শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ক্যুইবেক আওয়ামী লীগের অমর একুশ উদযাপন

49

সৈয়দ ইউসুফ তাকি, বাংলা কাগজ, মন্ট্রিয়ল: ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আর তাতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুর্ব পাকিস্থানের ছাত্র জনতা। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার। ছাত্রদের দৃঢ়তায় ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে পুলিশ ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়। এতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, সফিউরসহ নাম না জানা অনেকে নিহত হন। এরপর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা আন্দোলন।
একুশের চেতনা ধারণ করেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যার মাধ্যমে অর্জিত প্রিয় লাল-সবুজ পতাকার স্বাধীন বাংলাদেশ। একুশের প্রথম প্রহর থেকেই জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে। একুশের অমর শোকসঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি। আমি কি ভুলিতে পারি…। একুশ মানে মাথা নত না করা’ চিরকালের এ শ্লোগান তাই আজও সমহিমায় ভাস্বর।
মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে বাঙালি জাতি যে ইতিহাস রচনা করেছিল, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্ব তাকে বরণ করেছে সুগভীর শ্রদ্ধায়। জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে একযোগে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য সাধারণ অর্জন।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সেই স্বীকৃতিকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিতে প্রতিবারের ন্যায় এবারো মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পালন করেছে ক্যুইবেক আওয়ামী লীগ।
গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি রবিবার দুপুর ১২টায় পার্ক ভিউ রিসেপশন হলে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শুরুর পূর্বে উপস্থিত আওয়ামী লীগ এর নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা ফুল দিয়ে ভাষা শহিদের প্রতি সম্মান জানান। আলোচনার সভার শুরুতে শহিদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর উপর আলোচনায় বক্তারা ভাষা শহিদদেরকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
বক্তারা দেশের অধিকতর উন্নয়ন এবং বিশ্বে জাতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা, ব্যবহার এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।
বক্তারা বলেন, আমরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছি এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছি। এটি আমাদের জন্য বিরাট গৌরবের বিষয়। তাই এ ভাষার চর্চা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। বিশেষ করে প্রবাসে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশীদের মধ্যে আরো ব্যাপক হারে ভাষার চর্চা বাড়াতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। বাঙালি জাতি আজ মর্যাদা পেয়েছে। এই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। শহীদদের প্রতি আমাদের আজকের অঙ্গীকার, এই অগ্রযাত্রাকে আমরা অব্যাহত রাখবো।
এছাড়া বক্তারা ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, আজন্ম মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্ব এবং পরবর্তী সময় আইন সভার সদস্য হিসেবে এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করে গেছেন এবং বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের দাবির কথা বলে গেছেন।
১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক।’
এছাড়াও ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার দাবি ছিল অন্যতম দাবি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। তাই ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে কোনভাবেই ছোট করে দেখবার মত নয়, বরং অস্বীকার করলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে বিবেচিত হবো।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্যুইবেক শাখার সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী সুইট এর পরিচালনায় ও সভাপতি মুন্সি বশীরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন – মুক্তিযোদ্ধা হাজী মাসুদুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী অনু, মঞ্জরুল ইসলাম চৌধুরী, সাজেদা হোসেন, কাজী রমজান রতন, মতিন মিয়া, এড. রতন মজুমদার, সৈয়দ মেহেদী রাসেল, সেলিম চৌধুরী, সুনীল গোমেজ, ওসমান হায়দার বাচ্চু, নুরুল ইসলাম, সরোজ কুমার দাস, মোঃ নইমুল ইসলাম টিপু, আলী আহমেদ, রনজিত মজুমদার, মোঃ ইদ্রিছ, নিজামুল ইসলাম, পলাশ সরকার, মোঃ গোলাম মুক্তাদির সোহেল, মোঃ উজ্জল চৌধুরী জসিম, জহুরুল আলম, আব্দুল গফুর, ফয়সাল আলম, রোমেন আলম, অনীল গোমেজ, সাহাজাহান ভুইয়া, সৈয়দ নিজাম উদ্দিন।

শেয়ার করুন