হাসিনা-মোদি বৈঠকে যে আলোচনা হতে পারে

80

অনলাইন ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি নিয়ে বৈঠক হবে আগামীকাল। সেই বৈঠকে মোদি চাইলে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লির এক গণমাধ্যম প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে এমনটাই জানান। মন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়াসহ বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের যে অবদান তা বাংলাদেশ কখনো ভুলেনি। মন্ত্রী বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, বিশেষত বাস্তুচ্যুতদের ফেরাতে ভারতের কার্যকর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সেটি মোদির সঙ্গে আলোচনায় পুনর্ব্যক্ত করবেন তিনি।
তবে ওই বৈঠকে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে কি-না তা স্পষ্ট করেননি মন্ত্রী। তিনি বলেন, এ নিয়ে কাজ চলছে। যা ক্রমশ প্রকাশ্য হবে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী কাল কলকাতা যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য-সচিব এবং গুণীজনরা তার সফর সঙ্গী হলেও সেই তালিকায় নেই পানিসম্পদ মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে যে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বাগড়ায় ২০১১ সালে খসড়া চূড়ান্ত হয়েও ঝুলে যায় তিস্তা। সেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যকার আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মমতা আমন্ত্রিত হলেও তার উপস্থিতির বিষয়ে এখনো ধূম্রজাল রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীও এ নিয়ে খোলাসা করে কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দেখা হবে।
ডিলিট পাচ্ছেন শেখ হাসিনা: এদিকে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) উপাধি পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ২৬শে মে (শনিবার) সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে এই উপাধি দেয়া হবে। বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা সফর সামনে রেখে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিস্তারিত: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুদিনের সরকারি সফরে শুক্রবার কলকাতা যাচ্ছেন। এই সফরে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এবং আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট অব লিটারেচার (ডিলিট) গ্রহণ করবেন। দুই প্রধানমন্ত্রী শান্তিনিকেতনে নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করবেন এবং সেখানে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফর সঙ্গীদের নিয়ে শুক্রবার সকালে শাহজালাল বিমানবন্দর ছেড়ে সকাল ৯টায় (স্থানীয় সময়) কলকাতায় নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে বীরভূম জেলার বোলপুর শান্তিনিকেতনে যাবেন। বিশ্ব ভারতীর উপাচার্য প্রফেসর সবুজ কলি সেন শান্তিনিকেতনে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এরপর শেখ হাসিনা বিশ্ব ভারতীর সমাবর্তনে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টির আচার্য ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি উপস্থিত থাকবেন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করবেন। এই ভবনে নির্মিত হয়েছে আধুনিক থিয়েটার, প্রদর্শনী কক্ষ, বিশাল লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কিত গ্রন্থ। এছাড়া ভবনের প্রবেশ দ্বারের দুই প্রান্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুর‌্যাল স্থাপন করা হয়েছে। এরপর শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এখান থেকে শেখ হাসিনা কলকাতা ফিরে এসে জোড়াসাকো ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করবেন। সন্ধ্যায় হোটেল তাজ বেঙ্গলে কলকাতা চেম্বার নেতারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। শনিবার প্রধানমন্ত্রী আসানসোলে যাবেন। সেখানে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সমাবর্তনে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের পর মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক প্রদান করবেন। অনুষ্ঠানে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বক্তৃতা করবেন। এরপর তিনি কলকাতায় ফিরে নেতাজী সুবাস বসু জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রী শনিবার রাতে দেশে ফিরবেন।
২৫ কোটি রুপি ব্যয়ে বাংলাদেশ ভবন: ওদিকে শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি রুপি। বাংলাদেশ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ কোটি রুপির সমতুল্য একটি এককালীন স্থায়ী তহবিলও গঠন করা হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত এই তহবিলের অর্জিত লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের ১০ জন শিক্ষার্থীকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য ফেলোশিপ দেয়া হবে। এ বিষয়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ পরবর্তী পরিচালনা কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবে।
হাসিনা-মোদির বৈঠক হতে পারে ৪৫ মিনিট
৪৫ মিনিটের বৈঠক হতে পারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ফাঁকে তাদের মধ্যে এই বৈঠক হবে। বিশ্ব ভারতী সমাবর্তনের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে শুক্রবার সাক্ষাৎ করবেন নরেন্দ্র মোদি। এ সময় তাদের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস, মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার মতো ইস্যু এতে থাকতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইন্যু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঢাকা থেকে বলেছেন, শেখ হাসিনার সফরে প্রধান এজেন্ডা হলো সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। তবে যখন দুই প্রধানমন্ত্রী সমাবর্তনের পাশাপাশি এক টেবিলে বসবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই দু’দেশের মধ্যকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা হবে। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ওই বৈঠক হতে পারে ৪৫ মিনিটের। তবে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে আসার পক্ষে নন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলছেন, এমন চুক্তি করা হলে তার রাজ্য পানি সংকটে ভুগতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল অমল মুখোপাধ্যায় বলেছেন, হাসিনা-মোদির আলোচনার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকবেন কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। তিস্তার পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত পানি বণ্টনের চুক্তিতে আসতে না পারার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া শুভকর নয়। এটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উল্লেখ্য, সিকিম থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে আসা তিস্তা নদীর পানির সমবণ্টন দাবি করছে বাংলাদেশ। ২০১১ সালে অন্তর্বর্তী একটি চুক্তি করা হয়। তাতে ভারতকে এই নদীর পানির শতকরা ৪২.৫ ভাগ ও বাংলাদেশকে ৩৭.৫ ভাগ পনি দেয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ওই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে। বিকল্প হিসেবে তিনি তোরসা নদীর মতো নদীর পানি বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনেই জাতীয় নির্বাচন। তাই এ বিষয়ে একটি চুক্তি শেখ হাসিনার জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর শিবাজি প্রতীম বসুর মতে, বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কট্টরপন্থিরা এরই মধ্যে চাপ সৃষ্টি করছে এবং প্রশ্ন তুলছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছ থেকে কি পেলেন। এখনও গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়িত হয় নি। তিনি আরো বলেন, দেশের কেন্দ্রীয় কাঠামোর দিকে লক্ষ্য রেখে দৃষ্টিভঙ্গি নিতে মমতাকে অনুমোদন দিয়েছেন মোদি। তার ভাষায়, নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়ের কাছে এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। যদি মমতা আরো পানি বণ্টনে সম্মত হন তাহলে তা রাজনীতিতে তার ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মনে রাখতে হবে যে, আগামী বছরেই লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।

শেয়ার করুন