মুক্তিযোদ্ধা সনদ

58

আকতার হোসেন
নাড়ি ছিঁড়ে রক্তাক্ত হওয়া নবজাতক মায়ের বেদনা যেমন অন্য কেউ অনুভব করতে পারে না তেমনি স্বাধীনতা অর্জনে দেশবাসীকে যে ত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল সেটা স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে অংশ না নেয়া গোষ্ঠীর অধিকাংশদের বুঝবার কথা নয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস সরকারি বেসরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক কাজে যে সমস্ত বাঙালি কর্মচারী কর্মকর্তারা কর্মরত ছিলেন তারাই যুদ্ধ পরবর্তী নতুন দেশের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এদের দাপ্তরিক সিল মোহর এবং হাতের স্বাক্ষরে চলতে শুরু করেছিল একটি নতুন দেশ। তাই স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মান সম্মান মর্যাদা নিয়ে এদের কোন মাথা ব্যথাও ছিল না। যদিও বিবেকদ্বারা তাড়িত ব্যক্তিরা ছিলেন এর ব্যতিক্রম।
যখন সরকারী সিদ্ধান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলো, নব্য গঠিত সরকারে অন্তর্ভুক্ত এই সমস্ত কর্মচারী কর্মকর্তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে বাণিজ্য করার গন্ধ পেতে শুরু করল। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে করত ‘সাধারণ দর্শনপ্রার্থী’ কিংবা ‘ক্লাইণ্ট’। যাদের হাতে গড়া দেশ তাঁদের অধীনস্থ মনে করেনি নিজেকে কখনো। কিছুদিন যেতে না যেতেই চাহিদা ও মুনাফার হার বুজতে পেরে এরাই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে অসাধু পন্থায় হাত হাতিয়েছে বেশি। এই বাণিজ্যের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি-পক্ষ ও যুদ্ধকালীন সময়ে সুবিধা বঞ্চিতদের দায়ী করে লাভ নেই। মুজিব নগর প্রবাসী সরকারের সাথে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা যোগদান করেছিলেন। সংখ্যার দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে অর্থাৎ ইস্ট পাকিস্তান ও ওয়েস্ট পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন অধিকাংশ কর্মচারী কর্মকর্তা। এরা পাকিস্তান আমল থকেই পাকিস্তানী সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং যুদ্ধের পরও এদের অধিকাংশ সেই পাকিস্তানের কর্মচারীই থেকে গেছেন।
এ কথা সত্য যে যারা দেশের জন্য লড়াই করেছেন, প্রাণ দিয়েছিলেন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তাঁরা মুক্তি ও স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোন পুরস্কার আশা করেনি। কোন সনদ নেবার চিন্তা তাঁদের মাথায় কখনো ছিল না। তাসত্তে¡ও যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার চেয়েছিল দেশের সূর্য সন্তানদের একটি তালিকা করে রাখতে। এই তালিকায় থাকবে সেই সমস্ত ব্যক্তিদের নাম যারা সেক্রেটারিয়েটের সিলিং ফ্যানের নিচে কিংবা শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে না থেকে মাঠে-ঘাটে বাজারে-বন্দরে পাকিস্তানী সৈন্য ও পাকিস্তানী ভাবাপন্নদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করেছে। অর্থাৎ হাতিয়ার হাতে নিয়ে যুদ্ধ করা সৈনিকদের নামের একটি সঠিক তালিকা করতে চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকার (অনেক দেশে এদের বলা হয় ওয়ার ভেটেরান)। এমন একটি সদিচ্ছাকে মোটেও ভুল সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে না। কিংবা এর পেছনে কোন অসৎ উদ্দেশ্য খোঁজার সুযোগও নেই। এই কাজটি করার উদ্যোগ না নিলে আজ প্রতিটি শিক্ষিত নামধারী এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা ছিঃ ছিঃ করতো। বলতো আমরা আমাদের বীরদের পরিচয়টুকু জানি না! আরো বলা হতো আমরা এতোই ক্ষুদ্র মনের মানুষ যে স্বাধীন হবার সাথে সাথে দেশ গড়ার কাজে লেগে গেলাম আর বেমালুম ভুলে গেলাম কারা এই দেশটাকে জীবন বাজী রেখে শত্রু মুক্ত করে দিল, ইত্যাদি। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার মধ্যে দোষের কিছু ছিল বলে মনে করি না। দোষ ছিল এই কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আচরণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার।
“মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট’ এই শব্দ দুটো উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আজকাল অনেকের মধ্যে একটা তাচ্ছিল্য ও ঘৃণার ভাব চলে আসে। অথচ এদের সন্তানেরা নাচ গানের স্কুল থেকে কোন সার্টিফিকেট পেলে ফেসবুকে ভাসিয়ে দেন। তাদের যে চার পাঁচশো অনুসারীরা তাতে লাইক দেন তাঁদের অনেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট দেবার বিপক্ষে দাঁড়ান। চিন্তার দ্বৈততা থাকার কারণে অনেকেই ‘মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট’ নিয়ে এক হাত লিখে দেন। আমরা সেগুলো বসে বসে পড়ি।
বয়সের কারণে আজ হয়তো অনেকে ভুলে গেছেন যে স্বাধীনতার পর ঢালাও ভাবে যে সমস্ত ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে তাঁর অন্যতম হলো; ব্যবসা বাণিজ্যের পারমিট (যেমন তিব্বত কোহিনূর সামগ্রীর পারমিট), বাংলাদেশী পাসপোর্ট (যুদ্ধাপরাধী পাচার, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত), লাইসেন্স (ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স), সার্টিফিকেট (এস এস সি, এইচ এস সি) ইত্যাদি। লোক মুখে প্রচলিত যে অসদুপায়ে প্রাপ্ত এসমস্ত সার্টিফিকেটধারী, লাইসেন্সধারীরা আজও সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। আদতে এদের কেউ কেউ নিজেরাই এখন সমাজ। মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সার্টিফিকেটধারীদের নিয়ে অনেক গল্প আছে। কিন্তু উপরোক্তদের বেলায় আমরা মুখে খিল দিয়ে বসে থাকি। আমরা সাহস করে এদের দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলি না। বলি না যে তোমার এই দশ তালা দালানের ভিত্তি ছিল পারমিট জালিয়াতি। অথবা আজকের যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসর রয়েছে, তার মুলে ছিল নকল লাইসেন্স। বরং এই সুযোগ গ্রহণকারীরাই আমাদের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ ‘বড় লোক’ আত্মীয়। ওদের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারলে আমরা ধন্য হতে থাকি। অথচ সবকিছু ভুলে গিয়ে দোষ দেওয়া হচ্ছে সরকারি সিদ্ধান্তে প্রদান করা মুক্তিযোদ্ধা সনদকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সনাক্ত করার পরিকল্পনাকে দোষ দেওয়ার কারণ আমি বুঝতে পারি না। এই কাজে কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বলেও মনে করি না। একটা দেশে কয়টা নদী আছে, বন বিভাগের অধীনে কয়টা গাছ আছে কিংবা সুন্দর বনে কয়টা বাঘ আছে তার হিসাব থাকতে পারলে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থাকবে না কেন? এখনতো দেশের ষোল কোটি নাগরিক নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের সব নাগরিকদের তালিকার আওতায় আনার কাজ চলছে। এরই মধ্যে থেকে কতজন নারী, কতজন পুরুষ, কতজন স্কুলগামী কতজন বিবাহিত সব ডাটাবেজে তুলে ধরা হচ্ছে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থাকতে দোষ কোথায়?
আশা করি কেউ আবার সেই তর্ক শুরু করবেন না যে রাজাকারদের তালিকা নেই কেন, কেন নেই শহিদের তালিকা? এর জবাব অনেকবার দিয়েছি। একটা নেই দেখে অন্যটা থাকবে না, এমন তর্ক মীমাংসা করতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আমিও চাই রাজাকারদের তালিকা করা হোক। স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের নামের তালিকা থাকুক। তারও যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজন আছে। তবে শহীদদের তালিকা করতে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের যেন বাদ দেওয়া না হয়। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। যার মধ্যে অনেকেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারাই সরাসরি শত্রুর সাথে বন্দুক যুদ্ধ করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা মারা যাবার আগে একটা হলেও শত্রুকে খতম করতে চেষ্টা করেছে। খতম হতে হতে এক পর্যায়ে পাকিস্তানীদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণের সময় ঘনিয়ে আসে। পাকিস্তানীরা অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে হাত উঠিয়ে ফেলে। তারই মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানীদের হাতে আমাদের মৃত্যুভয় চিরতরে শেষ হয়ে যায়। সমাপ্ত হয় নয় মাসের যুদ্ধ। কাজেই মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ যারা দেশকে মুক্ত করলো তাঁদের নাম পরিচয় জানা আমাদের প্রয়োজন এবং এর মধ্যে লজ্জার কী আছে বোধগম্য নয়।
আবারো বলছি এই তালিকা প্রস্তুত করার সিদ্ধান্তে আমি কোন ভুল দেখি না। ভুল হলো এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অযোগ্যতা, অসাধুতা, হীন উদ্দেশ্য ইত্যাদি। সর্বোপরি প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা। এক কথায় বলা যেতে পারে পকেটে আফিমের মত হারাম রুজি ঢুকিয়ে আজ যারা মহা কোটিপতি হয়ে বসে আছেন সেই সমস্ত সিল ছাপ্পরমারা স্বাক্ষরকারী সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তারাই যত নষ্টের গোড়া। অতীত থেকেই এরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পৃথিবী যত বড় তার থেকেও বড় এরা। এরা ছোট মাছ খায় না, ছোট চেয়ারে বসে না। এদের আছে নানা কিসিমের ভ্রুকুটি। এরা আগে আগে এগিয়ে যায় পিছে যায় এদের অনুরাগী। যুদ্ধে না যাবার গ্লানি এরা অনুভব করে না। এদের মধ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অংশের জন্য কোন মমতা নেই। এরা মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের জন্য হাত তুলে দোয়া করে না। উচিৎ ছিল স্বাধীনতার পর বুড়িগঙ্গায় এই সমস্ত চেতনা বিহীন সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের সকাল সন্ধ্যা ডুবিয়ে রাখা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বা যুদ্ধে অংশ নিয়েও যারা নকল সনদ প্রদানের মত অন্যায় কাজে অংশ গ্রহণ করেছিল তাদেরকেও ‘এখনো পাকিস্তানী কর্মচারী’ এই চিন্তার মানুষদের পাশাপাশি দুই ঘণ্টা করে ডুবিয়ে রাখা উচিৎ ছিল। অন্যথায়, বিভিন্ন কারণে যুদ্ধে যাবার ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও সংসার পরিজনদের রক্ষার কারণে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও যারা সকাল সন্ধ্যা শত্রুকে তিরস্কার করেছে এবং যুদ্ধরত সন্তানদের জন্য দোয়া ও সাহায্য করেছে, উপরোক্তদের তাঁদের অধীনস্থ করে রাখা হতো উত্তম কাজ।
যে ব্যক্তি সত্যিকার পরহেজগার সে যেমন পাপ কাজ করে না। তেমনি যে সত্যি সত্যি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সে নিজ হাতে মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের অসম্মানের যায়গায় ঠেলে দিতে পারে না। অথচ তাই হয়েছে বলেই অনেকে আজ ‘মুক্তিযোদ্ধা সনদ’ নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। কেউ একজন মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যদি জাল সার্টিফিকেট নিয়ে প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা নিতে থাকে তার জন্য যারা সত্যিকার যোদ্ধা তাঁরা কিংবা তাঁদের সনাক্ত করার পদ্ধতি দোষের ভার নিবে কেন? আজকাল প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী নাজেহাল। ইমামের বেইমানি কাজ। তাই বলে কি কেউ স্কুল কলেজে যাবে না, দাঁড়াবে না কোন ইমামের পিছনে? ভুয়া সার্টিফিকেট অনেকে নিয়েছে সত্য, তাই বলে সেটা মহামারি আকার ধারণ করে নাই যে তাকে ঘৃণা করতে হবে।
কাজেই কেউ যদি বলেন কেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে হবে আমি বলবো আপনি হিসাব করে দেখেন জীবনে কতবার জন্মদিন পালন করেছেন। কতবার সন্তানদের জন্মদিনে লোক সমাগম করেছেন। কতবার উঁচু গলায় পরিবারের কারোর গৌরব গাথা উচ্চারণ করেছেন। কতবার গর্ব করেছেন প্রিয়জনের কোন উত্তম কাজের জন্য। আপনি কিংবা আপনার ভাই ব্রাদার স্ত্রী কন্যা কতবার মৃত ব্যক্তিদের নামে দোয়া খায়ের করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারাও (জীবিত কিংবা মৃত) কারো না কারো সন্তান। বাংলাদেশের কোন না কোন অঞ্চলে ছিল তাঁদের বাস। তাঁদের তালিকা থাকলে কিংবা বলতে চাই নির্ভুল তালিকা যদি আজ থাকতো (যা আজও তৈরি করা সম্ভব হয়নি) তবে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরে যথাযথভাবে উচ্চারিত হতো তাঁদের নাম। এই উচ্চারণে, এই স্মরণের মধ্য দিয়ে সবচাইতে উপকৃত হত দেশ ও দেশের নাগরিক। যারা মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের একটাই মাত্র স্বপ্ন ছিল, কবে মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি। এর থেকে বেশি অন্য কিছু নয়। মুক্তিযোদ্ধারা লোভী ছিল না। তাঁদের কোন দাবীও ছিল না। নিজের বাঁচা মরা নিয়ে কোন চিন্তা ছিল না তাঁদের। তাইতো ওরা বাঙ্কারে থেকেছে, ব্রিজ উড়িয়েছে, গ্রাম বাঁচিয়েছে, শত্রুর ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে। ওদের ছিল শুধু আমাদের মুক্ত করার চিন্তা।
আজ যদি কোন মুক্তিযোদ্ধা মনে করেন দেশই তাঁর বড় সনদ। বাংলাদেশের মানচিত্রই তাঁর সার্টিফিকেট, কোন কাগুজে সার্টিফিকেট তাঁর প্রয়োজন নেই। তিনি যদি প্রশ্ন করেন কত বড় এই সরকারী সার্টিফিকেট, আমার অবদান যত বড় তার থেকে কি বড়? তাই চাই না আপনার সনদ। অবশ্যই তাঁর সেই ইচ্ছাকে পূরণ করতে হবে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জোর করে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিতে কেউ বলছে না। যার ইচ্ছে সে নিবে যার ইচ্ছে সে নিবে না। অনেকে বলেন, কবে বনে জঙ্গলে গিয়ে যুদ্ধ করেছি সেটার ফিরিস্তি আজও কেন দিতে হবে। অথবা বলেন দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি, যুদ্ধ শেষ তো আমার কাজও শেষ। যায়গা যায়গাতে গিয়ে কেন বলতে হবে আমি যুদ্ধ করেছি। এমন চিন্তা কেউ কেউ করতেই পারেন। যেমন অনেক চিত্র নায়িকা একসময় চুল উড়িয়ে দর্শক পাগল করে নেচে দুলে গেয়েছেন ‘চুল ধইরো না খোপা খুলে যাবে হে নাগর’ আজ তাদেরই কেউ কেউ সেই আকর্ষণীয় চুল আবৃত্ত করে রাখছে। এতে দোষের কিছু নেই। এক সময়ের পেশা ও কৃতকর্মের জন্য কারো কারো দুঃখ থাকতেই পারে। ইচ্ছে করেই কেউ আড়ালে চলে যেতে পারেন। কিন্তু দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে কেন তাঁদের চিহ্নিত ও সম্মান করার ব্যবস্থা থাকবে না, যারা ইতিহাসের সব চাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
আমার বাবা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ডিসচার্জ সার্টিফিকেট এখনো আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এমনি অনেক দলিল নথি থাকে আমাদের সকলের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ করে কেউ কারো মুখ কালা করে নি। চুরি ডাকাতির জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেওয়া হয়নি। দিয়েছে জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কাজের স্বীকৃতি। কাজেই সনদ প্রদানে কোন অসম্মান আছে বলে আমি মনে করি না।
আমার রক্তে যার রক্ত এবং আমার রক্ত যার রক্তে বহমান আমরা নিজেদের মধ্যে সে খবর রাখি। তবুও একটা বার্থ সার্টিফিকেট সযত্নে রেখে দেই গোপন বাক্সে। সার্টিফিকেট থাকলেই যে তা বুকে লাগিয়ে ঘুরতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। বরং সার্টিফিকেট না দেওয়াকে মনে করি নিয়ম বহির্ভূত কাজ। এবং এই কাজ শতভাগ নির্ভুল ও সত্য হতে হবে।
যিনি সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা তিনি কিন্তু প্রশাসনের কাছে গিয়ে বলবেন না, আমি মুক্তিযোদ্ধা না, তবুও আমাকে একটা সনদ প্রদান করুন। ব্যাপারটা বড়ই বেখাপ্পা। বরং যিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না তিনি গিয়ে হয়তো মিথ্যা বলবেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা আমাকে সনদ দেন। এখন দোষ কার। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যিনি তাঁর? একটু হিসাব করে দেখুন। তালিকা না থাকলে বুঝবেন কি করে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে মুক্তিযোদ্ধা না। কী করে জানবেন নিজের জান বাজী রেখে কে আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন বাঁচিয়েছে? নাকি এসব কিছুই জানার দরকার নেই। বছরে দু’একবার মিথ্যে গান গেয়ে গেলেই হবে, ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’।

শেয়ার করুন