এই পথ চলা

32

শুজা রশীদ
আমেরিকা : পূর্ব থেকে পশ্চিমে – শেষ পর্ব
ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের নিকটবর্তী পাহাড়ী শহর ওয়েস্ট ইয়েলোস্টোনে এক রাত থেকে পর দিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম। আমার পরবর্তী গন্তব্য স্পোকেন, যেখানে আমার চাকরী। সুতরাং আপাতত আমার যাত্রা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সিয়াটল হচ্ছে একেবারে পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে অবস্থিত ওয়াশিংটন স্টেটের সবচেয়ে বড় শহর। স্পোকেন থেকে সেটা প্রায় তিন শ’ মাইল দূরে। সুতরাং সিয়াটল না যাওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না যে আমি আমেরিকার পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত গেছি। ইচ্ছা আছে পরবর্তীতে সময় পেলেই গিয়ে ঘুরে আসব। সৌভাগ্যের ব্যাপার, সেখানে আমাকে একলা যেতে হয়নি। ততদিনে আমার নিঃসঙ্গতার পরিসমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু সেই কাহিনী পরে কখন।
ইয়েলোস্টোন পার্কে আরো অনেক কিছু করবার এবং দেখবার থাকলেও আমার হাতে সময় খুব একটা নেই। এখান থেকে স্পোকেন প্রায় সাড়ে চার শ’ মাইল। দুপুরের দিকে রওনা দিলে সন্ধ্যার আগে পৌঁছে যাওয়া যাবে। সুতরাং হাতে কয়েক ঘণ্টা সময় আছে। এই এলাকা থেকে চলে যাবার আগে আরেকটা স্থানে ঘুরে যাবার ইচ্ছা আমার।
মন টানার প্রথম স্টেট পার্ক হচ্ছে লুইস ক্লার্ক ক্যাভার্নস স্টেট পার্ক। আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমের সবচেয়ে বিশাল লাইমস্টোন গুহাগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে লুইস এন্ড ক্লার্ক ক্যাভার্ন। ইন্টারস্টেট ৯০-তে উঠবার জন্য আমাকে বেশ খানিকটা উত্তরে যেতে হবে। পথেই পড়বে ক্যাভার্নটা। সুতরাং সময় নষ্ট হবে না।
সেখানে যখন পৌঁছালাম তখন প্রায় সকাল দশটা। পার্কে ঢোকার পর সাড়ে তিন মাইলের মত যেতে হয় গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। প্রতি আধা ঘণ্টায় একটা করে ট্যুর যায়। ২ মাইল পথের ট্রেইল, ঘণ্টা দুয়েক লাগে ঘুরে আসতে। যাদের এই ধরনের গুহায় যাবার অভিজ্ঞতা নেই, তাদের অবশ্যই সুযোগ হলে একবার যাওয়া উচিত। ভেতরে নানা ধরনের এবং নানা রঙের পাথরের যে সমারোহ তা শিল্পীর কল্পনাকেও হার মানায়। ছবিতে দেখা আর বাস্তবে দেখায় অনেক ফারাক। সব মিলিয়ে এটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা।
সেখান থেকে বের হতে হতে দুপুর পেরিয়ে গেল। দেখা দেখির পর্ব শেষ। এবার এই লম্বা যাত্রার পরিসমাপ্তি করা প্রয়োজন যদিও মনে হচ্ছিল আরো কয়েক দিন এভাবে ঘুরতে খারাপ লাগত না। রুট ২ ধরে কিছু দূর গিয়ে ইন্টারস্টেট ৯০ ওয়েস্ট নিলাম। এখান থেকে সাড়ে তিনশ’ মাইল গেলে স্পোকেন। এর মধ্যে আর কোথাও থামার কোন পরিকল্পনা নেই কিন্তু যদি সুন্দর কিছু চোখে পরে তাহলে থামব। এই পথটুকু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে অতুলনীয়। লোলো ন্যাশনাল ফরেস্টের ভেতর দিয়ে ড্রাইভ করে যাই। পথে খাবার জন্য এবং তেল নেবার জন্য থামলাম শুধু। এই এলাকা আইডাহো স্টেটের সীমানার মধ্যে পড়ে। আইডাহো এবং ওয়াশিংটন স্টেটের সীমান্তে অবস্থিত কোর দ্য এলেন একটি ভীষণ সুন্দর ছোট্ট শহর। সেখানে যখন পৌঁছালাম তখন বিকাল। উঁচু রাস্তার উপর থেকে শহরটা দেখেই হৃদয় উদবেলিত হয়ে উঠল। লেক কোর দ্য এলেন এবং স্পোকেন রিভারের সঙ্গমে অবস্থিত এই শহরটি ছবির মত সুন্দর। মনে হল স্পোকেনে না গিয়ে এখানে এলেই বুঝি ভালো হত। তবে মনে মনে হিসাব করে দেখলাম স্পোকেন থেকে এর দূরত্ব মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ মাইলের মত। যার অর্থ এখানে প্রায়ই ঘুরতে চলে আসা যাবে।
কোর দ্য এলেনের নানা ধরনের আকর্ষণের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিঃসন্দেহে কোর দ্য এলেন রিসোর্টে অবস্থিত ভাসমান বোর্ড ওয়াক। এই ভাসমান বোর্ডওয়াকটি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম। এটি লম্বায় ৩৩০০ ফুট ও চওড়ায় ১২ ফুট এবং লেক কোর দ্য এলেনের মেরিনাটাকে সম্পূর্ণ পরিবেষ্টিত করে আছে। বোর্ডওয়াকের মাঝে ৬০ ফুট লম্বা একটা অর্ধ বৃত্তাকার ব্রিজের নিচ দিয়ে মেরিনাতে বোট যাতায়াত করে। রিসোর্টের অন্তর্ভুক্ত হলেও সাধারণ মানুষের এই বোর্ডওয়াকে যাবার ফ্রি এক্সেস আছে। বিকালের দিকে সেখান থেকে রওনা দিয়ে স্পোকেনে পৌঁছালাম, আধা ঘণ্টার পথ। আগেই একটা হোটেল ঠিক করে রেখেছিলাম। ইচ্ছা কাজের জায়গার কাছে কোথাও একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করব। আসার আগেই কিছু খোঁজখবর নিয়ে এসেছি শহরটা সম্বন্ধে। চারদিকে পাহাড় ঘেরা স্পোকেন রিভারের তীরে অবস্থিত এই শহরটা উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে সফল মাইনিং ডিসট্রিক্ট হিসাবে পরিগণিত। ফাদার’স ডে’র জন্ম এই শহর থেকে। শহরের জনসংখ্যা দুই লাখের মত। পরবর্তী কয়েক দিন ঘুরে অফিসে কাছাকাছি একটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের দোতলায় একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করলাম। আমার বাসার ঠিক সামনেই একটা খামার বাড়ি, সেখানে থেকে পাল ইমু পালা হয়। খুব ধীর স্থির গোবেচারা প্রাণী। দূরে দিগন্তে সেল্কার্ক পর্বতমালার অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখার মত। কাছেই রয়েছে মাউন্ট স্পোকেন, উচ্চতা ৬০০০ ফুট (এক মাইলের মত)। এই পাহাড়ের চূড়ায় গাড়ি নিয়ে উঠে যাওয়া যায়। দু’পাশে জন বসতি আছে যদিও খুব সামান্যই। শুরু হল আমার নতুন জীবন এক নতুন শহরে, নতুন মানুষদের মাঝে। দিনে অফিস করি আর রাতে এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের জিমনেসিয়ামে গিয়ে ব্যায়াম করি। ব্যাচেলর জীবনের অনিয়মে উল্টো-পাল্টা খেয়ে শরীরের চেকনাই কিছু বেড়েছে। পাঁচ বছর হয়ে গেছে, দেশে যাইনি। বাবা-মা যাবার জন্য জোর করছে। তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার। এই অপূর্ব পরিবেশে কালো চুল আর কালো চোখের মায়াবী চেহারার এক বঙ্গ ললনা যোগ হলে জীবন হয়ে উঠবে স্বপ্ন। আমি স্বপ্নচারী হয়ে পড়ি।

শেয়ার করুন