বাণিজ্যমেলায় বিদেশি পণ্যের নামে প্রতারণা

37

ঢাকা : স্টলের নাম ‘দুবাই কালেকশন’। পণ্যের গায়ে লেখা ‘নিউ নবরূপা টেক্সটাইল’। বিশাল বড় প্যাভিলিয়নে প্রতিদিন দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন মজাদার বিজ্ঞাপন। একটা কিনলে দুইটা ফ্রি। আর দুইটা কিনলে রয়েছে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট। বিদেশি পণ্যের স্টল হলেও সেখানে রয়েছে সব দেশি পণ্য।
আর এ স্টলে যেসব গার্মেন্টস পণ্য রয়েছে সেগুলোও নিম্নমানের। দর্শক ক্রেতারা যারা প্রবেশ করছেন তারা দুবাইয়ের কোনো পণ্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। বিক্রেতারা বলছেন স্টলের নাম দুবাই কালেকশন দেয়ার কারণ হচ্ছে আমরা দুবাইয়ে যেসব পণ্য রপ্তানি করি সেগুলোই এখানে এনেছি। ক্রেতারা এমন নাম দেখে প্রতারিত হয় কিনা জিজ্ঞেস করলে বিক্রেতা মনসুর বলেন, পণ্যের গায়ে উৎপাদিত কোম্পানির নাম দেয়া আছে। তারা তা দেখে কিনেন। এরকম আরেকটি স্টল মিয়াকো ক্রোকারিজ কালেকশন। তাদের ওখানে এলুমিনিয়াম ও স্টিলের বিভিন্ন তৈরি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। তবে মিয়াকো নামে তাদের স্টল থাকলেও বেশির ভাগ পণ্যের গায়ে মিয়াকোর কোনো ট্যাগ নেই। তারা বাংলাদেশি এবং চায়নার বিভিন্ন কম দামি জিনিসপত্র মিয়াকো ব্র্যান্ড নামে চালিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরঞ্জিত সব ধরনের বিজ্ঞাপন। একটি কিনলে ১০টি পণ্য ফ্রি। এ প্যাকেজটির এমআরপি মূল্য দেয়া রয়েছে ১২ হাজার টাকা। বিক্রয়কর্মীরা বলছেন এ প্যাকেজটি ক্রয় করলেই সঙ্গে পাবেন ২৪ হাজার টাকার একটি মাইক্রোওভেন। তবে তাদের মাইক্রোওভেনে দেখা গেছে হাতে লেখা ট্যাগ লাগানো। বাজারে এর মূল্যমান দেখে মনে হচ্ছে খুবই কম হবে। ক্রেতা সেজে তাদের বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ও কোন দেশি তা জানতে চাইলে তারা বলেন- আপনি কিনলে কিনবেন নইলে চলে যাবেন । সবকিছুতে দাম দেয়া নাই। না কিনলে সময় নষ্ট করার সময় নেই।
প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও বাণিজ্যমেলায় বসছে বিদেশি পণ্যের একাধিক স্টল। এগুলোর নাম দেয়া হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের নামে। কয়েকটি স্টলের নাম রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশের পরিচিত শহরের। বাকিগুলো কিছু ব্র্যান্ডের নামে। যেমন প্রোডাকশন অব ইন্ডিয়া, পাকিস্তানি, থাই অ্যান্ড চায়না গ্যালারি, মালয়েশিয়ান সামগ্রী, ইরানি পণ্যের সমাহার, দুবাই এবং দিল্লি কালেকশন। এ স্টলগুলোয় হরেকরকম পণ্যের কালেকশনের কথা বলা হচ্ছে। আদতে এসব স্টলগুলোয় রয়েছে দেশি ও চাইনিজ পণ্যের মিশ্রণ। বিজ্ঞাপণের ভিড়ে সাধারণ ক্রেতা যাচাই করে দেখার সময় পাচ্ছে না।
বিদেশি পণ্যে এমন প্রতারণা সম্পর্কে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদাউসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বাণিজ্যমেলা সার্বক্ষণিক তদারকি করছি। এবং ক্রেতারা আমাদের কেন্দ্রে অভিযোগ দিলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করছি। মেলায় স্টলগুলোকে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা যারা অমান্য করে তাদের দ্রুত জরিমানার আওতায় নেয়া হচ্ছে। তবে এর বাইরে অনেকে বিভিন্নরকম অসাধু পন্থা অবলম্বন করছেন। যদি কোনো স্টল পণ্যের দাম উল্লেখ না করে এবং ভুয়া বিজ্ঞাপন দেয় সেগুলোকে আমরা নিজেরাই জরিমানার আওতায় নিয়ে আসছি। এজন্য সাধারণ ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের সচেতন থাকতে হবে। তারা যদি কেনাকাটার আগে পণ্যের মূল্য যাচাই করে না নেন তাহলে যে কেউ অসাধু পন্থা অবলম্বন করতে পারবে না। এ সহকারী পরিচালক আরো বলেন, মেলা কর্তৃপক্ষ খাবার পণ্য ছাড়া অন্যসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই এসব পণ্য ক্রয়ের আগে ক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। এখানে অনিয়মটা খুব সহজে ধরাও যায় না।
বিজ্ঞাপনের কমতি নেই বিদেশি পণ্যের খাবার দ্রব্যের স্টলগুলোয়। ইরানি সমাহার নামে স্টলে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের মসলা ও আচার। এগুলোর গায়ে আমদানিকৃত কোনো ট্যাগ লাগানো নেই। লোকাল পণ্য কিনে তারা নিজেরাই প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছেন। ইরানি পণ্যের কথা বলা হলেও এমন কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি। এরপরেও তারা এগুলো ইরানি পণ্য নামেই চালিয়ে দিচ্ছেন।
চটকদার বিজ্ঞাপন আর বাহারি সাঁজে ক্রেতাদের টানার চেষ্টা করছেন বিদেশি পণ্যের স্টলগুলো। বিদেশি পণ্যের কথা বলা হলেও সব স্টলেই রয়েছে কিছু না কিছু দেশি পণ্য। মেলায় আগত ক্রেতারা বিদেশি পণ্য কিনতে যেয়ে প্রতিদিনই প্রতারিত হচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন না কোন্‌টা দেশি পণ্য আর কোন্‌টি বিদেশি পণ্য। কারণ স্টলগুলো বিভিন্ন দেশের নামে হলেও বিক্রি হচ্ছে শুধুমাত্র চাইনিজ কিংবা দেশি পণ্য। ক্রেতাদের ধারণা এসব স্টল মালিকরা বিক্রি বাড়াতে এমন উপায় অবলম্বন করছে।

শেয়ার করুন