মাত্র দশটি কদম হাঁটতেও অনীহা!

24

সাজ্জাদ আলী
আমার উচ্ছাস তখন গ্রেড নাইনে পড়ে। আমি নিয়ম করে ওকে স্কুলে নামিয়ে দি, আবার ছুটি হলে বাড়িতে নিয়ে আসি। নেওয়া-আনার এই কাজটুকু করে আমি এক অনির্বচণীয় আনন্দ পাই। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলঅব্দি রাস্তাটুকুতে যানজটের কোন ঝামেলা নেই। গাড়ি চালানোর গতিবেগ সাপেক্ষে ৯ থেকে ১১ মিনিট সময় যাতায়াতে ব্যয় হয়।
টরন্টো শহরের নিম্ন-মাঝারী আয়ের বাসিন্দাদের বসবাসের এলাকায় একটি সাধারণ বাংলো বাড়িতে আমাদের আবাস। বাড়িটির সাইজ রাস্তার অন্য আর দশটা বাড়ির সমমানের হলেও ড্রাইভওয়েটি বেশ লম্বা, তা ৫০/৬০ ফিট হবে। গ্রীস্মে এই দীর্ঘ ড্রাইভওয়ের পাতা ঝাট দেওয়া এবং শীতে বরফের আচ্ছাদন পরিচ্ছন্ন রাখার কি যে ঝক্কি, সে একমাত্র আমিই জানি। এই সাফ-সুতোরের বিষয়টি নিয়ে চমৎকার একটি গল্প আছে। তবে সেটি আজ না, আরেকদিন বলবো। আজ বলছিলাম আমার ছেলের কথা।
একদিন স্কুল থেকে গাড়ি করে ফেরার পথে উচ্ছাস তার স্বভাবসুলভ বকবক করছিলো। জান আব্বু আজ না ফুটবল গ্রাউন্ডে টম এন্ড জেনিফার ফট, জেনিফারই আগে টমকে পুশ করেছে! মি: ইলিয়ড না ঠেকালে ব্লাডসেড হয়ে যেত! আজ আর কোন খেলাই হয়নি, পুলিশও এসেছিলো (টম ও জেনিফার ওর সহপাঠি, আর ইলিয়ট শিক্ষক)। গাড়ি চালাতে চালাতে অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, বাবা ফুটবল মানে তুই কোন খেলাটার কথা বলছিস বলতো? যেটা পা দিয়ে খেলে সেটা তো? আরে না আব্বু, তোমাকে আর কতবার “ফুটবল” শেখাবো বলোতো? ফুটবল হাত দিয়েই খেলা হয়, অ্যামেরিকান ফুটবল! মনে থাকবে তো? হা থাকবে, বললাম আমি।
ওর বন্ধুদের মারামারি নিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়িতে পৌঁছে গেছি আমরা। ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করে আমি নেমেও পড়েছি। কিন্তু উচ্ছাস নামছে না! গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে ওকে বললাম, নেমে পড় বাবা! সে বললো তুমি সব সময় এতটা দূরে গাড়ি পার্ক করো কেন? আরেকটু সামনে পার্ক করলেইতো আমার হাঁটা লাগে না! ওর কথা শুনে আমি তো হাঁ! বলে কি ফাজিলটা? গাড়িটা ড্রাইভওয়ের যেখানটায় পার্ক করেছি, সেখান থেকে বাড়ির বারান্দার সিড়ি ১৫ ফিটের মতো পথ। তবে আরো দশফিট সামনে এগিয়ে পার্ক করলে উচ্ছাস গাড়ি থেকে পা বাড়ালেই সিঁড়ি। এই ১০ ফিট দুরত্ব হাঁটা নিয়ে ওর এই অনুযোগ!
গাড়ির খোলা দরজায় এক হাত, আরেক হাত ড্রাইভিং সিটে রেখে দাঁড়িয়ে আমি। মুহুর্তের জন্য ফিরে গেলাম আমার স্মৃতিজ্জ্বল কৈশোরে, ঠিক উচ্ছাসের আজকের বয়সটিতে। কত কথা, কত গাঁথা মনে এলো ক্ষণিকের জন্য। তবে ওকে কিছুই বললাম না। ড্রাইভিং সিটে বসে দশ ফিট গাড়িটি সামনে এগিয়ে ছেলের কমফোর্ট নিশ্চিত করলাম।
এর ক’দিন বাদেই খাবার টেবিলে উচ্ছাস বলছে, আব্বু তোমার স্কুলে ফুটবল খেলা হতো না? বললাম হতো বাবা, তবে আমরা কিন্তু ফুটবল পা দিয়েই খেলতাম! হা তাতো খেলবেই, তোমাদের তো আবার ইউরোপিয়ান ফুটবল! প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললাম, আমি কিভাবে স্কুলে যেতাম-আসতাম সেটা শুনবি? হা হা বলো না আব্বু। খুব উৎসাহ নিয়ে চেয়ারে দু’পা উঠিয়ে কনুই ডাইনিং টেবিলে ঠেকিয়ে মুখে হাত দিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে বসলো ছেলেটি।
শোনরে বাবা, তুইতো আমার দাদীর বাড়িতে, মানে তোর গ্রেট গ্রান্ডমায়ের বাড়িতে গিয়েছিস! মনে আছে তো না? হা আব্বু মনে আছে। বাড়ির সামনেই বিশাল সেই হানড্রেড ইয়ার ওল্ড ট্রি! তুমি যেন ওটাকে কি বলো? শতবর্ষী গাছ, তাইনা? বললাম হা, শতবর্ষীই বটে। তো ওই বাড়ি থেকে আমি প্রথম হাই স্কুলে যাওয়া শুরু করি। তুই তো জানিস আমাদের দেশে গ্রেড সিক্স থেকে হাইস্কুল শুরু হয়। তারমানে আমি তখন খুবই ছোট, তোর মতো দামড়া ছিলাম না। “দামড়া” কি আব্বু? সে আরেকদিন শুনিস, এখন যেটা বলছি সেটা শোন।
তো আমার দাদীর বাড়ি থেকে ওড়াকান্দি হাইস্কুলটি, যেখানে আমি পড়তাম তা আড়াই মাইল দুরবর্তী। আড়াই মাইল মানে তোর হিসাবে চার কিলোমিটার। ধর আমাদের বাসা থেকে তোর স্কুলটি যতটা দুরে, তার থেকে অন্তত তিনগুণ বেশি পথ। তুই তো দেখেছিস বাবা, আমার দাদীর বাড়িতে রাস্তাঘাট নেই, আর সেই আমলে তো অবস্থা আরো খারাপ ছিলো। কৃষিজমির মধ্য দিয়ে হেঁটে চলাচল করতে হতো। তো প্রতিদিন সকালে আমি সেই ৪ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতাম, আবার সেই একই পথ হেঁটে বাড়িতে ফিরতাম। স্কুলে রওনা হলে তোর দাদী আর আমার দাদী দুজনে সেই শতবর্ষী গাছটির তলায় দাঁড়িয়ে থাকতেন, যতক্ষণ না আমি হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের চোখের আড়ালে চলে যেতাম।
আনমনে বলে চলেছি আমি…! আর আমার কৈশরকে যেন হাঁ করে যেন গিলছে আমার ছেলেটি। কি জানিস বাবা, দাদীর বাড়ি আর ওড়াকান্দি স্কুলের মাঝে “মাছকান্দি” নামের একটি গ্রাম আছে। সে গাঁয়ের শেষ প্রান্তে একটি মন্দির ছিলো। মন্দিরটির পাশ দিয়েই স্কুলে যাবার পথ। “মন্দির” কি আব্বু, প্রশ্ন উচ্ছাসের? হিন্দু ধর্মালম্বীদের প্রার্থণা ঘর, যেমন ধর খৃষ্ঠানদের গির্জা। তো সেই মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে দাদী বলে দিয়েছিলেন যে, আমার পোতা স্কুলে যাওয়া আসার পথে তোমার মন্দিরে বসে কিছুক্ষণ জিড়োবে, তুমি তার ব্যবস্থা রেখ।
এক মিনিট আব্বু! আমাকে থামিয়ে উচ্ছাস বললো, “পুরোহিত”, “পোতা”, আর “জিড়োবে” এই শব্দগুলো না আমি কমিউনিকেট করতে পারিনি। বললাম পুরোহিত হলো প্রিষ্ট, পোতা মানে গ্রান্ডসান আর জিড়োবে মানে হলো রেষ্ট নেবে। ওকে ওকে, তারপর বলো। তুমি কি ওই মন্দিরে রেষ্ট নিতে? না, কোনদিনই না, বললাম আমি। কেন রেষ্ট নিতে না আব্বু? বললাম বাবা, ওই বয়সে এটুকু পথ হেঁটে রেষ্ট নিতে হবে কেন? বরং কি করতাম জানিস? বিকেলে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরেই বইখাতা ছুঁড়ে ফেলে বল নিয়ে খেলার মাঠে দৌঁড় পাড়তাম।
তখন আমার মমতাময়ী দাদী মাঠঅব্দি পিছু পিছু ছুটতেন, আমাকে ফিরিয়ে এনে কিছু একটা খাইয়ে দিবেন বলে। আর তোর দাদী স্বভাব মতো তাঁর সদা-রক্তবর্ণের চক্ষুদ্বয়ের বিস্ফোরণে আমার সেই কৈশর-চাঞ্চল্যকে ভষ্ম করতেন। এটুকু বলে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে আমি উঠে পড়লাম। উচ্ছাস বললো তারপর আব্বু? বললাম, আজ এটুকুই থাক বাবা। কতশত স্মৃতি, সব কি আর একদিনে বলা যায়, আরেক দিন শুনিস।
আমার ছেলেটা হঠাৎ যেন তার বয়সের সাথে সাযুজ্যহীনভাবে গম্ভীর হয়ে গেল। বললো, আব্বু আরেকটু বসোনা প্লিজ। বসলাম আমি। খানিকক্ষণ চুপ থেকে সে ইঁচড়েপাকার মতো বললো, আব্বু ড্রাইভওয়ের যেখানে খুশি সেখানেই তুমি গাড়ি পার্ক করো, আমার আর কোনদিন ওটুকু হাঁটতে অসুবিধা হবে না! আমি উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম ছেলেটিকে! বললাম, তা কেন বাবা! তোর চাওয়া মতো জায়গায়ই আমি গাড়ি পার্ক করে যাবো সারাজীবন!
(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

শেয়ার করুন