বন্যার পরিধি বাড়ছে, ত্রাণের জন্য হাহাকার

93

ডেস্ক রিপোর্ট: পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির ফলে বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা। অব্যাহতভাবে পানি বাড়ায় একের পর এক বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বাড়িঘর ও সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে বানভাসি মানুষ। একই সঙ্গে বানের পানিতে ভেসে ও ডুবে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। বৃষ্টিপাত তুলনামূলক একটু কম হলেও উত্তরাঞ্চল থেকে পানি ভাটিতে গড়ানোয় মধ্যাঞ্চলের নদ নদীর পানি বাড়ছে। গত কয়েক দিনে ঢাকার আশপাশের নদীর পানিও বাড়ছে। তবে এখনও তা বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে পানি বাড়া অব্যাহত থাকলে রাজধানীর নিম্নাঞ্চলেও বানের পানি প্রবেশ করবে। গত তিন দিনে বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে মৃত্যের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ জনে। এর মধ্যে রোববার বন্যায় মারা যায় ২৬ জন। সোমবার মারা যায় ৩২ জন। আর গতকাল মারা গেছে ৮জন।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বিশেষ বন্যা সতর্কীকরণ বুলেটিনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের যমুনা নদীতে বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জ ও আরিচা অংশে বৃহস্পতিবার নাগাদ পানি স্থির হয়ে পরবর্তীতে  হ্রাস পেতে শুরু করবে। মেঘনা অববাহিকায় আজকের মধ্যে উন্নতি ঘটবে। এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি আগামীকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলেও তা বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হবে। এই অববাহিকার উজানে নেপালে ও বিহারে বন্যা পরিস্থিতি থাকায় বৃহস্পতিবারের পরও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

বন্যা পূর্বাভাস রিপোর্টের নদ-নদীর অবস্থায় বলা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণাধীন পানির ৯০টি সমতল স্টেশনের মধ্যে ৫৬টি স্টেশনে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩০টি স্টেশনে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে মেঘনা অববাহিকার ভারতীয় অংশে পানি হ্রাস পেতে শুরু করায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেঘনা অববাহিকার অধিকাংশ নদীর পানি হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার বন্যা পরিস্থিতি অবনতিশীল রয়েছে। তবে শিগগিরই উন্নতি হবে। তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার অববাহিকার নদীর পানি হ্রাস পাচ্ছে। মেঘনা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বৃহস্পতিবারের মধ্যে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বাংলাদেশ অংশের উজানে (নুনখাওয়া, চিলমারী) আজ বুধবার পর্যন্ত সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে কাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে হ্রাস পেতে শুরু করবে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মঙ্গলবার বন্যায় কুড়িগ্রামে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তিরা হলেন- কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার মুজিবুর রহমান (১৫), উলিপুর উপজেলার আজাহার আলী (৭০), নাগেশ্বরী উপজেলার আব্দুল করিম ওরফে মনসুর (১৪) ও ফুল বানু (৩১)। এ নিয়ে কুড়িগ্রামে মৃতের সংখ্যা ৯ জনে দাঁড়ালো। জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়ে ৮২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ৩ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব এলাকার বানভাসিরা চারদিন ধরে সড়কের উপরে খোলা আকাশের নিচে ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি ও লেট্রিন সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে হুমকির মুখে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের পাউবো বাঁধ। যে কোনো মুহূর্তে এই বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাঁধের বিভিন্ন এলাকায় ইদুরের গর্তের (র‌্যাট হোল) কারণে পুরো বাঁধটি বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ওই এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার তিন জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম। নিখোঁজ রয়েছে আরো এক শিশু। এ নিয়ে দিনাজপুরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৭ জনে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার কমপক্ষে ৬ লাখ মানুষ। জেলার সঙ্গে গত ৪ দিন ধরে বিভিন্ন স্থানের সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিছিন্ন রয়েছে। বন্যা দুর্গত মানুষকে উদ্ধারসহ বিপুল পরিমাণ গবাদি পশু ও গৃহস্থালি সামগ্রী উদ্ধার করেছে সেনা বাহিনী। স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের ৫২ জন সদস্য বন্যা দুর্গত মানুষের সাহায্যে কাজ করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ২ লাখ টাকা এবং ৮০ টন চাল বন্যাদুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও বন্যার্তদের জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং ৩০০ টন চাল বরাদ্দ চেয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুরের শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় উপজেলা শহর সৈয়দপুরের নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভাঙ্গন রোধে মঙ্গলবারও বিরামহীন ভাবে কাজ করেছেন। পানির চাপে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও। এদিকে জেলা সদরের বিভিন্ন ইউনিয়নে স্কুল-কলেজ ও উঁচুস্থানে আশ্রয় নেয়া বানভাসিদের মাঝে সরকারি ভাবে চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ করার পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাদ্য বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় গত দু-দিনে তিস্তার ভাঙনে উপজেলার প্রায় ৩ শতাধিক বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। তিনদিন পর সরকারি ভাবে ৪০ টন চাল ও ৩ হাজার প্যাকেট চিড়ামুড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে তিস্তার পানি কমায় কিছু কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

জয়পুরহাটের নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার পাঁচবিবি, ক্ষেতলাল, আক্কেলপুর ও সদর উপজেলার কমপক্ষে ১০টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধান ও শাক-সবজি। ভেসে গেছে ৫ শতাধিক পুকুরের প্রায় ১০কোটি টাকার মাছ। এদিকে পানি উঠেছে জয়পুরহাট-বগুড়া সড়কের বানিয়াপাড়া, বটতলি এলাকায়। তলিয়ে গেছে জামালগঞ্জ-ক্ষেতলাল সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কয়েক গ্রামের সাথে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মারজান হোসেন জানান- গত চারদিন ধরে সবক’টি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে তবে এখনো বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। অন্যদিকে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়লেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়নি।

গাইবান্ধায় করতোয়া নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩টি পয়েন্ট ধসে গিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অপরদিকে গাইবান্ধার বড় তিন নদীর অন্তত ১৯ পয়েন্ট এখনও ঝুঁকির মুখে। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রায় ৩ হাজার বানভাসি মানুষ ওয়াবদা বাঁধসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টায় বাদিনারপাড়া ভরতখালী এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের নিচ দিয়ে পানি চুয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধটি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি ২০.২০ সেমি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিপদ সীমার ৩৮ সেমি. অতিক্রম করেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে তিনদিন আগে নিখোঁজ হওয়া রিয়াদ (২০) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর লাশ ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীতে পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার লাশ উদ্ধার করেন। এ ছাড়া, এখনো নিখোঁজ রয়েছে সত্যপীর ব্রিজ এলাকার রবিউল ইসলামের ছেলে আহসান হাবিব, মুক্তার আলীর ছেলে সোহাগসহ ৩ শিশু। অন্যদিকে বিভিন্ন নদ নদীর পানি কমে যাওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে কিছু মানুষ বাড়ি ফিরলেও নিচু এলাকায় এখনও পানি থাকায় আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ অবস্থান করছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রে আসা দুর্গত মানুষরা। এ ছাড়াও বিশুদ্ধ পানি ও পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা। বন্যায় মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পঞ্চগড় ঠাকুরগাঁওয়ের নব নির্মিত ব্রডগেজ রেলপথ। রেল লাইনের উপর দিয়ে প্রবল স্রোতের কারণে পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও রেল-লাইনের নয়নিবুরুজ স্টেশন থেকে কিসমত স্টেশন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় স্লিপারের মাঝের পাথর ও মাটি সরে গেছে।

নওগাঁর বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রাণীনগরে আরো ৬টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ছোট যমুনা নদীর পানি বিদপসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ও আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ২০৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নওগাঁ শহরের রাস্তা-ঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ডিসি ও এসপির বাসায় ৩ ফিট পানি উঠে গিয়েছে। অন্যদিকে, আত্রাই উপজেলার ও নাটোর জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে নওগাঁর ৬টি উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক বিঘার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে এবং কয়েক হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে প্রায় ২ লক্ষাধিক লোক পানি বন্দি হয়ে গেছে। জেলার ছয়টি নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিপদসীমার ৬০ সেন্টেমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

শেয়ার করুন