সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল মিয়া’র অবিস্মরণীয় কীর্তি : নেভাল ডিটাচমেন্ট (কিস্তি : ১০)

24

সাইফুল আলম চৌধুরী
আট.
গৌরনদীতে লঞ্চ অপারেশন :
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে নয় নম্বর সেক্টর এলাকার ভৌগোলিক ও সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করেই পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আর কর্তৃপক্ষ বর্ণিত অঞ্চলে নদী ও সড়ক পথে নিরাপত্তা-শক্তিমত্তা বিশেষভাবে জোরদার করেছিলো। এই সেক্টরে আয়তনের তুলনায় রেলপথের দৈর্ঘ্য নেহায়েত স্বল্প থাকলেও বাণিজ্য ও শিল্প নগরী খুলনার পরিবহন, যোগাযোগ, যাতায়াত ব্যবস্থায় তা ছিলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
নয় নম্বর সেক্টরে শত্রুর ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধীনে একটি এ্যাডহক ব্রিগেড খুলনায়, ২১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট (রেকি ও সাপোর্ট) সাতক্ষীরা, কলারোয়া, যশোহর, ৯ পদাতিক ডিভিশনের একটি বড় অংশ বরিশালে নিয়োজিত থাকে। নদীপথে শত্রু নৌ-সেনাগণ ও তাদের স্থানীয় দোসরদের নিয়ে লঞ্চ, গানবোট, ল্যান্ডক্রাফট ও নানাবিধ নৌযান সহকারে নিয়মিত পাহারা, টহল, হামলা অব্যাহত রাখার প্রয়াস চালায়।
অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী-নেভাল ডিটাচমেন্টের নাবিক ও নৌ-কমান্ডোগণ শত্রæর চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা, নৌযান এবং ব্রিজ-কালভার্ট ধ্বংসের মাধ্যমে তাদের সর্বাত্মক ক্ষতিসাধন অব্যাহত রেখেছিলেন।
আবার মিত্র বাহিনী বর্ণিত সেক্টরে সীমান্ত লাগোয়া যুদ্ধ-এলাকা তাঁদের বন্দর, শহর-সামরিক স্থাপনাসমূহের নিñিদ্র নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা প্রদানের বিষয়াবলী বিবেচনায় রেখে ‘চার্লি সেক্টর’ গঠন করে ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন এবং ৪ মাউন্টেন ডিভিশন মোতায়েন করে। দমদম বিমানবন্দরে প্রায় পাঁচ হাজার ছত্রীসেনা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়। এই সবের অতিরিক্ত সীমান্তবর্তী রেখা বরাবর পশ্চিমবঙ্গে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস সদা সশস্ত্র অবস্থায় থাকে, কখনো সখনো প্রয়োজনে মুক্তি বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করে।
নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল মিয়া গেরিলা এবং সন্মুখ সমরে লড়াই করার জন্যে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত ও বিন্যাস করেছিলেন, তেমনি সমান্তরালভাবে ভৌগোলিক বহুমাত্রিকতার কারণে নৌ-সেনা, নাবিকদের এবং স্থলযোদ্ধাদের সমন্বয়ে সংগঠিত মুক্তিবাহিনী দিয়ে শত্রু নিয়ন্ত্রিত জলযান ধ্বংসের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
গৌরনদীতে শত্রু নিয়ন্ত্রিত লঞ্চে অপারেশন-
দিনটি ছিলো একাত্তরের ২৭ জুলাই। শত্রু সেনা ও তাদের দোসরদের আতঙ্কগ্রস্থ করে গাছের গুঁড়িতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লঞ্চ পুনরুদ্ধারের অভিনব কৌশল সেইদিন গৌরনদীতে সংঘটিত হয়েছিলো। মুক্তিযোদ্ধারা এই অপারেশনের বেশ কিছু দিন পূর্ব হতেই প্রত্যক্ষ করেন, বরিশাল সদর হতে সর্ব-উত্তর দিকে অবস্থিত গৌরনদীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সেনা সদস্য, রসদ ও অস্ত্রাবলী সমেত নিয়মিতভাবে বেশ কয়েকটি পণ্য আর যাত্রীবাহী মোটর লঞ্চ যাতায়াত করে। এইসব নৌ-যানসমূহের বিশেষ নিরাপত্তার জন্যে গন্তব্যে চলাচলের সময় অগ্র-পশ্চাতে থাকতো মিলিশিয়াদের গানবোট কিংবা বিশেষ জলযান।
একাত্তরের জুলাই মাস অবধি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা গৌরনদীসহ বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকায় গোপন ঘাঁটি নির্মাণ করে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন। ততদিনে গৌরনদী থানায় রুহুল আমিন, মালেক ও নিযামের কমান্ডে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিয়েছিলেন।
উল্লেখিত তারিখে ভোর রাতে রুহুল আমিন নদীর তীরের গ্রামের হাইড আউট হতে প্রথমে লঞ্চ চালানোর শব্দ শুনতে পান। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লাইট মেশিনগানের শব্দাবলী গোচরীভ‚ত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, সহযোদ্ধাদের কোনো উপদল লঞ্চে আক্রমণ নির্মাণ করেছেন। বিস্ফোরক দ্রব্যাদি ও তাঁর উপদলের অন্যান্য সাথীদের নিয়ে তিনি অতি দ্রæত অকুস্থলের দিকে ধাবিত হন।
নদীর পাড়ে সদলবলে পৌঁছে তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন মুক্তিযোদ্ধা নিযামের গ্রুপ লঞ্চটিকে টার্গেট করে লাগাতার গুলিবর্ষণ জারি রেখেছেন, যাতে লক্ষ্যবস্তু তাঁদের নাগালের বাইরে যেতে না পারে। সহসা রুহুল আমিন ও তাঁর গ্রুপ নিযামের দলের সাথে যোগ দিয়ে তীর সংলগ্ন একটি গাছে বিস্ফোরক দ্রব্য স্থাপন করে নিযাম ও দলের যোদ্ধাদের নৌকা নিয়ে সেই লঞ্চের দিকে অগ্রসর হতে অনুরোধ করেন।
পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় নিযাম ও তাঁর দলের যোদ্ধাগণ নদীতে লঞ্চের উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখে এগুতে থাকেন। অন্যদিকে রুহুল আমিন ও তাঁর সাথীগণ গাছের গুঁড়িতে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হন। শত্রু পক্ষ এই বিস্ফোরণকে মর্টারের গোলার আঘাত ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে উদভ্রান্তের মতো দিকবিদিক শূন্য হবার পর নিজের জীবন বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেয়, অনেকের সলিল সমাধি ঘটে।
গৌরনদীতে টিএন্ডটি গ্লোব বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মর্টারের গোলার আঘাতের ভয় প্রদর্শনের অভিনব কৌশল কাজে লাগিয়ে তাঁরা সেইদিন লঞ্চখানি পুনরুদ্ধার করে নয় নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল কর্তৃক স্থাপিত বঙ্গবন্ধু নৌ-বহরের অনুসঙ্গে পরিণত হতে সহায়তা করে ইতিহাস নির্মাণ করেন।
কৈখালী হরিনগরে শত্রুর গানবোটে হামলা :
সাতক্ষীরার দক্ষিণভাগে শ্যামনগর থানারও দক্ষিণপ্রান্তে হরিনগর অবস্থিত। কৈখালী-হরিনগর এলাকায় একাত্তরে নিয়মিতভাবে পাক-নৌসেনারা টহল বোটে পাহারায় সদাব্যস্ত থাকতো। কেননা অবরুদ্ধ বাংলাদেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাবলী, বিস্ফোরক, এ্যাম্বুনিশন আর আনুসঙ্গিক অন্যান্য যুদ্ধ-সরঞ্জামসহ অনুপ্রবেশের জন্যে বর্ণিত এলাকাটি ছিলো গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। বিষয়টি শত্রুপক্ষ ও তাদের দোসরদের নজরে এলে, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক বাধা দিতে কিংবা আঘাত করতে তৎপর থাকতো।
অন্যদিকে নয় নম্বর সেক্টরের অত্র এলাকার যোদ্ধাগণ শত্রুদের টহল দিতে প্রত্যক্ষ করলে কিংবা আরো অধিক সংখ্যক গেরিলাদের অভ্যন্তর প্রদেশে প্রবেশ করার প্রয়োজন হলে পথ নির্বিঘ্ন রাখতে গানবোট অথবা টহলবোটগুলোকে বিনা বাধায় কখনোই ছেড়ে দেয়নি। গেরিলা কায়দায় তাঁরা কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে তাঁদের শারীরিক উপস্থিতি চাউর করতো, আবার মুহূর্তেই আত্মগোপনে চলে যেত।
সুন্দরবনের হরিনগর গ্রামের গাজী নওয়াবদী ফকির, যাঁকে মেজর জলিল ‘সুন্দরবনের রাজা’ বলে সম্বোধন করেছেন তাঁর সীমাহীন সমর গ্রন্থে, তাঁর দুই পুত্র আর এক কন্যা সন্তানও মাঝে মধ্যে ‘আক্রমণ করো এবং পালিয়ে এসো’ রণনীতির কৌশল অনুসরণ করে শত্রুপক্ষের গানবোট, ল্যান্ডক্রাফট, টহলবোট আক্রমণে সম্পৃক্ত হতেন। উল্লেখ্য, সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল সুন্দরবনের রাজাকে তাঁর বিশেষ অনুরোধে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েছিলেন। তবে গাজী নওয়াবদী মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম পথ প্রদর্শকের ভ‚মিকা পালন করেছিলেন।
জুলাই একাত্তরের শেষ সপ্তাহ। মুষলধারে বৃষ্টিপাতের মাঝেও যোদ্ধাগণ গভীর আগ্রহে ও সতর্ক মনোযোগে শিকারের অপেক্ষায়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের দূরবীনে দৃশ্যমান হলো, শত্রুপক্ষের দুটি গানবোট আর সাথে অগ্রসরমান আরো একটি গোয়েন্দা নৌযান। তাঁরা সেখানে অবস্থানরত কমান্ডার বাশার আর বরিশালের সেলিমকে তৎক্ষণাত শত্রæপক্ষের গানবোটসমূহ আগমনের সতর্ক সংবাদ জানান দেয়।
নয় নম্বর সেক্টরের কৈখালী-হরিনগর এলাকার কমান্ডার বাশার ও সেলিম তাঁদের উপদলের নুর মোহাম্মদ, শামসুর রহমান, আবুল হোসেন, বরকতসহ আরো কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে যায়। গানবোটগুলো নিকটবর্তী হলে তাঁরা লাইট মেশিনগানের সাহায্যে টার্গেটে ব্রাশফায়ার আরম্ভ করে। শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষতিসাধন না হলেও সেই যাত্রঅয় তারা পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়।
মরিচ্চাপ নদী তীরে কেয়ারগাতি গ্রামে পাক নৌবাহিনীর গানবোটে হামলা :
খুলনার দক্ষিণভাগে আশাশুনি থানার বড় দল ইউনিয়নের অন্তর্গত কেয়ারগাতি গ্রাম। থানা হতে চার-পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আর ইউনিয়ন সদরের বাজার থেকে আট-নয় কিলোমিটার পশ্চিমে হলো এই প্রত্যন্ত অজগ্রাম।
দিবসটি ছিলো একাত্তর সালের ১৬ আগস্ট। গেরিলা-যোদ্ধাগণ গোপনসূত্রে আগাম সংবাদ লাভ করেন, খোলপেটুয়া নদী থেকে মাস্তুলে চান-তারা খচিত পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে দুটি গানবোট কেয়ারগাতি গ্রামের দিকে ধেয়ে আসছে। গ্রামের নদীর অপর পাড়ে চাপড়া গ্রাম, যেখানে সেই সময় মিলিশিয়া আর রাজাকারদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিলো। সাতক্ষীরা চাপড়া গ্রামের সাথে পাকা সড়ক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিলো বিধায় মাত্র আধ ঘন্টার মাঝে মিলিটারীরা সাতক্ষীরা থেকে সেখানে চলে আসতো।
কেয়ারগাতির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে খোলপেটুয়া নদী দুই-তিন কিলোমিটার আর পূর্ব দিকে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে কপোতাক্ষ ও মরিচ্চাপ নদ-নদীর মোহনা। বর্ণিত গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মিত গোটা পঁচিশেক ট্রেঞ্চ আর আট-দশের বাংকার ছিলো। সেই সাথে বড় সড় কয়েকটি গাছে ছিলো ‘অবজারভেশন পোস্ট’ (ওপি), সেখানে পালাক্রমে চলতো যোদ্ধাদের পাহারা।
গানবোট দুটির আগমনের সংবাদ বাহক মারফত দীর্ঘ আধ-মাইল দীর্ঘ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা লাইনে পরিবেশন করা হয়। সেই সাথে নির্দেশ প্রদান করা হয়, প্রতিটি গ্রæপ যেন গেরিলা কায়দায় শত্রু নৌযানগুলোতে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে তাঁদের সুবিধা মতোন পিছু হটে নিরাপদ হাইড আউট কাজল নগর চলে যায়। উল্লেখ্য, গানবোট দুটির অগ্রসরমানতার খবরপ্রাপ্ত হয়ে আশাশুনি লঞ্চঘাট থেকে রাজাকার-ভর্তি দুটি লঞ্চও আসছে অকুস্থলের দিকে।
যোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের কাছাকাছি আসা মাত্রই শত্রুপক্ষের সর্বমোট চারটি নৌযানে মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল এবং তাঁর গ্রুপ লাইট মেশিনগানের ফায়ার দিয়ে শত্রু হননের মহোৎসবের উদ্বোধন করেন। বর্ণিত নৌযানসমূহ সেইদিন আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো নদীর পাড়ে পৌঁছানোর জন্যে। মুক্তিযোদ্ধাদের লাগাতার গুলিবর্ষণের কারণে তারা কামিয়াব হচ্ছিলো না, লঞ্চ দুটো আশ্রয় নিচ্ছিলো গানবোট দুটির পেছনে, যেন তাদের জলযানে গুলির আঘাত না লাগে।
অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা কালাম ও রফিক এবং তাঁদের উপদলের সদস্যগণ রেজাউল গ্রুপের পাশাপাশি গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখেছিলেন, যাতে কোনোভাবেই পাকসেনারা গানবোটগুলো নিয়ে পাড়ে ভিড়তে না পারে। আধ ঘণ্টাব্যাপী হামলা অব্যাহত রেখে তাঁরা যখন যারপরনাই উল্লসিত, সেই সময় সমূহ বিপদের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দল নেতাদের প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধাগণ- দক্ষিণভাগে রেজাউল আর উত্তরপ্রান্তে কালাম তাঁদের দল সমেত সর্বশেষে প্রত্যাহৃত হয়ে কেয়ারগাতি গ্রামে ছেড়ে বিল ও দিন পনেরো পূর্বে রোয়া ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে গন্তব্যে ফেরত যান।
সুন্দরবনে ফরেস্ট অফিসে হামলা, ‘বনমৃগী’ ও ‘বনবালা’ উদ্ধার :
নৌকমান্ডো মো: হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে ‘হিরন পয়েন্টে’ অভিযান পরিত্যক্ত (আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রেরিত হয়েছিলেন সেখানে) হলে ১৫ সেপ্টেম্বর লেফটেন্যান্ট জিয়া উদ্দিনের সুন্দরবনের ঘাঁটি ত্যাগ করেন তাঁরা। ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁরা সাতক্ষীরার হরিনগর এলাকায় পৌঁছালে পাকিস্তানের গানবোট প্রত্যক্ষ করে সন্মুখ-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সেই সমরে শত্রুর গানাবোটের প্রভ‚ত ক্ষতিসাধিত হয়েছিলো। গানারসহ আরো কয়েকজন নৌসেনা নিহত হয়। পক্ষান্তরে যোদ্ধাদের মাঝে শমসের আলীর একটি কান গুলির আঘাতে উড়ে যায়, আলফাজ উদ্দিন চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ফেরার পথে তাঁদের কয়েকজন সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ভিন্ন ভিন্ন ফরেস্ট অফিসে হানা দেন।
সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল তাঁর ‘সীমাহীন সমর’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গের খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন : “… এই ঘটনার (মংলা বন্দরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’- ১৫ আগস্ট ১৯৭১ যেখানে আটটি বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজের মাঝে সাতটি নিমজ্জিত হয়েছিলো- লেখক) পর বন্দরের শ্রমিকেরা কাজ ছেড়ে দিয়ে যে যেদিকে পারলো, পালিয়ে গেল। বেশ কিছুদিনের জন্য চালনা ও মংলা বন্দর জনশূন্য হয়ে পড়ে রইলো। শমসেরনগরে ফিরে আসার সময় মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিসেনারা একটা ফরেস্ট অফিসে হামলা চালিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র অধিকার করে। এর মধ্যে ‘বনবালা’ ও ‘বনমৃগী’- এই দুটো লঞ্চও ছিলো। এই লঞ্চে চেপে বিজয়ের উত্তেজনায় আত্মহারা মুক্তিযোদ্ধারা শমসেরনগরে ফিরে এলো।”
নৌ-কমান্ডো মো: হুমায়ুন কবিরের (নৌ-কমান্ডো নম্বর : ০০২৯) জীবন কোষ হতে জানা যায়, তাঁরা ফেরার পথে বিভিন্ন ফরেস্ট অফিস থেকে বিপুল অস্ত্র ও কয়েক লাখ টাকা উদ্ধার করেন।
সহযোদ্ধা মো: শমসের আলীর (নৌ-কমান্ডো নম্বর : ০১১৯) বয়ানে উদ্ধার হয়েছে, ত্রিকোণী অপারেশনে কমান্ডার হুমায়ুন, জালাল উদ্দিন, আজিজুল আলম, আলফাজ উদ্দিন বিভিন্ন ফরেস্ট অফিস থেকে প্রায় ৫৩ লক্ষ টাকা ও বহু অস্ত্র উদ্ধার করেন। (চলবে/ অসমাপ্ত)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও কলামিস্ট। sakil19@hotmail.com

শেয়ার করুন