রজনী হলো উতলা

96

ফরিদ আহমদ
বুদ্ধদেব বসুর বয়স তখন মাত্র আঠারো বছর। তাঁর লেখা প্রথম গল্প প্রকাশিত হলো ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। গল্পটার নাম “রজনী হলো উতলা”। কোথায় উতলা হয়ে সবাই তাঁকে বাহবা দেবে, তা না, তার বদলে অদ্ভুত সব অভিযোগ আসতে থাকলো তাঁর বিরুদ্ধে। প্রথম অভিযোগ এলো অশ্লীলতার অভিযোগ। এই অভিযোগ অবশ্য পরবর্তী জীবনেও তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে।
এই গল্পের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার প্রথম অভিযোগ করলেন বীণাপাণি দেবী নামের এক ভদ্রমহিলা। আত্মশক্তি পত্রিকায় তিনি কঠোর ভাষায় লিখলেন, “এমন লেখককে আঁতুড়েই নুন খাইয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল।” ভাগ্যিস তাঁর কথা কেউ শোনেনি বুদ্ধদেবের জন্মের সময়। নইলে বাংলা ভাষার দ্বিতীয় সেরা সাহিত্যিককে আঁতুড়েই মারা যেতে হতো। তাঁর সৃষ্ট বিপুল এক সৃষ্টিভাণ্ডার দেখার সুযোগ আর আমাদের হতো না।
আরেক ভদ্রমহিলাও রেগেমেগে লিখলেন, “লেখক যদি বিয়ে না করে থাকে তবে যেন অবিলম্বে বিয়ে করে, আর বউ যদি সম্প্রতি বাপের বাড়িতে থাকে তবে যেন আনিয়ে নেয় চটপট।” ভদ্রমহিলার ইঙ্গিত পরিষ্কার। হরমোনজাত আবেগ নির্গমনে ব্যর্থ হয়েই যে বুদ্ধদেব বসু এইসব অশ্লীল লেখা লিখছেন, সেটা জানিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কসুর করেননি তিনি।
অশ্লীলতার মানদকাজেই এ নিয়ে আসলে বলার বিশেষ কিছু নেই। তবে, তাঁর এই লেখার বিরুদ্ধে অদ্ভুত এবং মারাত্মক এক অভিযোগ নিয়ে এলেন নির্মলকান্তি ধর নামের একজন ব্যক্তি। তিনি ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় চিঠি লিখে অভিযোগ করলেন যে, বুদ্ধদেব বসুর এই গল্পটি চৌর্যবৃত্তির ফসল। স্টেফান জোয়াইগ এর ঊৎংঃবং ঊৎষবনহরং নামের গল্পগন্থের প্রথম গল্পের সাথে বুদ্ধদেব বসুর রজনী হলো উতলা গল্পটার হুবহু মিল রয়েছে বলে তিনি জানালেন। বুদ্ধদেব বসু অশ্লীলতার অভিযোগ আনা দুই ভদ্রমহিলার বিরুদ্ধে কিছু না বললেও, নির্মলকান্তি ধরের অভিযোগের উত্তর দিলেন। নবশক্তি পত্রিকায় তিনি চিঠি লিখে জানালেন, তাঁর গল্প জোয়াইগের কোনো গল্পের নকল নয়। এর কারণ হিসাবে তিনি বললেন, রজনী হলো উতলার প্রকাশকাল হচ্ছে ১৯২৬ আর জোয়াইগের বইটা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩১ সালে। পাঁচ বছর পরে প্রকাশ হওয়া কোনো বইয়ের গল্পের নকল করা যে সম্ভব না কারো পক্ষে, সেটা সকলেরই বোঝা উচিত।
‘রজনী হলো উতলা’ গল্পটা কল্লোলে প্রকাশিত হবার পরপরই সরাসরি এবং সবচেয়ে স্থূল ভাষায় একে আক্রমণ করলেন সজনীকান্ত দাস। তিনি তাঁর পত্রিকা “শনিবারের চিঠি”-তে অতি-আধুনিক সাহিত্যকে ব্যঙ্গ করে একটা নাটিকা লিখলেন। নাটিকাটার নাম ‘ঙৎরড়হ বা কালপুরুষ’। নিজের নামে অবশ্য তিনি এটা লিখলেন না, লিখলেন কেবলরাম গাজনদার ছদ্মনামে। শুধু এ করেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। রবীন্দ্রনাথকে দীর্ঘ এক পত্র লিখে এই সব ছাইপাশ অশ্লীল অতি-আধুনিক লেখার বিরুদ্ধে প্রতিকার করার জন্য আহ্বান জানালেন। সজনীকান্তের সেই আহ্বানে কিছুটা সাড়াও দিয়ে ফেললেন রবীন্দ্রনাথ। অনেকটা একমত হয়েই চিঠির উত্তর দিলেন তিনি। সজনীকান্তের পত্রের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছিলেন, তা হচ্ছে এরকম:
“আধুনিক সাহিত্য আমার চোখে পড়ে না। দৈবাৎ কখনো যেটুকু দেখি, দেখতে পাই, হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে। আমি সেটাকে সুশ্রী বলি এমন ভুল কোরো না। কেন করিনে তার সাহিত্যিক কারণ আছে, নৈতিক কারণে এস্থলে গ্রাহ্য না-ও হতে পারে। আলোচনা করতে হলে সাহিত্য ও আর্টের মূলতত্ত্ব নিয়ে পড়তে হবে। এখন মনটা ক্লান্ত, উদভ্রান্ত, পাপগ্রহের বক্রদৃষ্টির প্রভাব – তাই এখন বাবাত্যার ধুলো দিগদিগন্তে ছড়াবার সখ একটুও নেই। সুসময় যদি আসে তখন আমার যা বলার বলব।”
নোবেল পুরস্কার পাওয়া পঞ্চান্ন বছর বয়েসী সাহিত্যিক, যিনি তখন বাঙালিদের কাছে প্রায় দেবতার আসনে বসে গেছেন, তাঁকে তাঁর এই বক্তব্যের জন্য রেহাই দিলেন না আঠারো বছরের সদ্য তরুণটি। অত্যন্ত শালীন কিন্তু কঠিন ভাষায় রবীন্দ্রনাথকে প্রতি আক্রমণ করলেন তিনি। প্রগতি পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু লিখলেন,
“যদিও ‘আধুনিক সাহিত্য’ তাঁর ‘চোখে পড়ে না’, তবুও তাতে ‘হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে’ বলে মত দিয়েছেন। আব্রু ঘুচে যাওয়ার বিরুদ্ধে কী সাহিত্যিক কারণ আছে তা রবীন্দ্রনাথ জানালেও পারতেন। সে কি এই যে, ভদ্র শ্রেণী-উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা হওয়া এতকাল যাঁদের একচেটে সৌভাগ্য ছিলো – ও নিম্নস্তরের লোকের মধ্যে সাহিত্যের দিক দিয়ে যে-ব্যবধান এতকাল ছিলো, তা হঠাৎ খসে গেছে, না এই যে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র যেসব জিনিশ ইঙ্গিতমাত্র করেছেন, আধুনিকেরা সেইটেই একটু স্পষ্ট করে বলেছেন? গোগলের আমলে রুশীয় নাটক-নভেলে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচার ভিন্ন কোনো লোক স্থান পেতো না; সেই ব্যবধান লঙ্ঘন ক’রে চেখব গর্কী নিশ্চয়ই মহাপাতক করেছেন? যুবনাশ্বের গল্প যে ভালো নয়, তার একমাত্র কারণ কি এই যে, তাঁর চরিত্রগুলি পুরানো আমলের জমিদার বা বালীগঞ্জ নিবাসী ব্যারিস্টার নয়?”

শেয়ার করুন