তসলিমা নাসরিন, নির্বাচিত কলাম এবং মিনার মাহমুদ

142

ফরিদ আহমেদ
স্বৈরাচারী এরশাদের সময় একটা বারুদ ধরনের পত্রিকা বের হতো ঢাকা থেকে। এরকম ঝাঁঝালো পত্রিকা বাংলাদেশে আর বের হয়নি পূর্বে কখনো। সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিলো এটি। এই পত্রিকাটার নাম ছিলো ‘বিচিন্তা’। ‘বিচিন্তা-র সম্পাদক ছিলেন মিনার মাহমুদ। তিনি তসলিমা নাসরিনের তৃতীয় স্বামী। একানব্বই সালের ফেব্রæয়ারি মাসে তাঁদের বিয়ে হয়। ডিসেম্বর মাসে মিনার মাহমুদ আমেরিকায় পাড়ি জমান। দেশত্যাগের আগেই তাঁদের সেপারেশন হয়ে যায়। মাত্র সাত বা আট মাসের স্বল্পস্থায়ী দাম্পত্য জীবন তাঁদের।
মিনার মাহমুদের বিচিন্তাতে সেই সময় কলাম লিখতেন তসলিমা নাসরিন। তো, এই বিচিন্তাতে একদিন অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে যায়। তসলিমা নাসরিনের একটা লেখা এবং সুকুমারী ভট্টাচার্যের একটা লেখা পাশাপাশি প্রকাশ করে বিচিন্তা। উদ্দেশ্য হচ্ছে দেখানো যে তসলিমার লেখাটি মূলত সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখারই হুবহু নকল।
২০১১ সালের দিকে মিনার মাহমুদ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০১২ সালে ‘জনতার চোখ’ নামে একটা পত্রিকা তাঁর সাক্ষাতকার নেয়। সেখানে তসলিমার সাথে তাঁর কী কারণে বিচ্ছেদ ঘটেছিলো এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আদর্শগত দ্ব›েদ্বর কারণেই তাঁদের বিয়েটা টেকেনি। আদর্শগত দ্ব›দ্ব বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন, এই প্রশ্ন করার পরে তিনি যা বলেন, সেটা হচ্ছে এরকম:
“তার লেখালেখিসহ জীবন-যাপনের অনেক কিছুর সঙ্গে আমি একমত আবার অনেক কিছুর সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করেছি। তসলিমা নাসরিন নিয়মিত ‘বিচিন্তা’য় লিখতেন। বিচিন্তাতেই কাজ করতেন অ¤øান দেওয়ান। বর্তমানে বাংলাদেশস্থ ফরাসি দূতাবাসে কর্মরত অম্লানের অভ্যাস ছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখাপড়া করা। সে হঠাৎ তসলিমা নাসরিনের একটি লেখা আর ভারতের নারীবাদী লেখিকা সুকুমারী রায়ের একটি লেখা নিয়ে আসে। দুটো লেখা মিলিয়ে দেখা গেল তসলিমা নাসরিনের লেখাটি আর সুকুমারী রায়ের লেখা হুবহু এক। দাড়ি-কমাসহ। আকার-ইকারও কোন রকম বদলায়নি। এটাকে আমরা বলি চৌর্যবৃত্তি। তো তৎকালীন বিচিন্তায় তসলিমা নাসরিনের লেখাটি আর সুকুমারী রায়ের লেখা আমরা পাশাপাশি ছাপালাম। যা হয়- এখান থেকেই সাংসারিক ক্ষেত্রে আর আদর্শগত দিক থেকে আমাদের দ্ব›েদ্বর সূচনা। আমি আসলে তখন বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি, আমি যখন সম্পাদক তখন সেখানে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে আমার দায়িত্বের এখতিয়ার অনেক বড়। এখতিয়ারই বলে যে, আমাকে লেখাটি ছাপাতে হবে।
অপরাধ যদি আমার ঘরে থাকে তবে আমি অন্যদের অপরাধ কিভাবে ছাপাবো। বিষয়টি তাকে বোঝাতে আমি ব্যর্থ হই। এটিকে সে অত্যন্ত অফেনসিভ হিসেবে নেয়। সে আমাকে বললো, আমি তার সঙ্গে শত্রæতা করেছি। আমি পাল্টা জবাবে বলেছিলাম, এটা রিয়েলিটি, তুমি নিজেই দেখ। তোমার নিজের লেখার পাবলিকেশন্স তারিখ আর সুকুমারী রায়ের লেখা ছাপা হয়েছে তিন-চার বছর আগে। চুরিটি ছিল খুবই কৌশলের চুরি-এটা প্রকাশিত না হলে কেউ জানতো না। পরে তসলিমা নাসরিনের প্রথম বই ‘নির্বাচিত কলামে’ও লেখাটি ছাপা হয়েছিল। যেদিন থেকে এ ঘটনা জানতে পারি সেদিন থেকে আমি তসলিমার লেখালেখির ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কারণ, একটি মৌলিক লেখা যা অন্যের তা কাট-পেস্ট করার কোন মানে হয় না। মূলত সেই থেকেই আমাদের দ্ব›েদ্বর সূত্রপাত।”
মিনার মাহমুদ বার বার তাঁর সাক্ষাতকারে সুকুমারী রায় বলেছেন। এটা ভুল। আসলে সুকুমারী ভট্টাচার্য হবে। এই ভুলটা তিনি করেছেন, নাকি যিনি সাক্ষাতকার নিয়েছেন তিনি করেছেন, জানি না আমি। তবে, উদ্ধৃতির মধ্যে ব্যবহার করার কারণে আমি আর সংশোধনের দিকে যাইনি। আশা করি পাঠক, সুকুমারী রায়ের পরিবর্তে সুকুমারী ভট্টাচার্য পড়ে নেবেন।
তসলিমা নাসরিন পূর্বাভাস এবং বিচিন্তায় লেখা তাঁর কলামসমূহ দিয়ে একটা বই প্রকাশ করেছিলেন। নাম হচ্ছে ‘নির্বাচিত কলাম’। এই বইটা আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলো ১৯৯২ সালে। আনন্দ পুরস্কার অত্যন্ত সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ একটা পুরস্কার। বেলাল চৌধুরীর মতে, “ আনন্দ পুরস্কার হচ্ছে বাংলার সাহিত্যিকদের জন্য স্বপ্নের বিষয়। এ হচ্ছে গিয়ে বাংলার নোবেল প্রাইজ।” তো, এই বাংলার নোবেল পাওয়া এই বইটাতে মিনার মাহমুদের ভাষ্যমতে কমপক্ষে একটা কলাম রয়েছে যা কিনা চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে আহরিত। খুবই কেলেঙ্কারি ব্যাপার। মিনার মাহমুদের কথা মিথ্যা হলেই ভালো হতো। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তিনি আসলে মিথ্যা কথা বলেননি। তসলিমা নাসরিন তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্বিখণ্ডিত’-তে এই চৌর্যবৃত্তির কথা নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। আসুন দেখি তসলিমার বক্তব্য কী এ বিষয়ে। এই অংশটুকু বইটার ২০৩ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া।
“পুরস্কার আনতে এবারের আমন্ত্রণ অন্যরকম। যাওয়া আসার টিকিট, কলকাতায় থাকা সবই এখন আনন্দবাজারের দায়িত্ব। আহলাদে মাটিতে পা পড়ে না আমার। মুই যেন কি হনুরে জাতীয় একটি ভাব যখন আমাকে গ্রাস করছে, তখনই বইটির দুটো কলামের কথা মনে করে আঁতকে উঠি। কেউ যেন ধারালো একটি সুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে আমার ফুলে ওঠা অহংকারকে চুপসে দিল। বেদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে, যদিও আমার কাছে সব কটি বেদ এর খণ্ড ছিল তারপরও বেদ বিশেষজ্ঞ সুকুমারী ভট্টাচার্যের প্রাচীন ভারত ও বৈদিক সমাজ বই থেকে না টুকে পারিনি। কী এক ঘোরের মধ্যে বাক্যের পর বাক্য টুকে নিয়েছি। বইটি আমাকে এমনই প্রভাবিত করেছে যে আমি পারিনি নিজেকে সুকুমারী থেকে মুক্ত করে নিজের আলাদা কোনও মত প্রকাশ করতে। সুকুমারী থেকে বেদের অনুবাদটুকুই নিতে পারতাম, কিন্তু তাঁর মন্তব্যও চুরি করতে গেলাম কেন? চুরি করতে গেলাম এই জন্য যে তাঁর মতের সঙ্গে আমার মত হুবহু মিলে যায়। এমন সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি বেদএর শ্লোকের যে বইটি না পড়লেও ঠিক এমনই ব্যাখ্যা আমার মনে উদয় হত। আমার কথাই যেন তিনি আমার বলার আগে বলে দিয়েছেন। কলাম দুটো পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর ক্ষীণ একটি গøানি আমাকে নিস্তার দেয়নি। ব্যাপারটি এক বালতি খাঁটি দুধের মধ্যে দুফোঁটা চোনা মিশিয়ে পুরো দুধকেই নষ্ট করে দেওয়ার মত। আনন্দ পুরস্কারের খবর পেয়ে প্রথম আমার মনে পড়েনি আমার এই চুরির কথা। হঠাৎ যখন মনে পড়ে, গøানি আর লজ্জা আমাকে কেঁচোর মত নিজের গর্তে ঢুকিয়ে রাখে। ঘৃণায় নিজের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না।”
কানাডা প্রবাসী লেখক

শেয়ার করুন