কোটা পদ্ধতি বাতিল

42

অনলাইন ডেস্ক : টানা চারদিনের আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, হামলা-ভাঙচুরে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেখান থেকে লুটপাট হওয়া মালামাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দিতে হবে। গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর-পর্বে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোটা রাখলে এভাবে বার বার আন্দোলন হবে। কোটা পদ্ধতিরই দরকার নেই।
যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-প্রতিবন্ধী তাদের অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর চলাকালে জাহাঙ্গীর কবির নানক কোটা সংস্কারে আন্দোলনের প্রসঙ্গ এনে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে কাজ করছি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যখনই আমরা আমাদের কার্যক্রম চালাচ্ছি, তখন অবশ্যই একটা দেশ উন্নত হয় যখন সে সমাজ শিক্ষিত সমাজ হিসেবে গড়ে ওঠে। শিক্ষাই হচ্ছে দারিদ্র্যবিমোচনের সব থেকে মূল হাতিয়ার বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই শিক্ষার ওপর সবসময় গুরুত্ব দিয়েছি। এবং যে সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাপকভাবে গড়ে তোলা, কলেজ গড়ে তোলা, বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় করা, বহুমুখী ট্রেনিং যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পায়, যাতে তাদের কর্মক্ষেত্রটা প্রসারিত হয় দেশে-বিদেশে, সে ধরনের পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। বড় বড় জেলাগুলোতে ইতিমধ্যে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। সেখানে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে যা যা দরকার আমরা করে যাচ্ছি। শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গড়ে উচ্চ শিক্ষায় যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা সহযোগিতা পায়, বৃত্তি পায় তার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত আমরা বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। এই যে, এতো ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি- কেন করছি? আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে। মানুষের মতো মানুষ হবে। উপযুক্ত নাগরিক হবে। দেশ পরিচালনা করবে। কেননা, এরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর। এরাই তো এই রাষ্ট্রের কর্ণধার হবে। এরাই দেশকে পরিচালনা করবে।

তিনি বলেন, খুব দুঃখ লাগে যখন দেখলাম, হঠাৎ কোটা সংস্কারে আন্দোলন। এ আন্দোলনটা কী? সমস্ত লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় বসে থাকা। রাস্তায় চলাচল বন্ধ করা। এমনকি হাসপাতালে রোগী যেতে পারছে না। কর্মস্থলে মানুষ যেতে পারছে না। লেখাপড়া বন্ধ, পরীক্ষা বন্ধ, সব বন্ধ করে বসে গেছে। এই যে ঘটনাটা এবং এটা মনে হলো যেন সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। ডিজিটাল বাংলাদেশ আমিই গড়ে তুলেছিলাম। আজকে ইন্টারনেট, ফেসবুক বা ইউটিউব যাই ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো তো আমাদেরই করা। বাংলাদেশকে আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা দেবো, সেই শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই শিক্ষা গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না হয়ে, এখন সেটা ব্যবস্থা হচ্ছে কী? এখন সেটা গুজব ছড়ানোর একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। একটা ছেলে তার মাথায় আঘাত লেগেছে। হঠাৎ একজন তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলো যে, সে মারা গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা সব বেরিয়ে গেল। এমনকি মেয়েরা। আমরাও ছাত্র ছিলাম, দেখি নাই। রাত্রি একটার সময় হলের গেট ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। শুধু একটা গুজবের ওপর। সেই ছেলে যখন বললো, আমি মরি নাই, আমি বেঁচে আছি, তখন তাদের মুখটা থাকলো কোথায়? আর এই স্ট্যাটাসটা কে দিলো? এরকম মিথ্যা গুজব ছড়ালো? এবং এটা কেনো দেয়া হলো? এই যে, মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে, এরপর যদি কোনো অঘটন ঘটতো তার দায়দায়িত্ব কে নিতো? এটা কি একবার কেউ চিন্তা করেছে? আর সব থেকে ন্যক্কারজনক ঘটনা হলো- ভিসির বাড়িতে আক্রমণ।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। বাংলাদেশের সব আন্দোলনে সেখানে আমরা গিয়েছি। এই স্কুল থেকে, কলেজ থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি আন্দোলন করতে। কখনও ভিসির বাড়িতে যেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, ছাত্রীরা আক্রমণ করতে পারে, ভাঙচুর করতে পারে! আর সে ভাঙচুরটা কী? ভিসির বাড়ির ওই ছবি দেখে আমার মনে পড়ছিল, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ৩২ নম্বরের বাড়ি যেভাবে ভাঙচুর করেছিল, ঠিক একই কায়দায়। এমনকি সমস্ত লকার খুলে গহনাগাটি চুরি করা। টাকা-পয়সা চুরি করা থেকে শুরু করে, বাথরুমের কমোড খুলে রাখা, সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দেয়া। ভিসি ছিলেন, তার স্ত্রী, তার ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন ছিলেন। তারা ভিসির সামনে এসেছিলো…, তার ওপরে আঘাত পর্যন্ত করতে গেছে। যদিও অন্য ছেলেরা তাদের বাঁচিয়েছে। আর তার ছেলেমেয়েদের ভয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। আর একতলা দোতলা সব একেবারে তছনছ। শুধু তাই না, সেখানে সিসি ক্যামেরা যে লাগানো ছিল তা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙেছে এবং ক্যামেরার যেখানে রেকর্ডার, রেকর্ডিং বক্সটা পর্যন্ত সরিয়ে নিয়ে গেছে। কত পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার উপযুক্ত না। বা তারা ওখানকার ছাত্র বলে আমি মনে করি না। কারণ কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে এভাবে অপমান করতে পারে না আর এভাবে আঘাত করতে পারে না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সব থেকে জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা দাবি করেছে। খুব ভালো কথা। আমরা তো বসে নেই। সোমবারে ক্যাবিনেট মিটিং…। সেখানে বসে আমরা বিষয়টা আলোচনা করলাম। আমাদের মন্ত্রী সড়ক ও সেতু বিভাগের এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাদের সঙ্গে বসবেন এবং তাদের নিয়ে তাদের সঙ্গে বসলো। সেই সঙ্গে আমি আমাদের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, যার কাজ এটা, ক্যাবিনেটের সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিলাম যে, আপনি এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন। এবং যাকে যাকে দরকার তাকে নিয়ে বসে এ বিষয়টা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন যে, ওরা যে দাবিটা করেছে এর যৌক্তিকতা কি? আর এটা কতটুকু কি করা যায়? আর মন্ত্রী গেল, তাদের সঙ্গে বসলো। একটা সমঝোতা হলো। সমঝোতা হলো যে, এটা তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে এবং দেখা হচ্ছে যে কীভাবে হবে? এখানে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, জনপ্রশাসনের সচিব থেকে শুরু করে আরো সংশ্লিষ্ট যারা তারাই বসবেন। এবং ক্যাবিনেট সেক্রেটারি নিজে যখন আমাদের ক্যাবিনেটের বিষয়টা প্রেসে তিনি বলেন, তখন এ কথাটা বলেও দিলেন যে, এ নির্দেশটা আমি দিয়েছি যে এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য।
অনেকে মেনে নিলো। অনেকে মানলো না। সেই সারারাত অনেক ছাত্রছাত্রী সেখানে থেকে গেল। কেন? যখন একটা আলোচনা হচ্ছে, কথা হচ্ছে, তখন এই আন্দোলন চালিয়ে যাবার কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে? তাছাড়া, ভিসির বাড়ি ভাঙা, রাস্তায় আগুন দেয়া, এমনকি পহেলা বৈশাখ। সবসময় চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে অনেক কিছু তৈরি করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। যেই মঙ্গল শোভাযাত্রা আজকে আমরা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে যেটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই জিনিসগুলো পুড়িয়ে টুড়িয়ে, ভেঙেটেঙে সব তছনছ। এটা কি ধরনের কথা? ছাত্ররা এরকম ধ্বংসাত্মক কাজ করবে কেন? আর মেয়েরা যে হল থেকে বেরিয়ে চলে আসলো, এই গভীর রাতে, আমি সারারাত ঘুমাতে পারি নি। আমি বার বার ফোন করেছি। আমি সাথে সাথে নানককে পাঠিয়েছি। সে ওখানে গেল, ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারিসহ। তাদের সঙ্গে কথা বললো। প্রেসকে বললো যে, আমরা এটা নিয়ে দেখছি। তোমরা এভাবে ভাঙচুর করো না। আগুন দিও না। তাদের ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলো। তারপরও তারা কোনো কিছুই মানবে না। এবং তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি- বেসরকারি এমনকি ঢাকার বাইরে সব রাস্তায় নেমে গেছে। কি? কোটা সংস্কার। এটা কিন্তু একবার না। এ ধরনের কোটা সংস্কার আরো অনেকবার এসেছে। এবং বার বার এটাকে সংস্কার এটা সেটা করা হয়েছে। এখন, আমার কথাটা হচ্ছে, আমরা, একটা নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। আমাদের ছেলেমেয়ে। এরা যারা করছে তারা আমাদের ছেলেমেয়ে কেন, অনেকে তো আমার নাতির বয়সী। তাদের কিসে মঙ্গল হবে না হবে আমরা কি তা কিছুই বুঝি না? তাদের কি ভালো হবে আমরা তাই জানি না? ১৯৭২ সাল থেকে এই কোটা পদ্ধতি চলছে। সময় সময় সংস্কার করা হয়েছে। কোটা যাই থাক আমরা কিন্তু সবসময় যখনই যেই কোটা পূরণ না হয়, সেখানে কিন্তু আমরা ওই যে তালিকা থাকে আমরা তাদের চাকরি দিয়ে দিই। আমি আপনাকে একটু জানাতে চাই, সংসদ সদস্যদেরও জানানো উচিত। যেমন, ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় মেধাভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ এসেছিল ৭৭.৪০ ভাগ। মেধাভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছে ৭৭.৪০ ভাগ। ৩৫তম বিসিএসে পেয়েছে ৬৭.৪৯ ভাগ। ৩৬তম বিসিএসএসে পেয়েছে ৭০.৩৮ ভাগ। মেধারা কিন্তু কেউ বাদ যায়নি। প্রত্যেককে নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে যেমন একটা হতো যে, অমোক কোটায় পাওয়া যাচ্ছে না তাহলে নীতিমালা শিথিল করে মেধাভিত্তিক নেয়া হবে। আমি নিজে হাতে লিখে দিলাম এভাবে না করে এটাই নীতিমালা হবে যেখানে কোটায় পাওয়া যাবে না, সেখানে তালিকা থেকে দিয়ে দেয়া হবে। সেটা কিন্তু অনেক দিন ধরে চলছে। আমি জানি না ছাত্ররা এ খবরটা রাখে কি-না। আমার কথা বিসিএস পরীক্ষা যারা দেয়, তারা সকলেই মেধাবী। কেউ মেধার বাইরে না। কোটায়ও যারা, তারাও একসঙ্গেই পরীক্ষা দেয়। রিটেনে সকলকেই পাস করতে হয়। সেই পাস করা থেকেই কিন্তু তাদের চাকরিটা দেয়া হয়। সেখানে কোথায় কি সংস্কার? কি আপত্তি? সেটা স্পষ্ট না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনকারীদের একটি দাবিতে এটাও বলা আছে, যেখানে কোটায় পাওয়া যাবে না, সেখানে মেধা থেকে দেয়া হবে। ওটা তো বহু আগে থেকে আমরা কার্যকর করেই ফেলেছি। তারা কি এটাও জানে না। এমনকি আমার দুঃখ লাগে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো প্রফেসর বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, তারাও আবার একই সুরে কথা বলছেন। তারা এটা দেখেনই নাই আমরা ইতিমধ্যে মেধাতালিকা থেকে নিয়োগ দিচ্ছি। নিয়োগ যদি না দিতাম না হলে ৭৭ ভাগ বা ৭০ ভাগ নিয়োগ কিভাবে পেতো তারা? আর যারা কোটায় পাচ্ছে, তারাও তো মেধাবী। তার মানে শতভাগ মেধাবী। তারপরও আন্দোলন। তাহলে ঠিক আছে, আজকে সকালে আমার কাছে যখন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি এলো যে, আমরা তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারছি না। তাছাড়া এই চৈত্রের রোদের মধ্যে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় বসে আছে, এই রোদে বসে থাকলে তো তাদের অসুখবিসুখ হবে। তারা রাস্তা বন্ধ করে রাখছে। এমনি যানজন তারমধ্যে তীব্র যানজট, রোগী যেতে পারছে না হাসপাতালে, হয়তো গাড়িতেই মারা যাচ্ছে। কেউ অফিস আদালতে যেতে পারছেন না। কাজকর্ম করতে পারছেন না। সব জায়গায় এমন একটা অবস্থা। জেলা কোটা আছে। জেলায় জেলায় যে ইউনিভার্সিটি, সেখানেও তারা রাস্তায় নেমে গেছে। তারা যখন নেমে গেছে। জেলায় যারা, তারাও চায় না। এরাও চায় না। কেউই চায় না। তাহলে আমি ওদের বলে দিয়েছি যে বলে দাও, কোনো কোটাই থাকবে না। কোনো কোটার দরকার নেই। ঠিক আছে, বিসিএস যেভাবে পরীক্ষা হবে, মেধার মাধ্যমে সব নিয়োগ হবে। এতে তো আর কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমরা কোনো শ্রেণি যাতে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের সংবিধানে আছে, অনগ্রসর যারা তারা যেনো বঞ্চিত না হয়। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের জন্য একটা কোটা। আমাদের মহিলারা। আগে মহিলাদের কি অবস্থা ছিল? আমি ৯৬ সালে যখন সরকারে এসছি, তখন কি একটা মহিলা সচিব ছিল? বা কোনো সরকারি উচ্চপদে চাকরি পেতো? পুলিশের কোনো পদে চাকরি পেতো? একজন মহিলাও কি হাইকোর্টে জজ ছিল? কোথায় কেউ ছিল না । এমনকি, পাকিস্তান আমলে জুডিশিয়াল সার্ভিসে মহিলারা ঢুকতে পারবে না এই আইন ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে আইন পরিবর্তন করে দেন এবং মেয়েদের ঢোকার সুযোগ করে দেন। এবং চাকরিতে মেয়েদের জন্য ১০ শতাংশ কোটাও করে দেন। এবং নির্যাতিত নারীদের ব্যাপারেও তিনি বলেন। এখন দেখি আমার মেয়েরাও নেমে গেছে রাস্তায়। কোটা সংস্কার, কোটা চায় না। ধরে নেব তারা কোটা চায় না। যখন আলোচনা হয়েছে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে, তখন যে মহিলা প্রতিনিধিরা ছিল তারা বলে দিয়েছে স্পষ্ট তারা কোটা চায় না, তারা পরীক্ষা দিয়ে চলে আসবে। খুব ভালো কথা। আমি তো খুব খুশি। কারণ আমি নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি। আজকে সব জায়গায় নারী। তাদের অবস্থানটা আছে। প্রত্যেকটি জায়গায় আমি বেছে বেছে দিয়েছি। যখন চায় না তখন আর দরকারটা কী। তাহলে কোটাপদ্ধতিরই দরকার নেই। আর যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, তাদেরকে অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবো। কোটা নিয়ে এই আন্দোলন আমি ছাত্রদের বলবো- তাদের আন্দোলন তারা করেছে, যথেষ্ট, এখন তারা ক্লাসে ফিরে যাক। আর এই ভিসির বাড়ি যারা ভেঙেছে, লুটপাট কারা করেছে, লুটের মাল কোথায় আছে, কার কাছে আছে, ছাত্রদেরই তা খুঁজে বের করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে যারা লুটপাট ভাঙচুরে জড়িত, তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাকে আমরা নামিয়েছি। এটা তদন্ত করে বের করতে হবে। এবং সেই ক্ষেত্রে শিক্ষক ও ছাত্র সবার সহযোগিতা চাই। কারণ, এত বড় অন্যায় আমরা কোনোমতে মেনে নিতে পারি না। আমাদের শিক্ষক যারা এখনো বেঁচে আছেন, যখন তাদের দেখি, আমরা তাদের সম্মান করি। এখনো সম্মান করি। আমি প্রধানমন্ত্রী হই, যাই হই, যখন আমি শিক্ষকের কাছে যাই, আমি তখন তার ছাত্রী। সেইভাবেই তাদের সঙ্গে আচরণ করি। গুরুজনকে অপমান করে শিক্ষা লাভ করা যায় না। সেটা কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা হয় না। হয়তো একটা ডিগ্রি নিতে পারে। প্রকৃত শিক্ষা হয় না।

তিনি বলেন, প্রত্যেকেই অন্তত একটা শালীনতা বজায় রাখতে হবে। নিয়ম মেনে চলতে হবে। আইন মেনে চলতে হবে। একটা রাষ্ট্র পরিচালনা কতগুলো নীতিমালার ভিত্তিতে চলে। আর চলে বলেই আজকে আমাদের স্বাক্ষরতার হার যা ৪৫ ভাগে ছিল। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় সব যে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল, সন্ত্রাসী কর্মকা- ছিল, আমি আসার পর সেগুলো কঠোর হস্তে দমন করছি। এবং সেখানে একটা নিয়মিত শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমাদের এখান থেকে বিএ পাস করে বিদেশে গেলে আবার সেই ইন্টারমিডিয়েট থেকে পড়তে হতো। আমরা সেখানেও পরিবর্তন এনে দিয়েছি। সেমিস্টার সিস্টেম করে দিয়েছি। কে করেছে? সব কিন্তু আমার হাতে করা। আমরা প্রথম সরকারে থাকার সময়েই করে দিয়েছি। গ্রেডিংয়ে নাম্বার পাওয়া। সেটাও আমরা করে দিয়েছি। আধুনিকভাবে করে দিয়েছি যেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের শিক্ষার সামঞ্জস্যতা থাকে। বিএ পাস করে ওখানে গিয়ে যেন ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হতে না হয়। যেন সমানভাবে পড়তে পারে। আমরা সেইভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। নতুন নতুন হল এবং যত ডেভেলপমেন্ট হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কে করে দিয়েছে?
আমাদের সরকার করেছে। আমরা করে দিয়েছি। ছাত্রদের জন্য শিক্ষার একটা সুযোগ সৃষ্টি করা। সবই করে দিয়েছি- তারপরও তারা আলোচনা হলো, একটা সুনির্দিষ্ট তারিখ দিলো, কেবিনেট সেক্রেটারিকে আমি দায়িত্ব দিলাম। তারা সে সময়টা দিলো না। মানি না মানবো না বলে তারা যখন বসে গেল, আস্তে আস্তে সব তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। তো খুব ভালো কথা। সংস্কার, সংস্কার করতে গেলে, কয়দিন পর আবার আরেক দল এসে বলবে আবার সংস্কার চাই। তো কোটা থাকলেই সংস্কার। আর না থাকলে সংস্কারের কোনো ঝামেলাই নাই। কাজেই কোটা পদ্ধতি থাকারই দরকার নাই। আর যদি দরকার হয়, দেখবেন আমাদের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি তো আছেন। তাকে তো আমি বলেই দিয়েছি, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে তারা কাজ করবে, তারা দেখবে। কিন্তু আমি মনে করি, এরকম আন্দোলন বারবার হবে। বারবার শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটবে। এই যে পরীক্ষা নষ্ট হলো। যেখানে আজ পর্যন্ত একটা সেশন জট ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে তারা চাকরি পেতো। বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করেছি, সেখানে চাকরির সুযোগ আছে। অথচ এই কয়েকদিন ধরে সমস্ত ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ। তারপর আবার ভিসির বাড়ি আক্রমণ। রাস্তাঘাটগুলোতে যানজট। মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন? এই বারবার কষ্ট বন্ধ করার জন্য আর বারবার এই আন্দোলন ও ঝামেলা মেটানোর জন্য কোটা পদ্ধতিই বাতিল। পরিষ্কার কথা। আমি এটাই মনে করি, সেটা হলেই ভালো।

শেয়ার করুন