খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা

87

অনলাইন ডেস্ক: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরনো ঢাকার বকশিবাজারে স্থাপিত বিশেষ অস্থায়ী আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান আলোচিত এ মামলায় ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণা করেন। এর আগে কড়া নিরাপত্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রহরায় দুপুরের পর আদালতে পৌঁছান খালেদা জিয়া। তার আসার পথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
গত ২৬শে জানুয়ারি এই মামলার বিচারিক কার্যক্রমের শেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজ দিন ধার্য করেছিলেন আদালতের বিচারক। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে বিদেশ থেকে আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে রাজধানীর রমনা থানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই মামলা দায়ের করে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। তারেক রহমানকে পলাতক দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৬শে জানুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। আর কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ কারাগারে থাকায় তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এছাড়া কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ মামলায় সাড়ে ৯ বছর আইনি লড়াই করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপর থেকেই আইনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের মার্চে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় অভিযোগ গঠনের পর থেকেই মামলার বিচারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল নিয়মিতই।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত বছরের ১৯শে ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে ওই দিনই তা শেষ করেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। ওই দিন তিনি যুক্তিতর্কের শুনানিতে তিনি বলেন, এই মামলার ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও নথিপত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রসিকিউশন খালেদাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। তাই, এ মামলার বিচারে খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ সাজার (যাবজ্জীবন কারাদ-) আর্জি জানান তিনি। এরপর ২০শে ডিসেম্বর থেকে শুরু করে গত ১৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৪ কার্যদিবসে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। খালেদার পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, মওদুদ আহমদ ও এ জে মোহাম্মদ আলী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। খালেদার আইনজীবীরা আদালতকে জানান, জাল জালিয়াতি করে এই মামলার নথিপত্র তৈরি করা হয়েছে। প্রসিকিউশন যে সব অভিযোগ এনেছে তা সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুলক মামলা আখ্যায়িত করে খালেদার আইনজীবীরা আদালতের কাছে খালেদার খালাসের আর্জি জানান। এরপর কারাগারে থাকা দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাদের আইনজীবী মো. আহসান উল্লাহ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক উত্তাপ গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। এই মামলার বিচারকাজ হয়েছে বকশিবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে। এই আদালতে গত কয়েক বছরে মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে প্রতিনিয়তই হয়েছে বাক বিতন্ডা আর হট্টগোল। যা ছিল মামলার শেষ দিনের শুনানি পর্যন্ত। আদালতের এই পরিস্থিতি সামলাতে কখনো কখনো আদালতের বিচারক ও পুলিশকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে (যুক্তিতর্কের শুনানি) তখনও এ বাক বিতন্ডা ও তর্ক বিতর্ক পৌছে চরমে। এমনকি দুইপক্ষের আইনজীবীদের হট্টগোলের কারণে আদালতের বিচারকের এজলাস ত্যাগ করার ঘটনাও ঘটে।
মোট ২৩৬ কার্যদিবস শুনানির পর এ মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে। এই মামলার অভিযোগপত্রে থাকা ৩৬ সাক্ষীর মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-সহকারি পরিচালক হারুনুর রশিদসহ মোট ৩২ জন সাক্ষী আদালতে খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। ২০১৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। গত বছরের ১২ই জানুয়ারি সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও পুন:জেরা সম্পন্ন হয়। এর পর খালেদা জিয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী তার বক্তব্য পেশ করেন। ২০১৭ সালের ১৯শে অক্টোবর বক্তব্য শুরু করেন তিনি। গত বছরের ৫ই ডিসেম্বর তার বক্তব্য শেষ করেন খালেদা জিয়া।
২০১৪ সালের ১৯শে মার্চ এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক চার্জ (অভিযোগ) গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। তবে, অভিযোগ গঠনের আগে ও পরে মামলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতে যান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। উচ্চ আদালতের আদেশে দুইবার এ মামলার বিচারক বদল হয়। এ মামলায় প্রথমে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়। পরে খালেদা এই বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত তাতে সাড়া দেন। এরপর এ মামলায় বিচারিক দায়িত্ব পান ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার। একপর্যায়ে তার প্রতিও অনাস্থা জানিয়ে খালেদা জিয়া আবারো উচ্চ আদালতের দারস্থ হন। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে আবু আহমেদ জমাদারের পরিবর্তে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আকতারুজ্জামান এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পান।

শেয়ার করুন