মন্ত্রিসভায় তিন নতুন মুখ, পূর্ণ মন্ত্রী হলেন নারায়ণ চন্দ্র

44

ঢাকা : সরকারের শেষ মেয়াদে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলেন তিন নতুন মুখ। তাদের মধ্যে দু’জন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিন মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পড়ান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়া নতুন তিনজন হলেন, তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার, লক্ষ্মীপুরের এমপি একেএম শাহজাহান কামাল ও রাজবাড়ির এমপি কাজী কেরামত আলী।
মোস্তফা জব্বারকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হয়েছে। শপথ নিলেও গতকাল পর্যন্ত মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন হয়নি। শপথ অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং নতুন মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শপথ নিতে গতকাল বিকেলে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল, রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী ও তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার। বঙ্গভবনে প্রবেশের সময় একেএম শাহজাহান কামালের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও কন্যা, কাজী কেরামত আলীর সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী, মেয়ে, বোন ও শ্যালিকা এবং মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে, ভাই ও ভাইয়ের ছেলে। তবে বঙ্গভবনে প্রবেশের সময় নারায়ণ চন্দ্র চন্দের সঙ্গে কেউ ছিলেন না। এর আগে মন্ত্রিসভার নতুন এই সদস্যদের বঙ্গভবনে নিয়ে যেতে বিকেলে সচিবালয় থেকে পাঠানো হয় তিনটি গাড়ি। শপথের জন্য সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার মধ্যে তারা সবাই বঙ্গভবনে পৌঁছে যান। শপথ পড়াতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার একটু আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে দরবার হলে উপস্থিত হন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তিন মন্ত্রীর শপথ পড়ান প্রেসিডেন্ট। পরে প্রতিমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠিত হয়। শপথ নেয়ার পর তিন মন্ত্রী টেবিলে বসে শপথবাক্যে স্বাক্ষর করেন। প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়ে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। শপথ নেয়ার পর নতুন তিন মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত এ সময় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে কদমবুসি করেন। এদিকে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া বিজয় বাংলা কিবোর্ডের উদ্ভাবক মোস্তাফা জব্বার সংসদ সদস্য নন। তাই তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হয়েছে। মোস্তাফা জব্বার বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতের পরিচিত উদ্যোক্তা। আনন্দ প্রিন্টার্স এবং আনন্দ মুদ্রায়নের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ৬৮ বছর বয়সী জব্বার ২০০৭ সালের ২৬শে মার্চ ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। পরের বছর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যুক্ত করা হয়। মোস্তাফা জব্বার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি।
৭২ বছর বয়সী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ খুলনা-৫ আসন থেকে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করলে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
মন্ত্রিসভার আরেক নতুন মুখ শাহজাহান কামাল লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য। ৭২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তার ভাই অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি।
৬৩ বছর বয়সী কাজী কেরামত আলী গত নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এই চারজনকে নিয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৫৪। তাদের মধ্যে ৩৩ জন মন্ত্রী, ১৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং দু’জন উপমন্ত্রী। এছাড়া মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্বে আছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে আছেন আরো পাঁচজন। এর আগে ২০১৪ সালের ১২ই জানুয়ারি ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে দ্বিতীয় মেয়াদের যাত্রা শুরু করে মহাজোট সরকার। এদের মধ্যে ছিলেন ২৯ জন মন্ত্রী, ১৭ জন প্রতিমন্ত্রী ও দু’জন উপমন্ত্রী। এর দেড় মাসের মাথায় এএইচ মাহমুদ আলী মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আর হজ নিয়ে মন্তব্যের জন্য অক্টোবরে মন্ত্রিত্ব খোয়ান লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৫ সালের ৯ই জুলাই আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরের সপ্তাহেই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল ইসলাম বিএসসিকে মন্ত্রী করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এবং তারানা হালিমকে টিএন্ডটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও নুরুজ্জামান আহমেদকে খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। ওইদিন মন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি পান আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ইয়াফেস ওসমান। এর দু’দিন পর ২০১৫ সালের ১৬ই জুলাই সৈয়দ আশরাফকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২০১৬ সালের ১১ই মে। এরপর ২০১৬ সালের ১৯শে জুন খাদ্য থেকে প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। গত বছরের শেষ দিকে এসে ১৬ই ডিসেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের মৃত্যু হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর শূন্য পদেই নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।
কে কোন মন্ত্রণালয় পাচ্ছেন: শপথ নেয়া চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামালকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। এদিকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নতুন শপথ নেয়া রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল রাত সোয়া ৮টার দিকে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নিজেই এ কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। তার দেয়া এ দায়িত্ব পালনে শতভাগ চেষ্টা চালিয়ে যাবো। নতুন শপথ নেয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কে কোন দপ্তর পাচ্ছেন- এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, বুধবার (আজ) নতুন চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর বণ্টন করা হবে।

শেয়ার করুন