সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বুদ্ধের স্বর্ণ জাদী

41

সোনা কান্তি বড়ুয়া : বাংলার প্রকৃতির অপরুপ রুপ নিয়ে আমার দেশ আমার পরম তীর্থভুমি এবং স্বর্ণ মন্দির (জাদী বা চৈত্য) বান্দরবন পাহাড়ে বিরাজমান। বিগত ১৮ই ফ্রেব্রুয়ারি (২০১৯) বান্দরবন পাহাড়ে বুদ্ধের স্বর্ণ মন্দিরে বৌদ্ধ জগতের মাঘী পূর্ণিমা মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধর্ম যার যার, মেলা সবার। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দুয়ার খুলে গেছে স্বর্ণ মন্দিরে! অহিংসার বিশ্বমানবতায় উদ্ভাসিত ধরণীতল। জয় বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি বান্দরবনের পাহাড়ে স্বর্ণ জাদী বৌদ্ধ মহাবিহার। দেশ বিদেশের হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃস্টান পর্যটকগণ অবাক বিষ্ময়ে অবলোকন করেন সোনালী বুদ্ধমূর্তি যে এত দৃষ্টিনন্দন আর এত আকর্ষণীয় হতে পারে, তা এখানে না এলে অজানাই থেকে থেকে যেত।মানুষ জাতির ইতিহাসে মুসলমান যে মানব, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ও সেই মানব। দুর্ভাগ্যবশত সম্প্রতি বাংলাদেশে পঞ্চম শ্রেণীর ইসলামিক পাঠ্য পুস্তকের ষোল ও সতের পৃষ্ঠায় উক্ত বইয়ের লেখকগণ অমুসলমান মানব জাতির বিরুদ্ধে গালাগাল লিপিবদ্ধ করে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াচ্ছেন। “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব ঘোর কুটিল পন্থ তার লোভ জটিল বন্ধ।” জনতাসহ আমরা সদাশয় গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের নিকট উক্ত ঘটনার সুবিচার কামনা করি। সোনার বাংলার সোনালী মন্দিরে (জাদী) বসে বাংলাদেশের মানবতার কথা মনে পড়ে। বিশ্বকবির ভাষায়,আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনিতুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননীওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরেতোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে! …আজ দু:খের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণীতোমার অভয় বাহে হৃদয় মাঝে হৃদয় হরণী।ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে।তোমার দোয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে। বাংলাদেশে সারস্বত ঐতিহ্যতত্ত্বের মর্মভেদী উত্তরাধিকার বৌদ্ধধর্মের মহাপন্ডিত মহামহোপাধ্যায় বৌদ্ধ ভিক্ষু উ পঞা জোতা মহাথের উক্ত স্বর্ণ জাদী মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা যিনি চ্ট্টগ্রাম কোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়ে বৌদ্ধভিক্ষু হয়েছেন। গৌতমবুদ্ধ ২৬০০ বছর পূর্বে মাঘী পূর্ণিমায় নিজের (বুদ্ধের) মৃত্যু দিবস তিন মাস পরে বৈশাখী পূর্ণিমায় মহা পরিনির্বান দিবস ঘোষণা করেছিলেন। সকল মানুষ মৃত্যুর অধীন এবং সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনাই বৌদ্ধদের মৈত্রী ভাবনা। বিগত ১৮ই ফেব্রুয়ারি (২০১৯) এক ভাব গম্ভীর বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিবেশে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশের ভিক্ষু সংঘের কাছ থেকে ত্রিশরনসহ পঞ্চশীল প্রার্থনা, নিমন্ত্রিত বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে সঙ্ঘ দান, পিন্ডপাত প্রদান, নিমন্ত্রিত উপাসক উপাসিকাগণকে আহার প্রদান এবং পুণ্যানুমোদনের পুণ্য অনুষ্ঠানসমূহ সুচারুভাবে সুসম্পন্ন হয়। আশি বছর বয়সে পরম পূজনীয় গৌতমবুদ্ধ মহাপরিনির্বান লাভ করলেন। পূজনীয় বুদ্ধের ভাষায়, ‘অতএব, আনন্দ, তোমরা আত্মদ্বীপ হয়ে, আত্মশরণ হয়ে, অনন্যশরণ হয়ে বিহার (জীবন যাপন) কর, ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ, অনন্যশরণ হও। আনন্দ, কিরূপে ভিক্ষু আত্মদ্বীপ, আত্মশরণ, অনন্যশরণ; ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ, অনন্যশরণ হয়ে বিহার করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় : “হে বিদায় শেষ, হে বিদায় অনিমেষ হে সৌম্য বিষাদ! দাঁড়াও ক্ষণেক স্থির পদতলে নমি শির তব যাত্রাপথে, নি:শব্দে আরতি করি নিস্তব্দ জগতে।” রাজা অজাতশত্র“র ছেলে উদয়ভদ্রের জন্ম হলে তিনি তাঁর পিতা বিম্বিসারকে মুক্ত করতে কারাগারে গিয়ে দেখেছিলেন তাঁর পিতা মৃত। পিতৃশোকে কাতর হয়ে রাজা অজাতশত্রু আবার বুদ্ধের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বুদ্ধ তাঁকে (অজাতশত্রু) শ্রামণ্যফল সূত্র দেশনা করার মাধ্যমে নির্বানলাভের পথ প্রদর্শন করেন। গৌতমবুদ্ধের মহাপরিনির্বানের (মৃত্যু) পর তিন মাস ব্যাপী রাজগীরের সপ্তপর্ণী গুহায় রাজা অজাতশত্রু প্রথম বৌদ্ধ মহা সঙ্গীতির সকল ব্যয় ভার বহন করে বৌদ্ধজগতের ধন্যবার্দাহ হয়েছেন বিশ্বকবির ভাষায় : “তিনি (গৌতমবুদ্ধ) জন্মেছেন মানবের চিত্তে, প্রতিদিন তিনি জন্মাচ্ছেন, প্রতিদিন তিনি বেঁচে আছেন।” যাঁরা প্রতাপবান, বীর্য্যবান তাঁদের সংখ্যা পৃথিবীতে বেশি নয়। অনেক মানব, রাজা, ধনী মানী ও রাষ্ট্রনেতা এ পৃথিবীতে জন্মেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ মনুষ্যত্ব নিয়ে কতজন এসেছেন? যিনি সম্পূর্ণ মনুষ্যত্ব নিয়ে এসেছিলেন আবার তাঁকে আহ্বান করছি আজকে এই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভারতে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিসম্বাদ, যেখানে ভেদ বিবাদে মানুষ জর্জরিত, সেই ভারতে তিনি আবার আসুন। সত্যের দ্বারা মানবের পূর্ণ প্রকাশ। যিনি আপনার মধ্যে সকল জীবকে দেখেন। তিনি স্বয়ং প্রকাশ। তিনি প্রকাশিত হবেন তাঁর মহিমার মধ্যে।”সাধারণ মানুষ কিভাবে মহাজ্ঞানী হবেন? অতীশ দীপংকরের লেখা বিখ্যাত “বোধিপথ প্রদীপ” শীর্ষক গ্রন্থে উক্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ। বাংলাদেশের মাটি খুঁড়ে নানা রকমের বুদ্ধমূর্তি বের করা হয়েছে। আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালার বামিয়ান পর্বতজুড়ে বিরাটকায় বুদ্ধমূর্তি বিরাজমান। বুদ্ধমূর্তির সর্বকালের ভাষা, “অহিংসা পরম ধর্ম।” বৌদ্ধসংস্কৃতিময় প্রতীত্যসমূৎপাদ (নাগার্জুনের শূন্যবাদ, নির্বানলাভে লোভ দ্বেষ মোহের শূন্যতা) বিশেষণে মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রে ‘প্রজ্ঞা’ হচ্ছে শূন্যতা জ্ঞান অর্থাৎ সমস্ত জাগতিক বস্তু এবং ধর্মের (চিস্তনীয় বিষয়) আপেক্ষিক অস্তিত্ব ও অনাত্মা (নৈরাত্ম) জ্ঞান মহাশূন্যবাদ’ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অবদানে ভারতীয় গণিতশাস্ত্রে শূন্য বা জিরোর আবির্ভাব হয়। উক্ত গাণিতিক শূন্যকে অবলম্বন করে কম্পিউটার বিজ্ঞানের সূত্রপাত। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ২৫৬৩ বছর পূর্বে গৌতমবুদ্ধের ঐতিহাসিক বঙ্গলিপি অধ্যয়ণ, বাংলাভাষার আদিমতম নিদর্শন চর্যাপদের অবদানে বাঙালির অখন্ড সাধনা এবং এই অখন্ড সাধনার ফলেই সালাম, বরকত, রফিক সহ অনেক নাম না জানা শহীদদের জীবন দান। সেইদিনের বাংলাদেশের বগুড়ায় মহাস্থানগড়ে ঐতিহাসিক স্মৃতিখন্ড পবিত্র বুদ্ধ তীর্থভূমি যেখানে গৌতমবুদ্ধ তাঁর অমৃতময় ধর্ম প্রচার করেছিলেন সম্রাট অশোক সেই মহান পুণ্যভূমিকে স্মরনীয় করার জন্যে বৌদ্ধবিহার (বামু বিহার) ও বুদ্ধচৈত্য নির্মান করেন এবং আজ ও সম্রাট অশোকের “প্রাচীন বাংলা ভাষায়”(ব্রাহ্মী লিপিতে) শিলালিপিটা কলকাতা জাদুঘরে বিরাজমান। সুখী হও সুখী হও / এ মৈত্রী প্রার্থনা / দিবা নিশী হিত সুখ / করিনু প্রার্থনা। সর্বদা একান্ত মনে বলুন ”সকল প্রাণী সুখী হোক ! লেখক সোনা কান্তি বড়য়া সাবেক সভাপতি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, টরন্টো, খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, কথাশিল্পী, বিবিধগ্রন্থ প্রনেতা প্রবাসী কলামিষ্ঠ, লাইব্রেরীয়ান, বিশ্ববৌদ্ধ সৌভ্রতৃত্ব পত্রিকার সহ সম্পাদক এবং জাতিসংঘে বিশ্ববৌদ্ধ প্রতিনিধি।

শেয়ার করুন