কবরির ছবি দেখে দেখে।
কিশোর বয়সে অভিনয়শৈলী বিষয়ে তেমন ধারণা না থাকলেও আমরা তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকতাম। এভাবে কিশোর বয়সে শুরু করে পরবর্তীতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর প্রচুর ছবি দেখেছি। ষাটের দশকে অভিনয় শুরু করা রাজ্জাকের ক্যারিয়ার তখন মধ্যগগনে। ততদিনে তাঁর অভিনয়ের উত্তাপ পুরান ঢাকার ফুটপাত থেকে গুলশান ধানমন্ডির  বেডরুম-কর্ণফুলীর বুকে  ডিঙি  নৌকার মাছধরা মাঝি থেকে সকালের সোনালি রোদ গায়ে মেখে লাঙল-গরু নিয়ে আলপথ ধরে সবুজ মাঠের দিকে চলা দিনাজপুরের চাষি তথা সারা বাংলা টের পেয়েছিল।
বহুমুখী চরিত্রের অভিনয়ে তাঁর খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী, হয়েছিলেন সমকালের মানুষের স্বপ্নপুরুষ, জীবন্ত কিংবদন্তি।
ততদিনে বাংলার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নায়করাজ’। সুদর্শন ও রমনীমোহন অভিনেতা হিসেবে রাজ্জাক সে সময়ের দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন। আমি একজন ‘নায়করাজ’ রাজ্জাকে বুঁদ ছিলাম, আছি এখনও।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করার পর অল্প কয়েকবার আমার হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে। তার পর ধীরে ধীরে সিনেমা দর্শক হিসেবে রিটায়ার করেছি। তাই আমার গøামারের ধারণা রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, ফারুক সোহেল রানার যুগে দাঁড়িয়ে আছে। রাজ্জাক-কবরি যুগের পরও যে দেশে সিনেমা হয়েছে, হয়ে চলেছে, সেসব আমার মন মানতে চায় না।
পর্দায় নায়করাজের ঠোঁট মেলানো অনেক গানই আমাদের মুখস্ত ছিল।  প্রায় পাঁচ দশক পরও তাঁর অভিনীত ছবির গান এখনও বেজে ওঠে  শ্রোতাহৃদয়ে। ‘মনের মতো বউ’ ছবিতে গাওয়া রাজ্জাকের  গান ‘আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো’ ‘নীল আকাশের নিচে’ ছবির টাইটেল গান ‘নীল আকাশের নীচে আমি রাস্তায় চলেছি একা/নীল সবুজের শ্যামল মায়ায় দৃষ্টি পড়েছে ঢাকা’ একই  ছবির আরেকটি গান ‘প্রেমেরই নাম বেদনা’ ‘নাচের পুতুল’ ছবির অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ ‘সমাধি’ ছবিতে গাওয়া ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা/আমি দুনিয়া ছাড়ি যেতে পারি, তোকে আমি ছাড়ব না’Ñ বাংলা চলচ্চিত্রে মাকে নিয়ে করা অন্যতম জনপ্রিয় এই গান ‘আমি কার জন্য পথ চেয়ে রবো, আমার কি দায় পড়েছে?’ নায়িকার এমন কথার জবাবে নায়কের উত্তর, ‘আমার অনেক কাজ ছিল তাই তো আসতে দেরি হয়েছে, কিছু মনে কোরো না’।  ‘অমর প্রেম’ ছবির এই গানসহ আরও অনেক গান আমাদের ঠোঁটে ঠোঁটে ঘুরতো। অনেক গানের কলিই এখন আর আমার মনে নেই।  তাঁর ঠোঁট মেলানো গানগুলো  লক্ষ কোটি গলায়-
মুখে মুখে ফিরছে আজো।
ঢাকাই ছবির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় তথা রোমান্টিক  জুটি হচ্ছে রাজ্জাক-কবরী। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ ছবিতে এ জুটিকে দর্শক পর্দায় প্রথম দেখেন। এ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পাওয়ার পর দুজন জুটি হয়ে অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন।  এ জুটির মুখের প্রেমময় সংলাপকে পর্দার এ পাশের প্রেমিক-প্রেমিকারা সবসময়ই নিজের বলে মনে করেছেন। নিজেদের জীবনের আবেগীয় মুহূর্তে সেসব সংলাপ প্রয়োগ করেছেন। এখনো করে থাকেন। পৌরষদীপ্ত চেহারার অভিনেতা রাজ্জাক আর মিষ্টি হাসির মধু ছড়ানো কবরীর সিনেমাগুলোকে অনুসরণ করেই কাটিয়ে দিয়েছি  জীবনের অনেক বর্ণিল  বসন্ত। রাজ্জাক-কবরী জুটির পর্দায় প্রেমপূর্ণ ক্ল্যাসিক সংলাপগুলো একসময় প্রেমিকদের মুখস্থ ছিল। প্রেমের সুখ-দুঃখ অথবা খঁনসুটি দুটোই নান্দনিক অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন রাজ্জাক-কবরী জুটি। ‘স্মৃতিটুকু থাক’ ছবির ‘মনতো ছোঁয়া যাবে না’ অথবা ‘আবির্ভাব’ ছবির ‘আমি নিজের মনে নিজেই যেন গোপনে ধরা পড়েছি’ অথবা ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির ‘প্রেমের নাম বেদনা, সে কথা বুঝিনি আগে/ দুটি প্রাণের সাধনা কেন যে বিধুর লাগে’ এগুলো সমকালীন প্রেমিক প্রেমিকাদের হৃদয় গাঁথা ছিল।উঠতি বয়সের প্রেমিক প্রেমিকাদের প্রতিকে পরিনত হয়েছিলেন এ জুটি। এরকম কোন প্রেমিককে দেখলে তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হত ‘রাজ্জাক রাজ্জাক ভাব, শুধু কবরির অভাব’। এরপর বাংলা চলচ্চিত্রের এই সুদর্শন অভিনেতা জুটি গড়েছেন ববিতা, শাবানাসহ সে সময়কার প্রায় সব জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সাথে? তবে দর্শকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল রাজ্জাক-কবরী জুটি।বাঙালি মাত্রেই রাজ্জাক-কবরী জুটির অপূর্ব আবেদন থেকে বের হয়ে আসার কোনো পথ নেই।
সাদাকালো যুগের রাজ্জাককে স্ক্রিনে দেখলে মনে হতো একজন শিল্পীর শিল্পের বিকাশ দেখছি। মনে হতো অভিনয় ছাপিয়ে তিনি শিল্পের বিকাশ ঘটাচ্ছেন তার চোখ-মুখ আর বাঁচনভঙ্গিতে। বার বার নিজেকে ভেংগেছেন, পরিনত হয়েছেন বেস্ট ভার্সনে। রোমান্টিক থেকে অ্যাকশন হিরো- প্রতিক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ।
আমাদের কিশোর কচি মানস্পটে যে একজন ভাল মানুষের চিত্র ভেসে উঠত-একজন প্রতিবাদি সৎ সাহসী মানুশ- নায়করাজ তাঁর অপূর্ব অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে সেই চিত্রটিই নিপুণতার সাথে ফুটিয়ে  তুলতেন। তিনি তাঁর অভিনয়গুণে, তাঁর চরিত্র চিত্রণের গুণে, তাঁর স্নিগ্ধ সুন্দর একটা ভাবমূর্তির কারণে একটা আলাদা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন দর্শক হৃদয়ে।
তিনি দায়িত্ব নিয়ে অভিনয় করতেন। অভিনয়শিল্পটাকে তিনি অন্তরে গ্রহণ করেছিলেন। অভিনয়কে একটা সামাজিক দায় হিসেবে নিয়েছিলেন। অভিনয়ের মাধ্যমে বারবার তিনি সাংস্কৃতিক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে  বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের রেনেসাঁ বা পুনরজাগরণ তাঁর মত স্বল্প কয়েকজনের হাত ধরেই ঘটেছিল। স্বাধীনতার পর শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা ঢাকাই চলচ্চিত্রকে নায়করাজ  রাজ্জাক তার নিপুণতায় গণমানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
বৈচিত্র্যময় ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন পাঁচ শতাধিক  চলচ্চিত্রে? রাজ্জাকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘অবুঝ মন’ মধু মিলন, অনন্ত প্রেম, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বেঈমান’ ওরা এগারজন, অশিক্ষিত?
স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে বাংলাদেশে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সূচনাও ঘটান রাজ্জাক?
নায়করাজ বিদায় নিলেন। অনন্ত ঘুমের দেশে পাড়ি জমালেন। আজ আর উনি শারীরিকভাবে পৃথিবীতে নেই। কিন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের এই রাজপুত্র আমাদের মনের মনিকোঠা থেকে কোন দিনই হারিয়ে যাওয়ার নন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাতায় রাজ্জাক এক আশ্চর্য মিথ হয়েই বেঁচে থাকবেন। আয়নাতে আর ওই মুখ দেখা হবে না। অশ্রু দিয়ে লেখা এ নাম তবু ভুলে যাবো না।
লেখকঃ গল্পকার

শেয়ার করুন