সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল মিয়া’র অবিস্মরণীয় কীর্তি : ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ (কিস্তি : ১৩)

45

সাইফুল আলম চৌধুরী
বারো.
নৌ-বাহিনীর মাহফুজ আলম বেগের ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ : নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল মিয়া মূলত ট্যাংক রেজিমেন্টের অফিসার হলেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সেক্টরের ভৌগোলিক এবং সামরিক কৌশলগত কারণে পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন দক্ষ ফ্রগম্যান আর স্পেশাল কমান্ডো মাহফুজ আলম বেগকে বারো বছরের বয়সের কম শিশুদের নিয়ে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে গেরিলা তৎপরতা চালানোর অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এমন বিস্ময়কর, চমকপ্রদ, অভাবিত রণকৌশল অন্যান্য সেক্টরে সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে ‘বারো বছরের কম’ শিশুদের সমন্বয়ে কোনো গেরিলা বাহিনী নির্মিত হতে প্রত্যক্ষ করা যায় না। যদিও দশ নম্বর সেক্টর ছাড়া বাকি সব সেক্টরেই বিচ্ছিন্নভাবে ঐ বয়সী শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল সরকারি, বেসরকারি কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থাবলীসমূহে শতাধিক শিশুদের সম্পৃক্ততায় এই বিশেষ বাহিনীর কর্মতৎপরতার, সকল ঘটনাবলীর বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। ব্যতিক্রম শুধু সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিলের ‘সীমাহীন সমর’ গ্রন্থে অন্তত একটি পৃষ্ঠায় ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ বাহিনী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান তথ্যাবলী সন্নিবেশিত হয়েছে।
বর্ণিত ক্ষুদে বাহিনী মূলত নয় নম্বর সেক্টরের সমসেরনগর সাব-সেক্টরের আওতাধীন এলাকায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলো, বিশেষত পারুলিয়া, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা, কালীগঞ্জ অঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। তাঁদের অসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ণ কর্মকাে র কারণেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে সম্প্রচারিত সাংবাদিক-কলামিস্ট, লেখক এম আর আখতার মুকুলের জনপ্রিয় আর ঐতিহাসিক ‘চরম পত্র’ অনুষ্ঠানে সহস্রবার উচ্চারিত ‘বিচ্ছু বাহিনী’র কার্যকলাপ, যা স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ-শতাব্দী পরেও মুক্তিযোদ্ধা-অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অধিবাসী ভারতে আশ্রিত তৎকালীন প্রায় এক কোটি শরণার্থীদের মাঝে আজো যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের হৃদয়ে ও কর্ণকুহরে ‘সেই বিচ্ছু’দের (যদিও এম আর আখতার মুকুল কখনো সখনো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা-নৌকমান্ডোদের সার্বিক অভিযানসমূহকে ‘বিচ্ছুদের কেচকি মাইর’ বলে অভিহিত করতেন) এ্যাকশনসমৃদ্ধ কাহিনী জাগরুক রয়েছে।
‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ বাহিনীর ক্ষুদে সদস্যগণ প্রশিক্ষিত হবার পর কেবলমাত্র গেরিলা ওয়ার ফেয়ারের অনুসঙ্গ হিসেবে শত্রæপক্ষের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যস্ত থাকেননি, চতুষ্পার্শ্বে শত্রæ সেনা বেষ্টিত থাকা সত্তে¡ও পাক বাহিনীর অবস্থান, তাদের লোকবল, শক্তিমত্তা, বিভিন্ন সড়কের সেতু, কালভার্ট স্থাপনার সকল বিস্তারিত সংবাদ সংগ্রহ, গোয়েন্দা অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খুঁটিনাটি মূল্যবান বিষয়াবলী অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে সম্পন্ন করতেন।
মেজর জলিল তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে এই বিশেষ ক্ষুদে বাহিনী সম্পর্কে লিখেছেন : “… আমার মনে পড়ে, এই বিশেষ বাহিনীর নাম ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস।’ এর বিশেষত্ব ছিলো বারো বছরের ঊর্ধ্বে কোন বালককে এ বাহিনীতে নেয়া হতো না।
‘ভট্টাচার্য’ নামে দশ বছরের একটি ছেলে বেগের বিশেষ ‘বাহিনী’তে যোগ দেয়। নতুন এসেও ভট্টাচার্য কঠিন পরিশ্রমের বলে ‘সার্জেন্ট মেজর’ পদে উন্নীত হলো। কেনই বা হবে না? সে নিজে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। উপরন্তু চারদিকে শত্রæ থাকা সত্তে¡ও তাদের অবস্থান, শক্তি, সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ রাস্তায় পারুলিয়া ব্রীজের খুঁটিনাটি- সব মূল্যবান সংবাদ সংগ্রহের জন্য তার ক্ষুদে বাহিনীকে যোগ্যতার সাথে পরিকল্পনা করেছে। পারুলিয়া ব্রীজ লম্বায় প্রায় ১৫০ ফুট। এই ব্রীজের ওপর দিয়েই হানাদাররা তাদের রসদ সম্ভার, অস্ত্রশস্ত্র কালিগঞ্জ ও বসন্তপুরে নিয়ে যেত।
ব্রীজটার ওপর হামলা চালানোর দিন ভট্টাচার্য রাতের অন্ধকারের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে ব্রীজের এক প্রান্তে পাহারারত সান্ত্রীদের কয়েক গজের মাঝে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
আর এদিকে বেগ ব্রিজের নিচে বিস্ফোরক দ্রব্য রেখে দিল। সংকেত দিতেই এই দশ বছরের সার্জেন্ট মেজর ঝোপের আড়াল থেকে শত্রæর দিকে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলো। কোন দিক থেকে গ্রেনেড ছুঁড়েছে- টের পাবার আগেই সান্ত্রীরা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তারপর সার্জেন্ট মেজর তার ছোট কনুইয়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে বেগের সাথে এসে মিলিত হলো এবং নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন বিস্ফোরণের ভয়ানক গর্জন কানে ভেসে আসবে। দীর্ঘ মেয়াদী বিস্ফোরক দ্রব্য বুকে নিয়ে ব্রীজটা অসম্ভব রকমের নীরব ও শান্ত।
মগজহীন হানাদার সান্ত্রীরা ভারী বুট পায়ে ব্রীজের ওপর প্রান্তে পায়চারী করছিলো। বেগ হাত ঘড়িটার দিকে তাকালো। সময় আসন্ন। উহ! কি ভয়ানক উত্তেজনা। প্রচ শব্দ করে ব্রীজের বেশির অংশ উড়ে গেল। আর পোশাক পরা পাকিস্তানি পশুগুলো চিরদিনের জন্য ভেসে গেল জলের স্রোতে।”
তের.
মাহফুজ আলম বেগ- তাঁর সম্পর্কে জানি :
বাবা : হোসাম উদ্দিন বেগ। কলেক রোড, কোতোয়ালি থানা, বরিশাল জেলা। বর্তমান নিবাস : বাড়ি নম্বর-২৯ দোতলা, সড়ক নম্বর – ৯/বি, সেক্টর – ৫, উত্তরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা।
অশীতিপর এই বীর যোদ্ধার সাথে গত বছর এপ্রিল তাঁর ঢাকার বাসভবনে সাক্ষাৎ ঘটেছিলো। অনন্য আতিথেয়তায় দুপুরের খাবার খেতে খেতে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভ‚মিকা, শমসেরনগর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সন্মুখ-নৌকমান্ডো যুদ্ধসমূহ পরিচালনা এবং চূড়ান্ত পর্বে বরিশালের দোয়ারিকায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কাহারের নেতৃত্বে দুই কোম্পানী শত্রæ সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করাসহ বসন্তপুর, পারুলিয়া, ব্রীজ, খাঞ্চীয়া বর্ডার আউট পোস্ট, উকসায় মাইন বিস্ফোরণ, ভাতশালা, কেয়ারগাতি রাজাকার ঘাঁটি বিনাশ, বিউটি অব খুলনা নৌযান পুনরুদ্ধার, হবিনগর কৈখালী শত্রæর গানবোটে অভিযান, কেয়ারগাতিতে গানবোট আক্রমণ, শ্যামনগর যুদ্ধ, মাগুরা শিশির অভিযান, আশুশুনি শত্রæ ঘাঁটি ধ্বংস, কালীগঞ্জের যুদ্ধ, গোয়ালডাঙ্গার যুদ্ধ, কালীগঞ্জে রাজাকার ঘাঁটি দখল, বুড়ি গোয়ালিনীতে আক্রমণ, বসন্তুপুর পাক-অবস্থানে অপারেশন, ভেটখালীর যুদ্ধ, আশাশুনি শত্রæ ঘাঁটি পুনঃ আক্রমণ, চাপড়া রাজাকার ক্যাম্প ও আশশুনি থানা অপারেশন, রতনপুরে এ্যামবুশ, সাতক্ষীরা শহরে পাওয়ার হাউজে দুঃসাহসিক অভিযান, কৈখালীতে সংঘর্ষ, শ্যামনগরে অপারেশন ও কালীগঞ্জ থানা পুনরুদ্ধারে যুদ্ধ- সীমাহীন রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ ছিলো সেই মধ্যাহ্নভোজনে।
মাহফুজ আলজ বেগ আমাকে কিংবা তাঁকে আমি ইতিপূর্বে কখনো দেখিনি। সেক্টর কমান্ডার মেজর, আবদুল জলিলের স্মৃতিগ্রন্থ পাঠ করে কৌতুহলী এই ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ বাহিনী, তাঁদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকা সম্পর্কে বিস্তরিত জানতে। টরন্টো শহরে বসবাসরত বরিশালের আবদুস সালাম কাজটি সহজ করে দিয়েছিলো। মাহফুজ আলম বেগের মুঠোফোন নাম্বার তাঁর নিকট হতে সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে এই বিশেষ ক্ষুদে বাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আগ্রহ ভরে সহযোগিতা দান করেন।
একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাগণ জীবন সায়াহ্নে এসেও নস্টালজিক স্মৃতি গৌরবের সাথে রোমন্থন করতে চান, এই ভাবাবেগের কারণে সম্পূর্ণ অচেনা-অদেখা ভিন্ন অবস্থানে থেকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত থাকা অনুজসম সহযোদ্ধাকে হৃদয়ের অকৃত্রিম নিঙরানো ভালোবাসায় বড় সাইজের পাবদা, চিংড়ি ও রুই মাছ, করলা ভাজি-ভর্তা সেই সঙ্গে গরু ভুনা আর মুরগি বিরিয়ানীর মতোন মোগলাই খাবারে টেবিল পরিপূর্ণ করে যারপরনাই আতিথেয়তায় নিমগ্ন তিনি হয়েছিলেন।
খাবার শেষে আলাপচারিতা পুরোপুরি ভিডিও করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস নির্মাতার। ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’- নামটি কেন বেছে নেয়া হয়েছিলো, একাত্তরে এই ক্ষুদে বাহিনী গঠন কালে? জবাবে তিনি জানান, নামটি তাৎক্ষণিকভাবে রাখা হয়, বিশেষ কোনো কার্যকারণ নেপথ্যে ছিলো না। তবে সময়ের ব্যবধানে আর মনে পড়ে না কিছুই।
মাহফুজ আলম বেগ মেজর আবদুল জলিলের ভাষ্যে : “… বরিশাল থেকে এম. এ. বেগ নামের একজন এসে পৌঁছলো। যুবক, শিক্ষিত ও চটপটে। গায়ের রং কালো। সারা মুখমন্ডলে প্রতিভা ও চাঞ্চল্যের স্বাক্ষর। সে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে একজন দক্ষ প্যারাসুট সৈনিক ও একজন ফ্রগম্যান হিসেবে অনেক দুঃসাহসিক কাজে নিযুক্ত ছিল। এসব কাজে ওর সমতুল্য বড় একটা কেউ ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের ‘চেরাট’ এলাকায় দীর্ঘ আট বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর পাকিস্তান নৌবাহিনীতে ‘মিডশীপম্যান’ হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়। ওখান থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সে বাংলাদেশে আসে। এ রোমাঞ্চকর জীবন ছেড়ে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে উত্তর দিল : ‘বাংলাদেশ।’ হেসে জানালো, আরব সাগরের নোনা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় সে বারুদের গন্ধ পেয়েছে।’
নয় নম্বর সেক্টরে একাত্তরে লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত লেফটেন্যান্ট এ. এস. এম. সামছুল আরেফিন (পরবর্তীতে মেজর, অব:) ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ গবেষণামূলক গ্রন্থে মাহফুজ আলম বেগ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন : ‘পেশাভিত্তিক নম্বর ১০১৯। নাম : মাহফুজ আলম বেগ। মুক্তিযুদ্ধে পদবী : এবি। যোগদানপূর্ব কর্মস্থল : ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান। মুক্তিযুদ্ধকালীন পদবী : অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মস্থল : সাব-সেক্টর শ্যামনগর (শমসেরনগর), সেক্টর নম্বর-৯। সর্বশেষ পদবী ও অবস্থান : পরিচালক নিরাপত্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা।
একাত্তরে তাঁর বয়স : ৩৪ বছর। সেই সময় তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা : এসএসইস। পেশা : নৌবাহিনী কর্মরত থাকলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রæপে উচ্চতর প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিলেন। করাচি নৌঘাঁটিতে অবস্থানকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, নৌবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধ-জাহাজে বিপুল সংখ্যক অস্ত্রাবলী বোঝাই করা হচ্ছে, সেই সবের সাথে জাহাজগুলোতে বিদ্যমান অস্ত্রশস্ত্রের কোনরূপ সামঞ্জস্যই ছিলো না। তিনি উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা প্রদান করেন, কোনো যুদ্ধ-নৌযানে ৬ ইএমজি গান এবং ৫ ইএমজি গান অথবা ৪০ মিমি বাফার যদি বিদ্যমান থাকে, তাহলে সেই একই জলযানে হেভি মেশিনগান, মর্টার, ফিল্ড গানসমূহে গোলা-বারুদ নতুন করে বোঝাই করা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বুঝতে আর বাকি থাকে না, সেই সব অস্ত্রাবলী উল্লিখিত যুদ্ধ-নৌযানে ব্যবহারের জন্যে নয়। হলফ করে বলা যায়, সেইসব অন্যত্র কোথাও ব্যবহারের জন্যে বোঝাই হয়েছে। বিষয়টি রহস্যজনক মনে হলে গোপন সূত্রে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল, সেইসব অস্ত্রাবলী আর গোলাবারুদ পূর্ব পাকিস্তানে নেয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানের পক্ষত্যাগ করার সিদ্ধান্ত কখন নিলেন জানতে চাইলে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে তিনি বলেন, হঠাৎ বাংলাদেশে অস্ত্রশস্ত্র নেবার বিষয়টি অবগত হবার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেভাবেই হোক বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। পূর্বেই ছুটি মঞ্জুর করা ছিলো। সুযোগ মতো বাংলাদেশে চলে আসি।
মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবার যাত্রাপথ সম্পর্কে অবহিত হতে চাইলে দীর্ঘ একটা ফিরিস্তি শোনা হলো তাঁর বয়ানে। পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে তিনি ছিলেন নদীর ওপারে জিঞ্জিরায়। সেখানে কয়েক দিন থেকে ক্যাম্প করে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতাদের আশ্রয় দান, ঢাকা শহর হতে জীবন বাঁচাতে বাস্তুচ্যুত বাঙালিদের আশ্রয়-খাদ্যের ব্যবস্থা এবং সাথে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে যুবাদের দিয়ে পাহারার আয়োজন ইত্যাদি ছিলো প্রারম্ভিক সময়ের ঘটনা।
পরে কলাতিয়া হতে নরসিংদী, লঞ্চে চাঁদপুর হয়ে বরিশাল। ইশাকাঠি গার্ডেনে ৩৩ জন স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ-শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন এপ্রিলের ২৫-২৬ দিবস অবধি। বরিশালে ক্র্যাক ডাউনের পর তাদের নিয়ে প্রথমে মাধবপাশা, পরে ঝালকাঠির কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান গমন করেন। প্রকৃতিগতভাবে পেয়ারা বাগানখানি পরিখাসমৃদ্ধ থাকায় অকুস্থলে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে তাদের বেশ কয়েক দফা প্রতিরোধ-যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো।
স্বরূপকাঠির কুড়িয়ানা গ্রামের পেয়ারা বাগানে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক সময়ে মাহফুজ আনাম বেগ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গেরিলা কায়দায় যে যুদ্ধ-নির্মাণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল বর্ণনা দিয়েছেন : … জায়গাটা স্বরূপকাঠি থানার অনেক ভেতরে। এখানে সারি সারি অনেক পেয়ারা বাগান আছে! দুটো সারির মাঝখানটা নালার মত। সেখানে যে কেউ অনায়াসে আত্মগোপন করে লুকিয়ে থাকতে পারে। বেগ প্রায় একশ’ ঝানু মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে দিনের বেলায় এই নালার মধ্যে লুকিয়ে থাকতো এবং রাতের অন্ধকারে ওখান থেকে বেরিয়ে এসে হানাদারদের আঘাত হানতো। সবার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। কারো কারো কাছে আমাদের পূর্বপুরুষের সযতেœ রক্ষিত সেই মান্ধাতা আমলের তীর-ধনুক, বর্শা ইত্যাদি থাকতো। বেগ-এর বাহিনীর অবিরাম আক্রমণে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত পাক হানাদাররা একদিন এক দালালের কাছে খবর পেয়ে দিনের বেলায়ই ওদের ওপর আক্রমণ চালাবার জন্য অগ্রসর হলো।
বেগও ঠিক সময় মত বাহকের মারফত হানাদারদের অগ্রসর হবার সংবাদ জেনে গেল এবং হাতের কাছে যে সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও পুরনো আমলের তীর-ধনুক পাওয়া গেল- তা নিয়েই ওর লোকজনদের প্রধান প্রধান জায়গায় বসিয়ে দিল। একদিকে নগণ্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাংলার দুর্জয় মুক্তি বাহিনী, অন্যদিকে আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি সৈন্য। সবাই প্রস্তুত। কিন্তু প্রাচীন রোম নগরী বা অন্য কোন ইতিহাস প্রসিদ্ধ যুদ্ধের মত এখানে বেজে উঠলো না কোন রণ দামামা। উত্তেজনা চরমে উঠলো যখন দালালরা প্রায় ৫০ জন হানাদারকে সাথে নিয়ে এসে পেয়ারা বাগানের ভেতর তল্লাশি চালাতে চললো।
হানাদাররা বাগানে ঢুকে খুব সতর্কতার সাথে বাগানের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো। দক্ষ-শিকারীর মত বেগ তার দুঃসাহসিক মুক্তি বাহিনী নিয়ে অসম্ভব রকমের চুপচাপ। কোন সাড়া-শব্দ নেই। ওরা অপেক্ষায় ছিল কতক্ষনে শত্রæপক্ষ বন্দুকের নলের আওতায় আসবে। পাক-হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদে ‘মুক্তি’ বলে ডাকতো। অনেক তল্লাশী চালিয়েও কোন ‘মুক্তি’র খোঁজ না পেয়ে হানাদাররা পাকা পেয়ারায় ভর্তি একটা গাছের ওপর বিশ্রাম নিতে লাগলো। আর কি! চতুর্দিক থেকে আচমকা ছুটে আসতে লাগলো বন্দুকের গুলি, তীর, বর্শা ইত্যাদি। হতভম্ভ হয়ে হানাদাররা চিৎকার করতে করতে এদিক-ওদিক ছুট দিল। ঘটনাস্থলেই ২০ জন খতম হলো। বাদ-বাকিগুলো জীবনের মায়ায় পেয়ারা গাছের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে লাগলো। ওদের পলায়নের পালাটাও খুব আরামে কাটলো না। বাগানের বোলতা ও মৌমাছি ভয়ানকভাবে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতে-মুখে হুল ফুটাতে লাগলো। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা দেখিয়ে বাংলাদেশের বোলতা ও মৌমাছিরাও মুক্তি সংগ্রামে ওদের ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে যথাসাধ্য সাহায্য করেছিল। কেনই বা করবে না, ওরাও তো শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ডাকে- ‘যার যা আছে’ মন্ত্রে একইভাবে উজ্জীবিত হয়েছিলো।” (অসমাপ্ত/চলবে)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও কলামিস্ট। sakil19@htmail.com

শেয়ার করুন