স্মৃতিতে ১৯৭১-এর দিনগুলো

13

হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব
ছোট বেলায় মাকে আমার জন্মের কথা জিজ্ঞেস করলে, ১৯৭২ না বলে বলতেন সংগ্রাম থেকে নেমে। আমরা আট ভাই বোনের, আমি সবার ছোট। কৌতুহল অবসান না হওয়া কঁচি মন উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করতাম সংগ্রাম থেকে নেমে কথাটার মানে কি? আমার এক মেসো একদিন আমাকে বললেন, তুই যখন মায়ের অস্তিত্ব জুড়ে তখন বাঙালির জীবনে এক নিকষ কালো মার্চ এসেছিল ১৯৭১ সালে। অভয়ারণ্যে শিকারির হামলায় বুনো হরিণ যেমন ছুটে পালায় দিকবিদিক ভাবে, ঠিক তেমনি পাকিস্তানি হানাদারদের পাশবিক আক্রমণের মুখে ; ভিটামাটি ছেড়ে ওপারে ভারতে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলো ১ কোটি বাঙালি। আমাদের পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলো মেঘালয়ে। বাবা মুজিবনগর সরকারের অধীনে বালাট, আহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রের কনভেনর নিযুক্ত হোন। দীর্ঘ নয়মাস মায়ের অস্তিত্ব জুড়ে আমি আর বাংলা মায়ের গর্ভে স্বাধীনতা আমরা দুই পিটেপিটি বাড়তে থাকি। স্বাধীনতার তখনো চোখ তৈরি হয়নি, তবুও সে দেখেছে নির্মম গণহত্যা, কসাইদের ধাঁরালো নখে ক্ষত বিক্ষত করেছে কত বীরঙ্গনার শরীর। মায়ের পেটে আমার ও তখনো কান তৈরি হয়নি তবু শুনেছি ধর্ষিতার আর্তনাদ। দাঁতাল শুয়োর পাকিস্থানী জানোয়ার সাচ্চা মসুলমান পয়দা করার নামে, তরল লালসায় কলংকিত করেছে হাজারো জরায়ুকে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তস্নাত স্বাধীন মাটিতে আমার মা নেমে আসে, ফিরে আসে পুরো পরিবার, ভূমিষ্ট হলাম আমি; আমার উদ্বেলিত মুষ্টিবদ্ধ হাত অহংকারী হয়ে জানান দিল, আমি স্বাধীনতা। গৌরবের জনযুদ্ধের ফসল।
এ গল্প শুধু আমার একার নয়, এ গল্প তাদের; যাদের আমরা প্রজন্ম ‘৭১ বলে মানি।
গল্পের ভিতরের গল্পকে জানতে হলে ঘুরে আসতে হবে ইতিহাসের টাইম মেশিনে। দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে জন্ম পাকিস্তানে, বাঙালির বঞ্চনার ক্ষোভ দাবানলের মত ছড়িয়ে পরে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ। যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জিন্নার কণ্ঠে দাম্ভিক উচ্চারণ ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’! ময়দানে না-না-না বলে সমস্বরে চেচিয়ে উঠেছিল হাজারো জনতা। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মায়ের ভাষার জন্যে আন্দোলন, ঘর ছেড়ে রাজপথে বের হয়ে এসেছিলো । সংঘবদ্ধ আন্দোলনের মুখে আসে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মায়ের ভাষা মাতৃদুগ্ধকে মর্যাদা জানাতে ‘১৪৪ ধারা মানছি না মানবো না’
গর্জে উঠে জনতা। শাসকের গুলি বুকে নিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ বপন করে, রমনার উর্ধমুখী কৃষ্ণচূড়ার নিচে। আমাদের ভাষা শহিদেরা।
এর পর ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বাঙালি তাদের অধিকার আদায়ে খুঁজেছে মুক্তির পথ। শোষণ থেকে মুক্তি, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, সা¤প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি। শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, ৬ দফায় স্বাধীনতার মন্ত্রে জাতিকে একত্রিত করেছিলেন যিনি, তিনি ৫২,৬৮,৬৯ সকল সাহসের একত্রিত উচ্চারণ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।
৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামিলীগ নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়া সত্তে¡ও, বাঙালি আত্ম–অধিকার নিয়ন্ত্রণের ভার পেলো না। পাকিস্থানি শাসকের ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানায় রাস্তায় নেমে আসে জনতা। শেখ মুজিব হয়ে উঠেন পূর্ব বাংলার শোষিতের একমাত্র মুখপাত্র আর ছয়দফা হয়ে উঠেছিলো মুক্তির সনদ। ৬ দফার বাইরে না যাওয়া নিয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনড়। মুক্তিকামি জনতার ৬ দফার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সকল জনপ্রতিনিধিরা শপথ বাক্য পাঠ করেন। এবং তাতে বলা হয় ৬ দফার সাথে যারা বেঈমানি করবে, বাংলার জনগণ তাদের কখনই ক্ষমা করবে না। ১৯৭১ সালের ১ লা মার্চ ইয়াহিয়া খান, জাতির উদ্দ্যেশ্যে ভাষণে ৭ই মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত করেন। ক্ষোভে ফেটে পরে পূর্ব বাংলার মানুষ। এর পর দাবায়ে না রাখার কাব্য রচিত হয় ৭ ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে।
৭ই মার্চ ১৯৭১ জনসমুদ্রের উদ্দাম সৈকতে লাখো মানুষের মতো প্রত্যক্যদর্শী ছিলেন সেদিনের তরুণ কবি রিপোর্টার নির্মলেন্দু গুণ। তিনি আমাদের কথা ভেবে লিখে রেখেছেন আগুন ঝরা ৭ ই মার্চের শ্রেষ্ঠ গল্প। লাখো মানুষের ব্যাকুলতাকে অবসান করে, গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে বঙ্গবন্ধু তর্জনী উঁচিয়ে শোনালেন তাঁর স্পর্ধিত উচ্চারণ -‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
তাঁর মোহন বাঁশির সুরে সেদিনের রেসকোর্স ময়দানের দিগন্ত প্লাবিত জোয়ারে, লাখো মানুষের একজন হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন নবীগঞ্জের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চন্দ্রকান্ত দাস। ধমনিতে ঢেউ খেলিয়েছিল বজ্রকন্ঠের বাণী। বিশ্বাসের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে হলে ফিরে দেখলেন, প্রতিটি ছাত্র বন্ধু যেন একেকজন মহাপ্রলয়ের নটরাজ। প্রতিজ্ঞা জুড়ে দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করার দূর্জয় শপথ।
মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ২০ মার্চ ১৯৭১ জগম্নাথ হল ত্যাগ করে নবীগঞ্জ চলে আসেন চন্দ্রকান্ত দাস। সেই সময় দেখা হয়, তাঁর নিজের বর্ণনায় নবীগঞ্জের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত শেষ কৃতি ছাত্র অনুদ্বৈপায়ন ভট্রাচার্য্যের সাথে। তিনি ছিলেন জগন্নাথ হলের তৎকালীন হাউজ টিউটর। ফিজিক্সের উপর পি,এইচ,ডি করতে, ফুল স্কলারশিপে লন্ডনে যাওয়ার পূর্বে এসেছিলেন দেখা করতে গ্রামের বাড়িতে। স্থির হলো দুজনেই ২৪ মার্চ ফিরে যাবেন ঢাকায়। কিন্ত মায়ের পিড়াপিড়িতে থেকে যান চন্দ্রকান্ত দাস। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য একা ফিরে যান ঢাকায়। এর পরদিন ২৫ মার্চ ১৯৭১ জগন্নাথ হলের সকল ছাত্র শিক্ষককে বেছে বেছে হত্যা করে জানোয়ারের দল। সারাদেশ জুড়ে চলে গণহত্যা। মায়ের বাধার মুখে যমের দোয়ার থেকে ফিরে পাওয়া জীবন, আজকের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুক্তিযোদ্ধা সি, কে, দাস (চন্দ্রকান্ত দাস) এর বর্ণনায়, তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল।
জীবন থেকে নেওয়া এমন হাজারো গল্পের, সশস্ত্র সংগ্রামের, জীবন সংগ্রামের ৯ টি মাস। জীবন দেওয়ার গল্প, জীবন নেওয়ার গল্প, জীবনকে পাকিস্তানি জানোয়ারদের হাতে তুলে দেওয়া দালাল দের গল্প। সভ্যতাকে মধ্যযুগে টেনে হিচরে নিয়ে যাওয়ার গল্প। আমরা তার কতটুকুই বা জানি? সারা বৎসর হকারের দখলে পরে থাকা শহর কিংবা গঞ্জের শহিদ মিনারে, ঘুম ভাংগানিয়া গান হয়ে আসে জাতীয় দিবসগুলো। মিনারের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে গৌরবের গল্প লিখা আছে। দায়িত্ব নিয়ে তা আমাদের জানতে হবে। আর দায় থেকে জানাতে হবে প্রজন্মকে।
আমার জন্মমাটিতে শহিদ মিনারটি শহিদ সিরাজের নামে। হাসান মোর্শেদ -‘দাস পার্টির খোঁজে’ যখন চষে বেড়িয়েছেন আমার হ্ওার এলাকায়, শহিদের চিঠি গল্প হয়ে ধরা দেয় তাঁর হাতে।
সিরাজ শহিদ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে তাঁর বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন সেই চিঠি সহযোদ্ধা মারফত এসে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখান থেকে নিয়মিত চিঠি পাঠ হতো মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ভুদ্ধ করতে। সিরাজ লিখেছিলেন।
টাকের ঘাট হইতে।
প্রিয় আব্বাজান
আমার ছালাম নিবেন। আশা করি খোদার কৃপায় ভালই আছেন। বাড়ির সকলের কাছে আমার শ্রেণিমত সালাম ও স্নেহ রহিলো। বর্তমানে যুদ্ধে আছি। আলিরাজা, রওশন, সাত্তার, রেণু, ইব্রাহিম, ফুল মিয়া সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করিয়াছি। আমাদের জন্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য দোয়া করিবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। কারণ দেশ স্বাধীন না হলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধকেই জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে মা’কে কষ্ট দিলে আমি আপনাকে ক্ষমা করিবো না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে, চাচা-মামাদের ও বড়ভাইদের নিকট আমার সালাম। বড় ভাইকে চাকরিতে যোগ দিতে নিষেধ করিবেন। জীবনের চেয়ে চাকরি বড় নয়। দাদুকে দোয়া করিতে বলিবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হইতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত। দোয়া করিবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ-লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্রহারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন।
আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নাই, আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সাধ মিটে যাবে। দেশবাসী স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর, মীরজাফরি করিওনা। কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদের ক্ষমা করিবে না এবং বাংলায় তোমাদের জায়গা দিবে না।
ছালাম দেশবাসী ছালাম
ইতি
মোঃসিরাজুল ইসলাম।
ঈশ্বর সিরাজুল ইসলামকে নিরাশ করেন নি। আর তাঁর দাদুর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া দোয়া ও কবুল হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিয়েছেন মুক্ত বাতাস কিনতে। শহিদ হয়েছেন, মাটির জন্যে, মমতার জন্যে, ভাটিয়ালি সুর আর পূবালি বাতাসের জন্যে, শিউলি তলার দুর্বো, গাজীর গান, বাউলের সুর আর তুলশীতলা ও বরেন্দ্র ভূমের সোনা মসজিদের জন্যে।
আমরা কেউ শুনিনা শহিদদের আত্মত্যাগের আজান। জনযুদ্ধে সন্তান হারাদের কেউ বাবা বলে ডাকেনি, অনাদরে অবহেলায় খালি পায়ে ফুটপাতে বই বিক্রি করেছেন বীরমাতা রমা চৌধুরী। জয়বাংলা রণধ্বনিতে শেকল পড়ানো হলো, আমাদের কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হলো ১৯৭৫ এ। এর পর শকুনিরা ধর্ম শিকাড়ি হয়ে উঠে রাজনীতিতে, ভোটযুদ্ধে, সামাজিকতায়। জাতির জনককে হত্যা করার পর তাদের প্রথম শিকার ছিলো সংবিধান আর এখন এতো কিছুর পরও, জাতির জনকের সুযোগ্যা কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর হওয়ার পরও এদের শিকার এখন আমাদের বর্ণমালা। পাঠ্যপুস্তক সা¤প্রদায়িকীকরণ তাই প্রমাণ করে। জাতির জন্য এ বিরাট অসুখ, এই অসুখ সহজে সারিবে না। ইহাই অংক, ইহাই বিজ্ঞান এই অংক বুঝিতে হইবে অন্যতায় হইবে না। কথা গুলো বলতেন জসিমউদদীন মন্ডল।
এই প্রবাসে ও মৌলবাদী শক্তি, নিজের বিবেককে প্রতারিত করে, বিনয়ি সেজে, দেশপ্রেমের সাথে যুক্ত প্রতিটি কর্মকান্ডে নিজেদের পাদপ্রদীপে আনার চেষ্টায় কামিয়াব হচ্ছে। আর সত্যিকার দেশপ্রেমিকরা দলাদলিতে মত্ত।
মার্চ এলেই আমাদের চেতনা নেরেচেরে উঠে। বঙ্গবন্ধুর নামে গড়ে উঠা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নেতাদের উচ্চকিত ভাষণ আর মুজিবিয় বসন আজকাল জাতীয় দিবসের ফ্যাসন।
বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসতে হলে তাঁর সংগ্রামকে ভালবাসতে হবে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সু-শাসনের জন্যে কাজ করতে হবে। তাঁর সংগ্রামের অন্তঃস্তলে যে স্বপ্ন লালন করেছেন, অসা¤প্রদাযড়ক বাংলাদেশ তাকে ভালবাসতে হবে। বাঙালির দেশাত্ববোধের সাথে জড়িত যে শ্লোগান, ভালবাসতে হবে সেই বজ্রকণ্ঠের -‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিকে। তবেই বৃথা যাবেনা ৫২ থেকে ৭১ এর ফুঁসে উঠা, গর্জে উঠা। দুরের হয়ে যাওয়া দেশপ্রেমিকের গল্প আবারো পুনরাবৃত্তি হবে কালের সাক্ষী মেনে।
বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায়নি, দাবায়ে রাখা যাবে না।
জয় বাংলা।
হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব।
সাংস্কৃতিক কর্মী।
টরন্টো, কানাডা।

শেয়ার করুন