বিয়ের গল্প নয়, বিয়ে হওয়া না হওয়ার গল্প!

151

ফাহমিনা জাহান
ইদানীং প্রায় রাতেই ইমতিয়াজ সাহেব ঘরে একাকী পায়চারি করেন। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কখনো কি ভেবেছেন! দেশ ছেড়েছেন ২২ বছর আগে, ছোট্ট ৬ বছরের শামা এবার ২৮ বছরে পা দিল। এত যোগ্য মেয়ে! টরেন্টোর নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর করে দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কানাডার অন্যতম প্রধান এক ব্যাংকে। বাঙালি মুসলিম পরিবেশে বেড়ে উঠা মেয়ে, বাবা-মায়ের কথা ভেবে সব ছেলেবন্ধুদের কিছুটা এড়িয়ে গেছে। এখন বিয়ে দিতে হবে। একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন যোগ্য ছেলে পেতে হবে! পরের চোখে মেয়ে দেখতে যেমনি হোক, বাবার কাছে তো সে রাজকন্যা। দীর্ঘ প্রবাসজীবন বাড়িয়েছে দূরত্ব দেশে থাকা বন্ধু পরিজনের সাথেও এখন কার কাছে চাইবেন মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র।
একই অবস্থা সাবেরা খানম এর। ছেলে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে এখন আইটিতে ভালো চাকরি করছে। উনি চান পুত্রবধূ যেন বাঙালি হয় আর উনার সাথে যেন বাংলায় কথা বলে। আর ছেলে তো পরিষ্কার জানিয়েই দিয়েছে এদেশে বেড়ে উঠা মেয়েই তার পছন্দের একমাত্র মাপকাঠি।
ইমতিয়াজ ভাই এবং সাবেরা আপা বিস্তর টাকাকড়ি খরচ করে কয়েকটা মিডিয়ার সাথে যোগাযোগ করেছেন। বড়ই অসহায় বোধ করেছেন যখন দেখেছেন এসব টাকা হাতিয়ে নেয়ার এক অভিনব কৌশল মাত্র! বিয়ে যে হচ্ছে না তা নয় তবে সংখ্যায় খুবই নগণ্য। সে যাই হোক। ইদানিং ইমতিয়াজ ভাই এবং সাবেরা আপা অল্প বিস্তর ফেসবুক চালান। হঠাৎ একদিন নজরে এল “BCCB Matrimony: Heavenly Match” পেইজটি । একটু অবাক হলেন তো বটেই! এই যুগে টাকাপয়সা ছাড়া এইরকম সার্ভিস, কিছু ভুল দেখছেন না তো! অনেক দ্বিধা পেরিয়ে একসময় সদস্য হলেন এবং কিছুটা ভয় ও আশা নিয়ে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলেন। নিমেষেই ৮/১০টা বায়োডাটা হাতে এল। আহা! একটু যেন আশার আশার আলো। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে এই গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে টাকা পয়সার লেনদেন মুক্ত।
এমনি অনেক আশা জাগানিয়া গল্পের শুরু আজ। বিসিসিবি জার্নি অব হোপের অন্যতম অঙ্গ সংগঠন “বিসিসিবি ম্যাট্রিমনি: হেভেনলি ম্যাচ”। একটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এর যাত্রা শুরু কিছুটা ভিন্ন পরিসরে। বিসিসিবি অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের এর মত ম্যাট্রিমনি এতটা জনপ্রিয় হয়ত এখনো নয়, তবে সেই দিন খুব দূরেও নয় আশা করি।
একটু ফিরে দেখা, “বিসিসিবি” (BCCB, Bangladeshi Canadian – Canadian Bangladeshi) এখন বাংলাদেশিদের এক প্রাণের সংগঠন। কেউ একজন ভাবলেন এই ইমিগ্রান্টবহুল দেশে প্রতিটা দেশের একটা করে বিশাল সংগঠন আছে যার নিচে সবাই এক হয়, কথা বলে, সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়, একে অন্যকে সাহায্য করে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশিদের তো এমন কিছু নেই! আমাদের সংগঠন অনেক, কিন্তু একটা বড় ছাতা কই! আমাদের বাচ্চারা কি শুধু অন্য দেশের বন্ধুদের সাথেই বেড়ে উঠবে? আমাদের আদর্শ, সংস্কৃতি কি তারা জানবে না? সেই ভাবনা থেকেই জন্ম আজকের এই বিসিসিবির আর সেই কেউ একজন হলেন রিমন মাহমুদ। এর অনেকগুলো অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে বিসিসিবি স্পোর্ট, বাই এন্ড সেল, শেয়ার এন্ড কেয়ার, জব সাপোর্ট, বিসিসিবি উইমেন গ্রূপগুলো অন্যতম। “কেন এই বিসিসিবি ম্যাট্রিমনি: হেভেনলি ম্যাচ” এমনি এক প্রশ্নের জবাবে এক ভিডিও বার্তায় বিসিসিবির ফাউন্ডার রিমন মাহমুদ বলেন, “আমি আমার বাবাকে দেখেছি আমার বোনের পাত্র খুঁজতে মউনি কতটা অসহায় ছিলেন। একশ টা প্রস্তাব “না” হয়ে একটা প্রস্তাব “হ্যাঁ” হবে, সেই একটা “হ্যা”-এর জন্যই আমরা কাজ করে যাব। ”
কিভাবে এই গ্রুপের কার্জক্রম পরিচালিত হয়? যে কোন “বাংলাদেশি” চাইলেই এই গ্রুপে যোগ দিতে পারবেন। অ্যাডমিন গ্রুপ কিছুটা নিরীক্ষা করে সদস্যপদ অনুমোদন দেয়। সদস্য হওয়া মাত্রই যে কেউ পাত্র-পাত্রি চেয়ে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। কেউ নিজে দ্বিধান্বিত থাকলে অ্যাডমিন গ্রুপের সহায়তা নিতে পারেন। বিসিসিবির ফাউন্ডার রিমন মাহমুদের সার্বিক তত্তাবধানে ফরহাদ আহমেদ মিশু ও মাহজাবিন মুস্তাফা (Directors, BCCB Matrimony) হিসেবে গ্রুপের কার্জক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। এর সাথে Relationship Manager হিসেবে আমি ছাড়াও আরও আছেন এহসানুর ইমন, এজারুল ভূঁইয়া, হিমেল দত্ত, মোহাম্মদ মসিহুজ্জামান, আবুল আহসান পিন্টু, সায়মা হাসান, সুস্মিতা তাসফিন এবং জিল জানাহাইন জায়গীরদার। বর্তমানে গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।
এ প্রসংগে ফরহাদ আহমেদ মিশু বলেন “শুরুতে এই গ্রুপ শুধু নর্থ আমেরিকার ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করলেও এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে কোন প্রান্তে অবস্থানকারি বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত।” সম্প্রতি একজন সুযোগ্য পাত্রের মা আবেগাপ্লুত হয়ে আমাকে ফোনে জানান “তোমরা যে কত মহৎ উদ্যোগ নিয়েছ তা শুধু ভুক্তভোগী বাবামায়েরাই বুঝতে পারছেন”। সবার ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমরা দুই পক্ষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজটা করি। সৃষ্টিকর্তার পুর্বনির্ধারিত এই সম্পর্ক স্থাপনের আমরা এক মাধ্যম মাত্র – এই মহত লক্ষেই স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্যস্ত কর্মজীবনের ফাঁকেই নিষ্ঠার সাথে কাজটি করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি কিছু সাফল্যের সংবাদ আমরা পাচ্ছি , তবে অনেক সাফল্যের সংবাদ আমাদের অজানা আছে যতক্ষন না কেউ শেয়ার করছেন। তাই সবার প্রতি বিশেষ অনুরোধ রইল এই গ্রুপে যারা রয়েছেন যদি কোন সাফল্যের সংবাদ জানা থাকে তবে শেয়ার করুন, এতে আমরা অনুপ্রাণিত হব আরো ভালো কিছু করার। আমি সবাইকে আহ্বান করবো এই গ্রুপে যোগ দিয়ে বা এই গ্রুপের কথা জানিয়ে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের জন্য সাহায্যের একটি মহৎ দ্বার উন্মোচন করতে। আপনাদের যে কোন পরামর্শ, সুচিন্তিত মতামত আমাদের অগ্রযাত্রার পাথেয়।
লেখক: ফাহমিনা জাহান, রিলেশনশিপ ম্যানেজার, বিসিসিবি ম্যাট্রিমনি

শেয়ার করুন