বিএনপি-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া গাড়ি ভাঙচুর, আগুন

71

ঢাকা : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাজিরা শেষে গুলশানের বাসায় ফেরার জন্য আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়লে মিছিল করে ফিরছিলেন দলের নেতাকর্মীরা। ছাত্রদল নেতাকর্মীদের একটি দল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গেটে পৌঁছলে হঠাৎ মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে। এ সময় মিছিলকারীরা দৌড়ে সচিবালয়ের সামনে আবদুল গণি সড়কে অবস্থান নিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করতে থাকে। এ সময় বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক ও বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কমিশনার রফিকুল ইসলাম রাসেলসহ ১৫ জনকে আটক করে পুলিশ। হাইকোর্ট ও বকশীবাজার এলাকায় পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৩টার দিকে সচিবালয়ের সামনে দিয়ে বিএনপি কর্মীরা শিক্ষা ভবনের দিকের রাস্তায় আসার পথে হঠাৎ পুলিশ তাদের ধাওয়া করে।
এর ফলে ছাত্রদলের কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে একদল বঙ্গবাজারের দিকে ও অপরদল উল্টো ঘুরে জিরো পয়েন্টের দিকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার পথে তারা ‘ভাঙ গাড়ি’ বলে চিৎকার করতে করতে পথ চলতি ও রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় একটি মোটর সাইকেলও পুড়িয়ে দেয়। ভাঙচুর চলে জিরো পয়েন্ট এলাকা পর্যন্ত। পরে পুলিশের ধাওয়ার মুখে ছাত্রদল কর্মীরা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পুলিশের উপকমিশনার মারুফ হোসেন জানান, খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার বকশিবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে সচিবালয়ের সামনে বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বঙ্গবাজারের সামনে পার্ক করা একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন কর্মকর্তার তথ্য মতে, ছাত্রদল কর্মীরা সেখানে ১৩টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুর রহমান রয়েল বলেন, ম্যাডামের হাজিরা শেষে আদালত থেকে বেরিয়ে বেলা তিনটার সময়ে আমরা স্লোগান দিয়ে আসছিলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে পুলিশ আমাদের উপরে হামলা চালায়। রয়েল জানান, পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেটে সংগঠনের সহসাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলমসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আর হাইকোর্ট এলাকার শিক্ষাভবন, কদম ফোয়ারা ও বঙ্গবাজার এলাকা থেকে অন্তত ১৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ডিএমপি দক্ষিণ ট্রাফিক পুলিশের শাহবাগ জোনের ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. মেহেদী হাসান জানান, আগুনে পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেলটি তার। ঘটনার সময় তিনি বঙ্গবাজার মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি আরো জানান, আমরা তিনজন বঙ্গবাজার মোড়ে ডিউটি করছিলাম। হঠাৎ হাইকোর্ট মোড় থেকে ধেয়ে এসে একদল লোক আমাদের ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এ ঘটনায় অন্য দুই অফিসার তাদের মোটরসাইকেল সরাতে পারলেও আমি পারিনি।
সহিংস ঘটনা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে দেশবাসীকে: বিএনপি
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার সৃষ্ট নিত্যকার সহিংস ঘটনা দেশবাসীকে ভিন্নবার্তা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। রিজভী বলেন, ভোটারবিহীন আওয়ামী সরকারের স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আদালতে হাজিরা দিতে গেলে বিএনপি চেয়াপারসনকে রাস্তায় অভ্যর্থনা জানাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আগ্রাসী আচারণে আগাম উপলব্ধি করা যায়, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন কত বীভৎস্য রূপ ধারণ করবে। আওয়ামী মন্ত্রীরা যতই তত্ত্ব কথা শোনাক আওয়ামী সরকার সৃষ্ট নিত্যকার সহিংস ঘটনা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে দেশবাসীকে। এই সরকার গণতন্ত্র, নির্বাচন ও আইনের শাসনের সঙ্গে প্রতারণাকারী একটি সরকার। বর্তমান সরকার একদলীয় দুঃশাসনের যাঁতাকলে জনগণকে পিষ্ঠ করে যাবে। যার একটি নিষ্ঠুর প্রতিফলন দেখা গেল বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতে হাজিরা দিতে গেলে পথে অভ্যর্থনা দিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশের নিষ্ঠুর হিংস্র আচরণে। শাসক দল আওয়ামী লীগ এখন সন্ত্রাসের ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। নানামুখী সন্ত্রাসের অভিনব কায়দা আবিষ্কার করে ভোটারবিহীন সরকার তা জনগণের ওপর প্রয়োগ করছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে অভ্যর্থনার জন্য অপেক্ষারত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীদের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালায়। বেধড়ক লাঠিচার্চ ও বৃষ্টির মতো রাবার বুলেট ছুড়তে থাকে পুলিশ। সেখান থেকে বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হককে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। সেখানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রাসেল, টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান উজ্জ্বলসহ অন্তত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাইকোর্টের সামনে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের ওপর দাঙ্গা পুলিশ, ডিবি পুলিশ আকস্মিক হামলায় আহত হয় টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ সামছুল আলম তোফা। অন্যদিকে বকশীবাজার অস্থায়ী আদালত প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে লাঠিচার্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিনসহ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের অসংখ্য নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। রিজভী বলেন, দুর্ভাগ্যের বিষয়- বর্তমান নিপীড়ক সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনী আজ বকশীবাজার আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ওপরও চড়াও হয়। আদালতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দৈনিক দিনকাল পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক রাশেদুল হক এবং সিনিয়র নারী সাংবাদিক ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত সদস্য মাহমুদা ডলি, রিপোর্টার বাবুল খন্দকারসহ পাঁচজন সাংবাদিককে আটক করে পুলিশ। সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র দেখানোর পরেও পুলিশ তাদের টানাহিঁচড়া করে ভ্যানগাড়িতে তোলে ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। যদিও পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। তিনি গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।
সাংবাদিক লাঞ্ছিতের ঘটনায় ডিআরইউর নিন্দা
এদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মঙ্গলবার হাইকোর্টের সামনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কার্যনির্বাহী কমিটির নবনির্বাচিত সদস্য মাহমুদা ডলি ও সংগঠনের স্থায়ী সদস্য রাশেদুল হকসহ ৪ জন সাংবাদিক পুলিশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরার রিপোর্ট সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন অবস্থায় টেনেহিঁচড়ে পুলিশের ভ্যানে তোলে। সেখানে অবস্থানরত অন্যান্য সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ডিআরইউর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এক যৌথবিবৃতিতে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিপন্থি। কতিপয় পুলিশ সদস্যর এধরনের আচরণের কারণে সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব আরও বাড়বে। ডিআরইউ নেতৃবৃন্দ অনতিবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এই ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।

শেয়ার করুন