গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান : কানাডার অকালপ্রয়াত মেধাবী কবি

36

সুব্রত কুমার দাস
১৯৯৪ সালে কানাডার টরন্টোর একটি ছোট্ট পার্ককে একজন কবির নামে নামকরণ করা হয়। বাথার্স্ট এবং স্পাডাইনা সংযোগ সড়কের কাছাকাছি ওই পার্কে টরন্টোর বাসিন্দা অকালপ্রয়াত এই কবির আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করার কথা ছিল ১৯৯৯ সালে। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস যে, মূর্তির স্থপতি কাজ শেষ করার আগে মৃত্যুবরণ করেন। পরে নতুন শিল্পীর সহযোগিতায় মূর্তি স্থাপিত হয় ২০০৬ সালে। অকালপ্রয়াত মেধাবী সেই কবি দ্বিতীয়বারের মতো কবিতায় দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য-স্বীকৃতি গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন ১৯৮৭ সালে। এবং মর্মান্তিক যে, সে পুরস্কার ঘোষণার পরে এবং পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানের আগেই কবির প্রয়াণ ঘটে। এই কবি গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান (১৯৪১-১৯৮৭) কবিতার জন্যে সেই পুরস্কারটি প্রথমবার লাভ করেছিলেন ১৯৬৯ সালে।
অনেক সাহিত্য-সমালোচকই মনে করেন গুয়েনডলিন ছিলেন তাঁর প্রজন্মের একজন অগ্রদূত সাহিত্যিক ও কবি। কেউ কেউ বিশ্বমাপের কানাডীয় সাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউডের সাথেও তাঁর মেধাগত উচ্চতার তুলনা দিয়ে থাকেন। গুয়েনডলিন ছিলেন মার্গারেটের চেয়ে দুই বছরের ছোট। দুজনেরই প্রথম কবিতার বই বের হয় ১৯৬১ সালে। মার্গারেট গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান গুয়েনডলিনের তিন বছর আগে। ছাব্বিশ বছরের সাহিত্যজীবনে গুয়েনডলিনের মোট কাব্যগ্রন্থ ১৪টি, কথাসাহিত্য চারটি, প্রবন্ধসাহিত্য একটি, শিশুতোষ সাহিত্য তিনটি। এছাড়াও তিনি ইউরিপিদিস ও অ্যারিস্টোফেনিসের নাটকও অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে মার্গারেট অ্যাটউড এবং ব্যারি কোলাহানের সম্পাদনায় দুই খণ্ডে গুয়েনডলিনের কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হয়।
কানাডীয় সাহিত্যের মহাবিস্ফোরণের প্রাকলগ্নে ১৯৬৯ সালের ২৮ আগস্ট গুয়েনডলিনের একটি সাক্ষাত্কার প্রচারিত হয় রেডিওতে। গত বছর টরন্টো থেকে প্রকাশিত ‘লিটারারি টাইটানস রিভিজিটেড’ শিরোনামের গ্রন্থে ওই সাক্ষাত্কারটি সংকলিত হয়েছে। সম্পাদক অ্যান আরবানকিক জানাচ্ছেন, ‘গুয়েনডলিনের প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। এবং আঠারো বছর বয়সেই তিনি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দেন সার্বক্ষণিক লেখক হিসেবে কাজ করার জন্যে’ (পৃ. ১১৯)। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রথিতযশা সমালোচক নিক মাউন্ট জানাচ্ছেন, ‘গুয়েনডলিন কবিতা লিখতে শুরু করেন বারো বছর বয়সে। যে পেনসিল দিয়ে তিনি প্রথম কবিতা লিখেছিলেন সেটিকে সযতনে সাদা খামে ভরে রেখে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ছোট্ট সে উপন্যাসের জন্য তিনি ৪০০ ডলার আয়ও করেন। তিনি উপন্যাস লিখেছিলেন, উপন্যাসের টাকা দিয়ে কবিতা লেখার জন্যে’ (অ্যারাইভাল, টরন্টো, ২০১৭, পৃ. ৭৭)। নিক আরও জানিয়েছিলেন-গুয়েন নিজের চেষ্টায় হিব্রæ শিখেছিলেন। শিখেছিলেন আরবি এবং প্রাচীন মিশরীয় ভাষাও।
‘দ্য শ্যাডো মেকার’ গ্রন্থের জন্য প্রথমবার গভর্নর জেনারেল পুরস্কারপ্রাপ্তির আগে গুয়েনের আরও পাঁচটি কবিতার বই ছাপা হয়। ‘সেলাহ’ (১৯৬১), ‘দ্য ড্রাঙ্কেন ক্লক’ (১৯৬১), ‘দ্য রাইজিং ফায়ার’ (১৯৬৩), ‘টেরর অ্যান্ড এরেবাস’ (১৯৬৬) এবং ‘দ্য ব্রেফফ্রাস্ট অব বারবারিয়ান’ (১৯৬৬)। ‘টেরর অ্যান্ড এরেবাস’ কিন্তু আসলে কাব্যনাটক। ‘দ্য শ্যাডো মেকার’ শব্দপুঞ্জকেই ব্যবহার করেছেন রোজমেরি সুলিভান তাঁর জীবনীগ্রন্থে। ‘শ্যাডো মেকার : দ্য লাইফ অব গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান’ গ্রন্থটি নিজেও কিন্তু ১৯৯৫ সালে নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করে। গুয়েনের জীবনকে কেন্দ্র করে লর্নে জোনস ‘মাইটি ওকস’ নামের একটি উপন্যাসও লিখেছেন। সমসাময়িক মার্গারেট অ্যাটউড লিখেছিলেন গল্প ‘আইসিস ইন ডার্কনেস’। গল্পটি ছাপা হয়েছিল ১৯৯০ সালে। ‘শ্যাডো মেকারস’ এবং ‘আফটার ওয়াল্ডর্স’ এর মাঝে রয়েছে ‘দ্য আর্মিস অব দ্য মুন’ (১৯৭২), ‘ম্যাজিক অ্যানিমেলস : সিলেক্টেড পোয়েমস : ওল্ড অ্যান্ড নিউ (১৯৭৪), ‘ট্রোজান ওম্যান’ (১৯৮১), ‘দ্য ফায়ার ইটারস’ (১৯৮২), ‘দ্য টি ই লরেন্স পোয়েমস’ (১৯৮২), ‘দ্য ম্যান উইথ থ্রি ভায়োলিনস’ (১৯৮৬) এবং ‘আফটার ওয়াল্ডর্স (১৯৮৭)।
খেয়াল করে দেখা যেতে পারে যে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময় থেকেই গুয়েন কিন্তু কথাসাহিত্যও শুরু করেন। প্রথম উপন্যাস ‘জুলিয়ান দ্য ম্যাজিশিয়ান’ কিন্তু সেই ১৯৬৩ সালেই প্রকাশিত। ১৯৭১-এ আসে ‘কিং অব ইজিপ্ট, কিং অব ড্রিমস’। ১৯৮৫ সালে এসেছিল ‘নোম্যান’স ল্যান্ড’।
গুয়েনের একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘লেট মি মেক দিস পারফেক্টলি ক্লিয়ার’। জীবদ্দশায় গুয়েনের সর্বশেষ গ্রন্থ ‘আফটার ওয়াল্ডর্স’-এর অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতায় গুয়েন বোঝাতে চেয়েছেন কবিতা বলতে তিনি কী বোঝেন। কোনো লেখাকে ‘কবিতা’ বানিয়ে তোলার জন্যে তিনি লেখেন না সেটি স্পষ্ট করেছেন গুয়েন। তাহলে কবিতা রচনাকালে গুয়েনের মূল অভীষ্ট কী? গুয়েনের ভাষায়-
All I have ever cared about
And all you should ever care about
Is what happens when you lift your eyes from this page.
গুয়েন যখন কবিতা নিয়ে এমন সব কথা লিখেছেন তখন তিনি মধ্য-চল্লিশে উপনীত। কবিতার বোধ এবং শৈলী উভয় ব্যাপারেই অর্জন করেছেন স্বকীয়তা। একের পর এক কবিতায় চমকিত করে চলেছেন কানাডীয় কাব্যবোধ্যা পাঠককে। ‘আফটার ওয়াল্ডর্স’-এর আরেকটি কবিতার নাম ‘ইউ ক্যান স্ট্যাডি ইট ইফ ইউ ওয়ান্ট’। সে কবিতার যে প্রশ্নকে কবি তুলে এনেছেন অবলীলায় সেটি হলো ‘তুমি লেখ কেন?’ সে প্রশ্নের উত্তরে গুয়েনের চূড়ান্ত উত্তর :
Poetry has nothing to do with poetry
Poetry is how the air goes green before thunder
is the sound you make when you come, and
why you live and how you bleed, and
The sound you make or don’t make when you die.
গুয়েন্ডেলেনি ম্যাকইয়ানের কবিতা কিন্তু সেই আঠারো বছর বয়সে ছাত্রকালেই শক্তিমত্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। স্কুলে পড়াকালে ‘দ্য ওয়াহ মাই ক্যাফে’তে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে পুলিশ তল্লাশি চালালে যখন কিশোরী মেয়েটিকে তার উপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, গুয়েন কিন্তু সেদিনই দার্ঢ্যের সাথে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আজকে আমি একটি পৃষ্ঠা মাত্র/ কিন্তু খুব শিগগিরই আমি একটি পূর্ণ গ্রন্থ হতে যাচ্ছি।’ সত্যি সত্যি তিনি অনেক বেশি সৃজনশীল হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬১ সালে প্রথম দুটি কবিতার বই প্রকাশের আগেই তিনি লিখেছিলেন “অ্যাডাম’স আলফাবেট”। যদিও সে বই প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি তরুণী গুয়েনের পক্ষে। আঠারো বছরের গুয়েনের কবিতার বইটি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ প্রকাশের অনুমতি না দেওয়ায় আলোর মুখ দেখেনি বলে জানাচ্ছেন রোজমেরি (পৃ: ৭৭)। রোজমেরি জানিয়েছেন অ্যাডাম’স অ্যালফাবেট ছিল একটি দীর্ঘ কবিতা যেটির ভেতরে ছিল বাইশটি শব্দখেলার ছোটো কবিতা। ওই বাইশটি কবিতা আসলে হিব্রু ভাষার বাইশটি বর্ণের ওপর ভিত্তি করে গুয়েন রচনা করেন। অর্থাত্ স্পষ্ট হয়, শুরু থেকেই কবিতার প্রকরণ নিয়ে খেলা শুরুর করেছিলেন গুয়েন।
এই সময়টাতে গুয়েনের মননে অন্য একটি নির্মাণও চলেছিল-সেটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ। সেই আকর্ষণের কারণেই তিনি হিব্রু ভাষা শিখতে শুরু করেন, হিব্রু ভাষার সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। সে সময়কার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিও তাঁকে বিচলিত করতে থাকে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যে ভাঙচুর শুরু হয়, গুয়েন ছিলেন তাঁর পরোক্ষ এক পর্যবেক্ষক। রোজমেরি জানিয়েছেন, হাইস্কুলে পড়ার সময় গুয়েনের এক সহপাঠী ছিলেন আরব দেশের, যিনি গুয়েনের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হন। তাঁদের বন্ধুত্ব গুয়েনকে কোরআন পাঠেও আকৃষ্ট করেছিল। গুয়েনের সে সময়কার কোনো কোনো কবিতায় কোরআনের বাণীর ইঙ্গিত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন রোজমেরি (পৃ. ৫৮)। ‘দ্য সিলেক্টেড গুয়েন্ডলিন ম্যাকইয়ান’ গ্রন্থের শেষে গুয়েনের স্কুলের ইয়াবুকের একটি পৃষ্ঠা মুদ্রিত আছে তাতে লেখা আছে, ১৯৫৮ এবং ১৯৫৯ সালে তিনি স্কুলের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন এবং সাহিত্য প্রতিযোগিতায় একজন বিজয়ীও ছিলেন।
‘আফটার ওয়ার্ল্ডস’-এর আগে ঠিক পাঁচ বছর গুয়েনের কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। এর আগের বইটি ছিল ‘দ্য টি-ই লরেন্স পোয়েমস’। সে কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধে গুয়েন লিখেছেন, ১৯৬২ সালে তিনি ইসরায়েলের টিবোরিয়াস শহরে হোটেলে অবস্থান করার সময় তাঁর ভাবনা ও স্মৃতি নিয়ে কুড়ি বছর পরে লেখা কবিতাগুলোই তিনি এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন। সে বইয়ের ‘আলি’, ‘ভিজুয়াল পারপেল’ বা ‘ফয়সাল’ কবিতা পুরোপুরি ইসলামি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আশ্রয় করেই রচিত। সেখানে আরও আছে ‘নোটস ফ্রম দ্য ডেড ল্যান্ড’ যে কবিতায় গুয়েন কাব্যিক উচ্চতায় উচ্চারণ করেছেন আরবীয়দের বিশ্বাসের কথা। গুয়েনের ভাষায়-
The Arabs say that when you pray, two angels stand
On either side of you, recording good and bad deeds,
and you should acknowledge them.
Lying here, I decide that now
the world can have me any way it pleases.
I will celebrate my perfect death here. Muktub:
It is written, I salute both of the angels.
গুয়েনের কবিতায় প্রাচ্য বলতে মধ্যপ্রাচ্যকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর কবিতায় আমরা ভারতীয় পুরাণের ছড়াছড়িও দেখতে পাই। কালী, পার্বতী এবং শক্তির মিশেল ভারতীয় পুরাণে আমরা যেভাবে দেখি, সেটির উপস্থিতি গুয়েনডলিনের কথাসাহিত্য এবং কবিতায় নজর কাড়ার মতো। তাঁর লেখা সর্বশেষ কবিতা, যেটি ‘আফটার ওয়ার্ল্ডস’-এর শেষ কবিতা সেই ‘দ্য টাও অব ফিজিক্স’-এ গুয়েনডলিন উচ্চারণ করেন শক্তিমান এক নটরাজের কথা। তিনি বলেন-
And my lord Siva dances in the city streets,
His body a fierce illusion of flesh, of energy,
The particles of light cast off from his hair
invade the mighty night, the relative night, this dream.
কবিতার বহু বৈচিত্র্যের যে সমন্বয় সেটির মূর্ত এক উপস্থাপন গুয়েনডলিনের কাব্যসম্ভার। ‘ম্যাজিক অ্যানিমেলস’ কাব্যগ্রন্থের পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে ‘জেনেসিস’ নামের সেই কবিতাটির কথা। ঈশ্বরের ওপরে রক্ত মাংসের মানুষের চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য প্রতিস্থাপন করতে একটুও সংযত হননি গুয়েন। খুব সহজেই বলেছেন-
In the Beginning God was mad, and he knew it.
He took no precautions and let His mighty sperm
Spill out into gorgeous space.
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টি নিয়ে ঈশ্বরের প্রারম্ভিক দিনগুলো নিয়ে এমন কল্পনার বিস্তার গুয়েনের মতো কবির পক্ষেই সম্ভব। আর তাই গুয়েনের ঈশ্বরকে দেখতে পাই অস্বাভাবিক আচরণে ব্যস্ত। যে মানুষের আচরণ পশুর মতো ছিল তাদেরকে ওই ঈশ্বর প্রতিশোধ নিতেও কার্পণ্য করেন না। এই গ্রন্থে ‘দ্য ডিসকভারি’ নামের একটি কবিতা আছে। ত্রিশের কোঠায় বসে কতখানি দার্শনিকতার উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব সেটির এক অতুল্য উদাহরণ এই কবিতাটি। কবিতাটি গুয়েন শেষ করেছেন এভাবে :
When you see the land naked, look again
(bu your maps, that is not what I mean),
I mean the moment when it seems most plain
is the moment when you must begin again.
মার্গারেট অ্যাটউড তাঁর “ম্যাকইয়ান’স মিউজ” প্রবন্ধে গুয়েনের কাব্যজগত্ নিয়ে ভিন্নতর এক অবলোকন দিয়েছেন। গুয়েন যে বলেছিলেন, আমি একটি মিথকে নির্মাণ করব, সেটিকে ইঙ্গিত করে মার্গারেট বলেছেন, ‘তিনি সত্যি সত্যি মিথকে নির্মাণ করেছিলেন। মার্গারেটের মতে, গুয়েনডলিন এমন কবি নন যিনি তাঁর জীবনকে মিথে পরিণত করতে আগ্রহী। বরং তিনি এমন কবি যিনি তাঁর মিথকে জীবনে রূপান্তরিত করেন। তিনি তাঁর মিথকে কবিতায় রূপান্তরিত করেন যেটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ (সেকেন্ড ওয়ার্ডস, পৃ. ৭৬)।
প্রখর কল্পনাশক্তির অধিকারী অনন্য এই প্রতিভার শেষ দিনগুলো কাটছিল জনযোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায়। রোজমেরির জীবনী থেকে জানা যায়, শেষ সপ্তাহে কারো সঙ্গেই তিনি যোগাযোগ করেননি। ৩০ নভেম্বর তারিখে গুয়েনের বাসায় যান তাঁর বন্ধু রুবেন। দরজায় নক করার পর কেউ যখন খোলেনি তখন তিনি ঘরে প্রবেশের ব্যবস্থা করেন। তাঁকে বিছানায় অবিন্যস্তভাবে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। শরীরে হাত দিয়ে শঙ্কিত হন। দৌড়ে ঘরের কোণের ফোনটা হাতে নিয়ে বুঝতে পারেন ফোনের তার ছেঁড়া। বসার ঘরের ফোনেরও একই অবস্থা ছিল (পৃ. ৪০৮-৯)। কবি গুয়েনের স্মরণে অনুষ্ঠিত মেমোরিয়াল সার্ভিস নিয়ে গ্লোব অ্যান্ড মেইল-এর একটি সংবাদ অ্যাডলে মেঘান স্ট্রিমাসের ‘দ্য সিলেক্টেড গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান’ (হলস্টেইন, ২০০৭) বইতে অন্তর্ভুক্ত আছে। জানা যায়, আল পার্ডি, টিমথি ফিন্ডলে, জো রজেনব্লাট, মার্গারেট অ্যাটউড, ফিলিস ওয়েবের মতো কবিরা সে অনুষ্ঠানে গুয়েনের কবিতা থেকে উচ্চারণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘কিং অব ইজিপ্ট, কিং অব ড্রিমস’ উপন্যাসে আমরা পড়ি-
‘মারা যাওয়া খুব সহজ-এত সহজ যেটি আমরা ভাবতেও পারি না। যদি আমি না খেয়ে থাকি, যদি আমার শরীর ক্রমে ক্রমে ধ্বংস হতে দেই এবং মোমবাতির মতো ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ করে ফেলি তাহলেই হবে। কেউ আমার এই অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করতে পারবে না। আমি একজন রাজদ ধারী মানুষ এবং আমার শেষ আদেশ হলো আমাকে মরতে দাও।’
কেমন যেন মনে হয় এই আদেশই কি কবি গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান বাস্তবায়ন করেছিলেন নিজের জীবনে মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে। কোনো মানুষের সাথে সংযোগ রাখেননি সপ্তাহ ধরে। ফোন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন যাতে কোনো মানুষ তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। অটোপসি রিপোর্টে বলেছিল : Causes of death: Metabolic Aciodosis, resulting from a recent history of binge drinking and no food intake।
গুয়েনের এই মৃত্যু কিন্তু তাঁর সেই প্রথম যৌবনে রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য রাইজিং ফায়ার’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। বাইশ বছর বয়সে রচিত সে গ্রন্থে ‘দ্য চয়েস’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে। সে কবিতার কবি তিন ধরনের মৃত্যুর কথা বলেছেন। ওই তারুণ্যে রচিত মৃত্যু নিয়ে সে কবিতা সম্পর্কে তিনি নিজে যদিও বলেছেন, ‘এটি মৃত্যু নিয়ে, তবে সত্যিকারের মৃত্যু নিয়ে নয়’, কিন্তু তারপরও কেন যেন মনে হয় তিনি বোধ করি সারা জীবনব্যাপীই মৃত্যুর এক প্রতিচ্ছায়া সাথে নিয়ে ঘুরেছেন বন্ধুর মতো করে। যেন মৃত্যুকে ভালোবেসেছেন প্রেমিকার আলিঙ্গনে। ওই যে তিনি লিখেছিলেন, ‘and some have a choice of several deaths/ and that in itself is a consolation’-মনে হয় তিনি ওই সান্ত্বনাকে যেন আশ্রয় করলেন যখন কানাডীয় সাহিত্যে তাঁর অনেক দেবার ছিল এবং যার প্রতিফলন ঘটেছিল ‘আফটার ওয়াল্ডর্স’ কাব্যগ্রন্থের জন্যে দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কারের ঘোষণা।

শেয়ার করুন