মন্ত্রির ঘোষণা প্রত্যাখ্যান অনশনে অনড় শিক্ষকরা

35

ঢাকা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে আমরণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি পূরণে সুস্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যেতে চান তারা। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রীর মুখে দাবি পূরণের আশ্বাস তারা শুনেছেন। এতে তারা সন্তুষ্ট নন। আমরণ অনশনে থাকা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনশন ভাঙাতে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। সেখানে বক্তব্য রাখার সময়ই এমপিও দেয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ দাবি করেন শিক্ষকরা।
এ নিয়ে শিক্ষকদের স্লোগান ও হট্টগোলের মধ্যে প্রেস ক্লাব এলাকা ছেড়ে যান মন্ত্রী। সকল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে গতকাল সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায় শতাধিক শিক্ষককে অনশন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। বেলা ১১টার দিকে অনশনরত শিক্ষকদের কাছে আসেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। টানা পাঁচদিন অবস্থান কর্মসূচির পর গত রোববার থেকে আমরণ অনশনের তৃতীয় দিনে এই প্রথম সরকারের তরফে শিক্ষকদের দাবির পক্ষে আশ্বাস নিয়ে আসেন শিক্ষামন্ত্রী। এসময় অনশনরত শিক্ষকদের দাবি পূরণ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপনাদের দাবি পূরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য নীতিমালা করা হচ্ছে। গতরাতে অর্থমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। নিয়মানুযায়ী তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে অনশনরতদের আশ্বাস দেন তিনি। শিক্ষকদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকরা নতুন প্রজন্ম তৈরির নেয়ামক শক্তি। আপনাদের দাবি পূরণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে দাবি জানিয়ে আসছি। আমার এর চেয়ে বেশি করার কিছু নেই। আমি কেবল আপনাদের পক্ষের একজন কর্মী।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর এমপিওভুক্তির এ আশ্বাসকে গতানুগতিক ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ইতিপূর্বে এমন আশ্বাস অনেকবার দিয়েছেন। আমাদের দাবি পূরণে শিক্ষামন্ত্রীর এ আশ্বাস সন্তোষজনক নয়। তাই শিক্ষামন্ত্রীর এ আশ্বাসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে আমরণ অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করছি। সংগঠনের এ নেতার ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানিয়ে অনশনরত শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর তালবাহানা মানি না, মানবো না। দাবি আমাদের একটাই- প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে ঘোষণা চাই।
সংগঠনের সিনিয়র সহকারী সভাপতি সফিকুল ইসলাম ও সংগঠনের সঞ্চালক রাশিদুল ইসলাম জানান, এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে এ পর্যন্ত তিনবার বসে ২০ বার আশ্বাস পেয়েছি। এ আশ্বাসে আমাদের কারো বিশ্বাস নাই। চলতি বাজেটে সকল প্রতিষ্ঠান এমপিও ঘোষণা দিতে হবে। তা না হলে আমরণ অনশনের পর একে একে সবাই আত্মাহুতি দেয়ার হুমকি দেন তারা।
শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে নিরাশ হয়ে বগুড়ার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমরা তিনদিন ধরে অভুক্ত রয়েছি। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে বাড়ি গেলেও অভুক্ত থাকতে হবে। এই শিক্ষিকা বলেন, ১৯ বছর যাবৎ কষ্ট করে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছি। আজকে প্রধানমন্ত্রী অভুক্তদের না দেখলে মরে যাবো। তবুও অনশন ছাড়বো না।
কর্মসূচির এতদিন পর শিক্ষামন্ত্রীর এমন আশ্বাসে খুব কষ্টের কথা জানিয়ে জয়পুরহাট আমবাড়ী কালিগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা উম্মে শাহিনা বলেন, কষ্টে ছিলাম। এ মিথ্যা আশ্বাসে আরো কষ্ট বেড়ে গেছে। আমরা সমাজে অবহেলিত। এ অবস্থায় এখানে মরে যাবো তবুও বাড়ি ফিরে যাবো না।
গত মাসের ২৬ তারিখ থেকে পাঁচদিন অবস্থান কর্মসূচির পর ক্লান্ত দেহে গত রোববার থেকে আমরণ অনশন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৯ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলেও অধিকাংশ অনশনে অংশগ্রহণকারীদের হাতে স্যালাইন নেয়া অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন পঞ্চগড়ের ময়নুল, ময়মনসিংহের তোফাজ্জল ও ভোলার নুর মোহাম্মদ। তারা বলেন, শিক্ষক হয়ে সমাজে অবহেলিত জীবনযাপনের চেয়ে রাজধানীর ফুটপাথে মরে যাওয়া ভালো। তবুও দাবি আদায় ছাড়া বাড়ি ফিরবো না। এখন প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস ছাড়া কারো আশ্বাসে বিশ্বাস নেই বলে জানান তারা। বেলা ১২টার সময় অনশনরত সংগঠনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি ৭০২ নং ওয়ার্ডের ৫০ নং বেডে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া ৭০২ নং ওয়ার্ডের ৫১ নং বেডে খুলনার বাহরুল ইসলাম, ৪০ নং বেডে নওগাঁর চকরঘুনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. বাবুল হোসেন মণ্ডল, বগুড়ার ধুপকাঠীর শিক্ষক সেকেন্দার আলী, মাগুরা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের ইকরামুল ইসলাম ও কুষ্টিয়ার সিরাজউদ্দৌলা কলেজের আশরাফুল আলম লাভলুও রয়েছেন। এদিকে আমরণ অনশনের তৃতীয় দিনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য কাজী ফারুক আহমেদ, বি.টি.এ’র সভাপতি সৈয়দ মোফাজ্জেল, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক আবু সাঈদ (কমিউনিটি মেডিসিন), বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা অনুপম বড়ুয়া, বাংলাদেশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড আজিজুর রহমান ও অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, মেজর (অব.) মো. মামুনুর রশীদ, জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. মহসিন রেজা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক হাফেজ মো. হেমায়েত উদ্দীন, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজের ডা. তুনাজ্জিনা শাহরিন, বি.এস.এম.ইউ’র ডা. মো. আ. খালেক, বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন প্রমুখ।

শেয়ার করুন