স্মরণে বরণে রবীন্দ্রনাথ

45

সাজ্জাদ আলী
দেশ বিভাগপূর্ব সময়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম শহর কলকাতা এবং দ্বিতীয় বৃহত্তমটি ঢাকা। একই দেশ, একই সমাজ, এক মানুষ, এক ভাষা, -কোন সীমানা প্রাচীর তো আর ছিলো না সেকালে। সবুজে শ্যামলে মিলেমিশে তখন একাকার। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে কলকাতার মানুষ ঢাকা এবং ঢাকার মানুষ কলকাতা, -অবাধ যাতায়াত সবার। সেই সময়ে (এমনকি আজও) ঢাকা অঞ্চল থেকে কলকাতায় আগতদের কলকাতাবাসীরা কখনও সখনও “বাঙ্গাল” বলে ডাকতো। আর ঢাকাইয়ারা এর বদলায় ক্যালকেশিয়ানদের বলতো “ঘটি”। এই ঘটি-বাঙ্গাল সম্ভাষণ “প্রিয় মানুষদের জন্য প্রিয় সম্বোধন” বা সামাজিক “খুনসুটি” হিসেবেই বলা হতো। এখনও বন্ধু মহলে এমনটি বলবার চলন আছে। তবে এ সম্ভাষণ মোটেই নিন্দা অর্থে নয়, সদাই ঠাট্টারসে ভরপুর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরের আলয় তৎকালীন বাংলার পূর্ব অঞ্চলে, খুলনা জেলার দক্ষিণডিহির ফুলতলা গাঁয়ে। ক্যালকেশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মৃদু অনুযোগ বা অতি অনুরাগ প্রকাশের জন্য স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে কখনো কখনো “বাঙ্গাল” সম্মোধনে কোনঠাসা রাখতে চাইতেন। তো এমনই এক প্রেক্ষাপট; কবি তখন বর্তমান বাংলাদেশের শাহজাদপুরে পারিবারিক জমিদারী দেখাশোনার কাজে ব্যস্ত। প্রিয়তমা স্ত্রী মৃণালিনী থাকেন সন্তানদের নিয়ে কলকাতায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। বিরহে বিধুর কবি নিয়মিত পত্র লিখছেন স্ত্রীকে। কিন্তু জবাবদানে মৃণালিনী বড়ই কৃপন। এমতাবস্থায় কবি অনুরাগ ঝেড়ে ফেলে কপট-রাগে পত্র লিখলেন স্ত্রীকে। সাথে সাথেই জবাব মিললো। এই জবাব প্রাপ্তির পরে শাহজাদপুর থেকে কবি স্ত্রীকে লিখছেন (১৮৯০ সালের জানুয়ারীতে),-
“ভাই ছোটবউ, যেমনি গাল দিয়েছি অমনি চিঠির উত্তর এসে উপস্থিত। ভালমানষির কাল নয়। কাকুতি মিনতি করলেই অমনি নিজ মূর্তী ধারণ করেন। আর দুটো গালমন্দ দিলেই একেবারে জল। একেই তো বলে বাঙ্গাল! ছি, ছি, ছেলেটাকে পর্যন্ত বাঙ্গাল করে তুললে গা!”
তবে কি, কবি তাঁর প্রিয়তমাকে “বাঙ্গাল” বললেও, মৃণালিনী কবিকে কখনও “ঘটি” ডেকেছেন, তেমন কোন উপাত্ত জানা যায় না!
কবির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করবার সাধ জেগেছে। কিন্তু সে সাধ পুরণের সাধ্য কই? কবি সম্পর্কিত জ্ঞান-সামর্থতো তলানিতে ঠেকা। অগত্যা ভাবছি তাঁর লেখা চিঠিপত্র থেকে দুএকটা উদ্ধৃতি বলে এ যাত্রা স্মরণ-কর্মটি সম্পন্ন করবো। আসলে কবির লিখিত চিঠিপত্রের মধ্যেই আমি আসল মানুষটিকে খুঁজে পাই।

এক.
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি অঞ্চলের ময়মনসিংহের মানুষ। পদার্থবিদ্যা, জীব ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি বিশ্বময়। “গাছের প্রাণ আছে, তারা সাড়া দেয়”, -এটা জগদীশেরই আবিস্কার। “বিনা তারে বার্তা প্রেরণ” আবিস্কারে তাঁর গুরুত্ববহ অবদানের জন্য তাঁকে রেডিও বিজ্ঞানের জনকও বলা হয়ে থাকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথে নিবিড় বন্ধুত্ব ছিলো বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর। নিয়ম করে কবি বন্ধুকে পত্র লিখতেন। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত ৩৮টি পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
পাঠকেরা জ্ঞাত আছেন যে, শেষ বয়সে এসে “ছবি আঁকা” রবি কবির নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। হয়তো তাঁর অন্তর্নিহিত ভাবগুলো তিনি তাঁর কাব্য বা সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করে তৃপ্ত হতে পারছিলেন না। তাই তুলির আঁচড়ে রেখা ও রংয়ের সমন্বয়ে তাঁর মর্মভাবে প্রাণের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথাবিরুদ্ধ আঁকিয়ে। তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। এই বিশাল ছবি ভান্ডারের কোনটিই ভারতীয় ঐতিহ্যগত চিত্রকলার ব্যাকরণ কাঠামোতে ফেলা যায় না। তাই তো যেন তাঁর ছবিগুলো সাহিত্যে নোবেল জয়ী মহৎ একজন কবির “শেষ বয়সের ক্রিড়া” হিসেবে তাঁর সৃষ্ঠিকর্মের বাইরে পড়ে থাকে।
কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে ১৯০০ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর নিজের ছবি আঁকা নিয়ে বন্ধু জগদীশকে কবি লিখছেন,-
“শুনে আশ্চর্য হবেন, একখানা স্কেচবুক নিয়ে ব’সে ব’সে ছবি আঁক্ছি। বলা বাহুল্য, সে ছবি আমি প্যরিস সেলোন (তৎকালীন পাশ্চাত্যের সর্ববৃহত বাৎসরিক চিত্রপ্রদর্শনী উৎসব) -এর জন্য তৈরী করছিনে, এবং কোন দেশের ন্যাশনাল গ্যালারী যে এগুলো স্বদেশের ট্যাক্স বাড়িয়ে সহসা কিনে নেবেন এরকম আশঙ্কা আমার মনে লেশ মাত্র নেই। কিন্তু কুৎসিত ছেলের প্রতি মার যেমন অপুর্ব্ব স্নেহ জন্মে, তেমনি যে বিদ্যাটা ভাল আসেনা সেইটের উপর অন্তরের একটা টান থাকে। এই সম্বন্দে উন্নতি লাভ করিবার একটা মস্ত বাধা হয়েছে এই যে, যত পেন্সিল চালাচ্ছি তার থেকে ঢের বেশি রাবার চালাতে হচ্ছে।”

দুই.
ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের সন্তান রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন সেকালের বাংলা লোক সাহিত্যের অন্যতম সংগ্রাহক ও গবেষক। তাঁর গবেষণা গ্রন্থ মৈমনসিং গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা আজো এ সংক্রান্ত গবেষকদের প্রধান অবলম্বন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুবই আস্থাভাজন বন্ধু ছিলেন দীনেশবাবু। সাক্ষাৎ-আলোচনার বাইরেও কবি নিয়মিত পত্র যোগে নানা বিষয়ে বন্ধু দীনেশের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। দীনেশচন্দ্রকে লেখা কবির ষাটটিরও অধিক পত্রের সন্ধান মেলে। ১৯০১ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোর নিজ বাড়িতে দীনেশের সাথে রবির পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্বরচিত গানগুলো গেয়ে শোনাতেন; সাহিত্য, ধর্ম, সমাজনীতি নিয়ে আলোচনায় মত্ত হতেন। সর্বোপরি কবি নিজের অনেক রচনাই পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পূর্বে দীনেশবাবুকে তা পড়ে শুনিয়ে তাঁর মতামত নিতেন। সেকালে রবীন্দ্রনাথের নতুন কোন লেখা প্রকাশিত হলেই পাঠকেরা যে হুমড়ি খেয়ে পড়তো, তা নয়। বিশেষ করে সাহিত্য বোদ্ধাজনেরা চুলচেরা সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথকে দগ্ধ রাখতেন। কবি নিজে পরমতসহিষ্ণু ছিলেন এবং প্রতিটি সমালোচনাকে নিজের লেখা সমৃদ্ধ করার কাজে লাগাতেন। ডি. এল. রায় (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়) রবীন্দ্র-সমকালের বিশিষ্ট বাঙ্গালী কবি, নাট্যকার ও সঙ্গীতশ্রষ্ঠা। দ্বিজেন্দ্র মোটেই রবিবাবুর লেখার অন্ধভক্ত ছিলেন না। নিজ বিবেচনা মতো তিনি রবীন্দ্র-সৃষ্টির সমালোচনা করতেন।
তো রবীন্দ্রকাব্যের নিত্য সমালোচক ডি. এল. রায়ের সমালোচনাগুলো নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেন মাঝেমধ্যেই প্রতিবাদমূখর হয়ে উঠতেন। এই প্রতিবাদক বন্ধু দীনেশকে নিবৃত রাখতে কবি শান্তিনিকেতন থেকে ১৯০৬ সালের ৩০শে অক্টোবর লিখছেন,-
“আমার কাব্য সম্পর্কে দ্বিজেন্দ্রলাল মহাশয় যে সব অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন তাহা লইয়া বাদ প্রতিবাদ করিবার কোনই প্রয়োজন নাই। আমরা বৃথা সকল জিনিসকে বাড়াইয়া দেখিয়া নিজের মধ্যে অশান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করি। জগতে আমার রচনা খুব একটা গুরুতর ব্যাপার নহে তাহার সমালোচনাও তথৈবচ। তা ছাড়া, সাহিত্য সম্বন্দে যাঁহার যে রূপ মত থাকে থাক না সে তুচ্ছ বিষয় লইয়া কলহ সৃষ্টি করিতে হইবে নাকি? আমার লেখা দ্বিজেন্দ্র বাবুর ভাল লাগে না কিন্তু তাহার লেখা আমার ভাল লাগে অতএব আমিইতো জিতিয়াছি-আমি তাঁহাকে আঘাত করিতে চাইনা”।
রবি ঠাকুর চিঠি লিখতে ও পেতে ভালবাসতেন। বিভিন্নজনকে পাঁচ হাজারেরও অধিক পত্র লিখেছেন তিনি। যার মধ্যে প্রায় চার হাজার নানান সাময়িকী বা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পত্রের বিষয়াবলীকে মোটাদাগে দুই শ্রেণীতে ফেলা যায়, আত্মজিজ্ঞাসামূলক পত্র এবং প্রয়োজননির্ভর পত্র। চিঠিতেই রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত আত্মপ্রকাশের উপায় খুঁজে পেতেন।
স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে রবীন্দ্র নাথের লেখা ৩৬টি চিঠির সন্ধান পাওয়া যায়। মৃণালিনী অতি সংগোপনে স্বামীর পত্রগুলি সংরক্ষণ করতেন। কবি পতিœর মৃত্যুর পরেই সবগুলো চিঠি আবিস্কৃত হয়। পত্র লিখনের আনন্দ আস্বাদনে কবি নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র নিজেই হাতে লিখে তাঁর প্রথম জীবনের সাহিত্যসঙ্গী ও ঘনিষ্ট বন্ধু প্রিয়বাবুকে (প্রিয়নাথ সেন) পাঠিয়ে দিয়েছিলেন,-
“প্রিয় বাবু-
আগামী রবিবার ২৪শে অগ্রহায়ন তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভবিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং যোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহাদি সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মিয়বর্গকে বাধিত করিবেন। ইতি।
অনুগত শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(অনুলেখক সাজ্জাদ আলী বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

শেয়ার করুন