সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল মিয়া’র অবিস্মরণীয় কীর্তি : ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ (কিস্তি : ১৪)

60

সাইফুল আলম চৌধুরী
বারো / তের.
মাহফুজ আলম বেগ- তাঁর সম্পর্কে জানি এবং নৌবাহিনীর মাহফুজ আলম বেগের ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ :
মাহফুজ আলম বেগ স্বরূপকাঠির কুড়িয়ানায় অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে। তাঁর নিজস্ব ভাষ্যে জানি : ‘… কুড়িয়ানায় ক্যাম্প স্থাপনের পর সেখানে আমাদের লোকসংখ্যা ক্রমে বাড়তে লাগলো। কুড়িয়ানায় কিছু মেয়েও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। বীথিকা রানী বিশ্বাসের নেতৃত্বে বেশ কিছু মেয়ে সক্রিয়ভাবে আমাদের সঙ্গে কাজ করে। কুড়িয়ানা থাকাকালে আমরা একবার পাকিস্তান আর্মির বানারীপাড়া ক্যাম্প আক্রমণ করে সেই ক্যাম্প দখল করি। পাকিস্তান আর্মি তাদের কিছু অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। আমাদের মাত্র ছয়জনের একটা গ্রুপ বানারীপাড়ার পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করে সেটা দখল করে। পাকিস্তানিদের অস্ত্রশস্ত্র সব কুড়িয়ানায় নিয়ে আসে আমাদের ছেলেরা। এরপরও কুড়িয়ানায় বেশ কয়েকবার আমরা যুদ্ধ করেছি।
… পরে পাকিস্তানিরা হেভি মেশিনগান ও মর্টার নিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে থাকে। তখন আমরা বুঝলাম যে, আমাদের সাধারণ আর্মস নিয়ে এদের সাথে এখন আর টিকতে পারবো না। তখন আমি নীতিগতভাবে ডিসিশন নিলাম যে বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাে অংশগ্রহণ করার জন্য আমরা ভারতে চলে যাব। সেই মতো আমি আমার ট্রুপসের প্রত্যেককে ব্রিফ করলাম।
… আমার দলের বেশির ভাগ লোক ভারতে রওনা দিল। আমিও ভারতে যাওয়ার জন্য চার-পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে বরিশালে এলাম। বরিশালে আসার পর আমার ছোট ভাই মকবুল আলম বেগ সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করলো। বরিশাল থেকে একটা নৌকায় আমরা পয়সারহাটে গেলাম। সেখান থেকে একটা ঢাকাগামী লঞ্চে উঠলাম।
… ঢাকা থেকে বাসে গেলাম রাজশাহী। সেখান থেকে মালদহ বর্ডার দিয়ে আমরা ইন্ডিয়া গেলাম। পরে কলকাতা হয়ে হাসনাবাদ পৌঁছে ৯ নম্বর সেক্টরে যোগ দেই। আমাকে প্রথমে হিঙ্গলগঞ্জের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারপর থেকে প্রতি রাতে যুদ্ধ, প্রতিটা দিন যুদ্ধ। পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে আমরা হাসানাবাদে, শ্রীরামপুরে, সাতক্ষীরা, গাবুরা ও শ্যামনগরে বড় ধরনের কয়েকটা যুদ্ধ করি। শ্যামনগরের যুদ্ধে আমাদের দলের পাঁচজন আহত হয় এবং চারজন শহীদ হয়। সুবেদার ইলিয়াস খান আমাকে বাঁচাতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
মাহফুজ আলম বেগের বয়ানের শতভাগ সমর্থন ও সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ করা যায় গবেষণাকালে। সেক্টর কমান্ডার তাঁর ‘সীমাহীন সমর’ স্মৃতিগ্রন্থে এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় : ‘… জুলাই মাসের শেষ নাগাদ ৩৫ জনের ছোট্ট বাহিনীটি বাড়তে বাড়তে ৩৫০ জনে এসে দাঁড়ালো। শত্রুপক্ষের ওপর রীতিমত আক্রমণ চালিয়ে তারা বেশ কিছুটা সাফল্য অর্জন করলো। বেগের অক্লান্ত সহযোগিতায় হুদা (ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা- সাব সেক্টর কমান্ডার হিঙ্গলগঞ্জ। মাহফুজ আলম বেগ পরবর্তী সময়ে শমসেনগর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং সেক্টর কমান্ডার তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন’ র‌্যাংক ফিল্ড কমিশন দিয়ে সম্মানীত করেন- লেখক) পাক বাহিনীর তিনটি সীমান্ত ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। এর ভেতরে ছিল দক্ষিণে উক্সা, বসন্তপুরের উত্তরে দেবহাটা ও খানজী সীমান্ত ফাঁড়ি। মাইন, ডিনামাইট ও গ্রেনেড বিস্ফোরণে ওই ফাঁড়িগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের জন্য শুধু অবশিষ্ট ছিল কতকগুলো ধ্বংসস্তূপ।’
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই মাহফুজ আলম বেগ বসন্তপুরের দক্ষিণে নদীর তীরে কালীগঞ্জ আক্রমণ কালের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, সেই ঘটনা সেক্টর কমান্ডারের সাথে শেয়ার করেছিলেন। সেটির সত্যতা মেজর জলিল বাহাত্তর সালেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন : ‘… একদিন সে দশজন মাত্র লোক নিয়ে বসন্তপুরের দক্ষিণে যমুনা নদীর তীরে কারিগঞ্জ আক্রমণ করতে বেড়িয়ে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ একটা দেয়ালের পিছনে ওরা লুকিয়ে রইলো। কিন্তু রাতটা অন্ধকার থাকায় শত্রু বাহিনীর বাংকারের কোন চিহ্ন দেখতে পেল না। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল না করে ফেরার মত লোক বেগ নয়। কাজেই সে তার পুরনো কৌশল অবলম্বন করলো। ঠিক অবিকল শিশুর মত কাঁদতে পারতো বেগ। কাজেই দেরী না করে ভয়ানক কান্না জুড়ে দিল। কিন্তু সদা সতর্ক। হঠাৎ দেখতে পেলো মানুষের দুটো প্রতি মূর্তি দরজা পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। মনে হলো, শিশুর কান্না শুনে ওরা খানিকটা বিচলিত হয়েছে। অবশ্য বিচলিত হবার কারণ মানবতার তাগিদে মানুষের দুঃখমোচন নয়- বিচলিত হবার একমাত্র কারণ- ওরা কামুক ও নারী লোভী। হয়তো এই প্রবাদ বাক্যটির ওপর ওদের খুব আস্থা ছিল- “যেখানেই ধোঁয়া সেখানেই আগুন।” হ্যাঁ, আগুন এখানে ছিল। কিন্তু যে আগুন তারা চেয়েছিল এটা তা নয়। এটা বেগের স্বয়ংক্রিয় স্টেনগানের আগুন। দুটো হানাদারই ঘটনাস্থলে খতম হলো। বেগ তাড়াতাড়ি দেয়ালের ওপারে কিছু গ্রেনেড ছুঁড়ে দিয়ে ওদের অস্ত্রগুলো নিয়ে অন্ধকারের ভেতর সরে পড়লো।’
পারুলিয়া ব্রিজ অপারেশন তাঁর একার কৃতিত্ব :
সাতক্ষীরা এবং কালীগঞ্জের মধ্যবর্তী দেবহাটা থানার অন্তর্গত পারুলিয়া, যার বুক চিরে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বিভাবে বড় সড় একটি খাল প্রবাহিত। বর্ণিত দুই এলাকার সিএন্ডবি সড়কে পারুলিয়ায় যে সেতু একাত্তরেও তা বিদ্যমান ছিলো। সেতুর সামরিক আর কৌশলগত গুরুত্ব ছিলো উভয় পক্ষের নিকট সমান। কেননা সড়ক পথে কালীগঞ্জ, দেবহাটা ও শ্যামনগর থানাসমূহ সাতক্ষীরার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলো। সেই কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক সময় হতে পারুলিয়া ব্রিজ অকেজো করার প্রয়াস অব্যাহত ছিলো। বিপরীতে শত্রুপক্ষ বর্ণিত সেতুটি রক্ষার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো। সেই উদ্দেশ্যে এলাকাটি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসার পর মিলিশিয়া আর এই দেশীয় দোসর রাজাকারদের একট উপদলের ওপর দিবা-রাত্র ২৪ ঘণ্টা সেতু পাহারা এবং টহলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে কয়েক দফায় পারুলিয়া ব্রিজ গেরিলা-যোদ্ধা, মাহফুজ আলম বেগের বিশেষ বিচ্ছু বাহিনী ‘হার্ড করপস অব সার্জেন্টস’ এবং নৌ-কমান্ডোগণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেটে পরিণত হয়েছিলো। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, দশ বছরের দামাল শিশু-যোদ্ধা ভট্টাচার্যকে নিয়ে সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগ একবার ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্যরে সেতুর সিংহভাগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আরেকবার শ্রাবণ মাসের প্রথম দিকে ভারতীয় ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের দুইজন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ (মুখার্জী ও মন্ডল), মোশাররফ হোসেন মঙ্গু, খলিলুর রহমানসহ সর্বমোট ১১ জন পারুলিয়া ব্রিজ ধ্বংসে গমন করেন। তাঁরা পূর্ণ উদ্যোমে আন্তরিকতার সাথে সেতুতে শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য স্থাপন করলেও ব্রিজের তেমন ক্ষতিসাধন সম্ভব হয়নি, শত্রæপক্ষ তড়িৎ সেতুর সামান্য ক্ষত মেরামত করে যান চলাচলের উপযোগী করে তোলে।
পারুলিয়া ব্রিজ বিনষ্ট করার অপর একটি দুর্দমনীয় প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন যশোহর জেলার দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। তাঁর রণকৌশল ছিলো যেমন অভিনব তেমনি বিস্ময়কর। অকুতোভয় এই যোদ্ধা জনাকয়েক সহযোদ্ধাসহ পারুলিয়া সেতুর কয়েকশত গজ অদূরে পৌঁছান সুযোগ এবং সময় মতো আর বড় ধরনের একটা খড়ের গাদার ওপর বিস্ফোরক পদার্থ রেখে নিঃশব্দে দড়ির সাহায্যে তা ব্রিজের একেবারে সন্নিকটে নিতে সমর্থ হন। তিনি ধৈর্য্যরে সাথে প্রত্যক্ষ করলেন, সেতু পাহারারত রাজাকারগণ খালের পানিতে খড়ের গাদার ভাসমান অগ্রসরতা তাদের মোটেও সন্দেহযুক্ত করেনি। ফজলুর রহমান তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন, মাঝারি আকারের অন্য আরেকটি খড়ের গাদা পানিতে ভাসিয়ে নিজেই স্বশরীরে স্ত‚পের আড়ালে গোপন থেকে উপস্থিত হবেন আর সেতুতে বিস্ফোরক করবেন। তাঁর সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সেই মতোই হয়েছিলো।
দুর্ভাগ্য মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর গ্রুপের, সব কিছুই ঠিকঠাক মতো হলেও বিস্ফোরণ ঘটেছিল তবে সেতুর মূল কাঠামোর সামান্যই ক্ষতি সাধিত হয়। অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য সফলতা লাভ করেনি। কয়েকজন পাহারারত রাজাকার বিস্ফোরণে আহত হয়।
সর্বশেষে নয় নম্বর সেক্টরের শমসেরনগর সাব-সেক্টর কমান্ডার ‘ক্যাপ্টেন’ ফিল্ড কমিশনপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ ও সীমাহীন ভাবাবেগে পূর্ণ সাহসী লড়াকু যোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ সর্বমোট ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার ‘টাকি’ হতে সীমান্ত লাগোয়া ইছামতি নদী অতিক্রম করে পারুলিয়া পৌঁছান।
দলের বাদ বাকীদের সেতু থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ অদূরে নিরাপদ জায়গায় কভারিংয়ের জন্যে পজিশনে রেখে তিনি একাই পূর্ব-অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে পারুলিয়া খালের পানিতে নেমে যান। সন্তর্পণে চোখ-কান খোলা রেখে আর শত্রæপক্ষের পাহারারত রাজাকারদের সতর্ক নজরে রেখে পাক নৌবাহিনীর এই নৌ-কমান্ডো এক সময় টার্গেটে উপস্থিত হতে সমর্থ হন অর্থাৎ সেতুর মূল কাঠামোর স্লাবে পৌঁছান। অবর্ণনীয় কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদন করে- ব্রিজের স্লাবে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক স্থাপন সমাপ্তির পর- পঁচিশ গজ দূরে খাল পাড়ে এক্সটেনশন কর্ডসহ অতি ধীরে পৌঁছে যান। শত্রুপক্ষের স্থানীয় দোসরগণ যারা সেদিন নিয়মিত প্রহরায় নিয়োজিত ছিলো, তারা এই যে বর্ণিত কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হয়েছে- একজন স্বাধীনতাকামী, বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের সমর্থক ও সৈনিক নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, মৃত্যুর যাবতীয় ঝুঁকি নিয়ে ভারী বিস্ফোরক সেতুর কাঠামোয় স্থাপন এবং কর্ডসহ খালের পাড়ে নিরাপদ স্থানে ফিরে আসা- কিছুই টের পায়নি সেইদিন।
মাহফুজ আলম বেগ নদী বিধৌত দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও একাত্তরের পূর্বে ৩৪ বছরের জীবনে কখনো লবণাক্ত-মিঠা পানি মিশ্রিত পানিতে কখনো সহস্র মৌ-কাঁকড়া প্রত্যক্ষ করেননি। জীবনের এমনই এক মুহূর্তে, যখন যুদ্ধ-পারিপার্শ্বিকতায় নিজে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত, শত্রু হননের উত্তেজনায় রোমাঞ্চিত, আচমকা আবিস্কার করেন- হাজার হাজার অতি ক্ষুদ্র আকারের মৌ-কাঁকড়া তাঁর শরীরময় আচ্ছাদিত। প্রথম ক্ষণে তিনি কিছুটা ভয়ে আঁতকে উঠলেও অতি দ্রুততম সময়ের মাঝে ক্ষুদে জলজ প্রাণীদের কেঁড়ে ফেলে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। তখনো তাঁর পারুলিয়া ব্রিজ ধ্বংসের শেষ পর্ব সমাপ্ত হয়নি। অনেকক্ষণ লবণাক্ত পানিতে অবস্থান আর সংখ্যাতিত মৌ-কাঁকড়ার আচ্ছাদনে তাঁর সমস্ত শরীর ফিকে সাদা। ব্রিজ ধ্বংসে তিনি এতোটাই মগ্ন-চৈতন্যে নিমজ্জিত ছিলেন, ক্ষুদে এইসব নিরীহ প্রাণী শরীরময় বিচরণ করলেও আদৌ খেয়াল করার সুযোগ তিনি পাননি।
মুহূর্তে সম্বিত ফিরে এলে তিনি এক্সটেনশন কর্ডে আগুন প্রজ্জলিত করেন কোনো ব্যতয় ঘটার পূর্বে। বিকট নারকীয় শব্দাবলী সহকারে পারুলিয়া ব্রিজ, আশপাশের শত্রæ-অবস্থান এবং স্থানীয় এলাকা কম্পিত হয়। রাজাকারের দল হতভম্ভ-দিশেহারা হয়ে পড়ে।
ক্যাপ্টেন মাহফুজ আলম বেগ সহযোদ্ধাদের নিয়ে শত্রুর পাল্টা-আক্রমণের পূর্বেই নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে অকুস্থল ত্যাগ করে হাইড আউটে পৌঁছে যান। বার কয়েক পারুলিয়া সেতু অপারেশন শত ভাগ সফল না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্ষেপের সীমা ছিলো। বর্ণিত অভিযান সম্পূর্ণভাবে সফলতা লাভ করায় নয় নম্বর সেক্টরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, সেক্টর কমান্ডার তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
কালীগঞ্জ শত্রুর ঘাঁটি তাঁর নেতৃত্বে আক্রমণ ও দখল :
একাত্তরে দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা মহকুমা (বর্তমান বাংলাদেশে জেলা) সদরের দক্ষিণভাগে কালীগঞ্জ থানার অবস্থান ছিলো। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা করিম গাইনের দুর্গসম বাড়িতে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে শত্রুর ঘাঁটি আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। সম্মানীত ক্যাপ্টেন মাহফুজ আলম বেগ সহযোদ্ধা হাকিম সামাদ, ওয়াহিদ, আকবর, লিয়াকত, মনির, তোয়াক্কেল, মোকাররমসহ গোপন বৈঠক করেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সরাসরি প্রচণ্ড আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ঘাঁটি দখল করা হবে। গোপন বৈঠকের পর অধিনায়ক বেগ শুধুমাত্র ওয়াহিদ উজ্জামানকে নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণ করেছিলেন। রেকি সম্পন্ন হবার পর জানা গেল, সমগ্র কালীগঞ্জে শত্রুপক্ষের লোকবল-শক্তিমত্তা ও অন্যান্য যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলী, মোগল আমলে নির্মিত দুর্গের ন্যায় শক্তিশালী-দুর্ভেদ্য স্থাপনায় রাজাকার ঘাঁটি, যার কমান্ডে রয়েছে পাঞ্জাবী জেসিও ইয়াসিন।
রাত আনুমানিক নয়টার সময় অধিনায়ক বেগ ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা সহকারে উকসা বিওপি অতিক্রম করে ইছামতি নদী পার হন। পিচ্ছিল কাদামুক্ত গ্রামীণ মেঠোপথ আর সেই সঙ্গে নিশুতি রাত- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে একটি উৎকৃষ্ট পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা। পাকসেনা ও তাদের দোসরগণ রাতের পরিবেশে সাধারণত বাংকারে স্থাপনার অভ্যন্তরে নিরাপদে-ঝুঁকিহীন থাকতে পছন্দ করতো, সেই সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা গেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। মাহফুজ আলম বেগ দলে বলে বিপত্তি-বাধাহীনভাবে এক সময় কালীগঞ্জে টার্গেটের অতি নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছে যান।
আক্রমণের প্রস্তুতি শত ভাগ সম্পন্ন হলে ‘চালাও গুলি’ দলের কমান্ডার নির্দেশ প্রদান করেন। আচমকা আক্রমণের প্রচণ্ডতায় রাজাকারগণ হতভম্ভ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মিনিট পাঁচেক এসএলআর, এসএমজি এবং অস্ত্রাবলীর অব্যাহত গুলিবর্ষণ শত্রুর ঘাঁটির দিকে চলার পর তিনি সকল সহযোদ্ধাদের গুলি বন্ধের আহ্বান জানান। মুক্তিবাহিনীর পক্ষ হতে মারণাস্ত্রের বর্ষণ থেমে গেলে অপ্রস্তুত প্রতিপক্ষ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে।
মাহফুজ আলম বেগ তাদের কঠিন ভাষায় সতর্ক ও হুঁশিয়ার করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। সামান্য সময়ের ব্যবধানে তারা কিছুটা প্রস্তুতি নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে পাল্টা-গুলি ছোঁড়ার প্রয়াস চালায় সেই পাঞ্জাবী জুনিয়ার কমিশন্ড অফিসার ইয়াসিনের কমান্ডে।
জবাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক পুনর্বার তীব্রতরো আঘাতের আদেশ দিয়ে কয়েকজন সহযোদ্ধাসহ অতর্কিতে শত্রুর ঘাঁটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন উদ্যত সঙ্গীত হাতে। শত্রুপক্ষ চতুষ্পার্শ্বে ঘেরাও হয়ে গেলে, মাহফুজ আলম বেগ সাব-সেক্টর কমান্ডার উচ্চকণ্ঠে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘কোনো শালা আর গুলি চালালে খতম করে দেবো, সবাই এই মুহূর্তে সারেন্ডার করো।’
আর কোনো তাদের কাছে ছিলো না সেই রাতে। একে একে ১৮ জন রাজাকার ও তাদের কথিত দুর্ধর্ষ কমান্ডার ইয়াসিন অকুস্থলে সারেন্ডার করতে বাধ্য হয় শেষাবধি। তবে মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহিদের আক্ষেপ, রাজাকার জল্লাদ কাশেম ও যোবাহারকে পালিয়ে যাবার কারণে বন্দি করতে না পারায়। কোনরূপ ক্ষয়ক্ষতি ব্যতিরেকে সকল বন্দিদের নিয়ে অধিনায়ক ঘাঁটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। (চলবে/ অসমাপ্ত)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও কলামিস্ট। akil19@hotmail.com

শেয়ার করুন