পরিবেশ: ফুটবল

31

ড: বাহারুল হক
গত ১৯ আগস্ট শনিবার এক্সেস এলায়েন্সে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বায়েস (বেঙ্গলি ইনফরমেশন এন্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস)-এর আয়োজনে এনভায়রনমেন্ট এঅয়ারনেস-এর উপর একটি প্রাণবন্ত ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে একমাত্র বক্তা ছিলেন বাংলাদেশী বংশোদভূত নারী পরিবেশবিদ তেরেসা গোমেজ।
বায়েস-এর একজন সদস্য হিসেবে সে ওয়ার্কশপে আমিও উপস্থিত ছিলাম। এনভায়নমেন্ট কি, কত প্রকার, সেগুলি কিভাবে পরষ্পর সম্পর্ক যুক্ত এবং বিশ্বব্যপি এনভায়রনমেন্ট কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সে সব বিষয়ের উপর তেরেসা তার বক্তব্য রাখলেন খুব সুন্দরভাবে। পরিশেষে বললেন কিভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি এবং পরিবেশ আমাদের অনুকুলে রাখতে আমাদের  কি কি করা উচিত। প্রসংগক্রমে তেরেসা বাংলাদেশের সুন্দরবনের কথাও তুলে আনলেন। সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনে শরিক হয়ে টরন্টোতেও যে মানববন্ধন হয়েছে তার কিছু স্লাইড তেরেসা প্রদর্শন করলেন।
সুন্দরবনের অদূরে কয়লা শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তাতে যে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে তা তেরেসা ভালোভাবে ব্যাখ্যা করলেন। সুন্দরবনের মত বনহীন একটা বাংলাদেশ যে কিরকম বাংলাদেশ হবে তাতো বলার অপেক্ষা রাখে না। সুন্দরবন ধ্বংস হলে বাংলাদেশের জল-বায়ু এবং ভূ-প্রকৃতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশের মানুষকে নতুন এক সংগ্রামে নামতে হবে এবং সে সংগ্রাম হবে নিঃসন্দেহে অতি বড় কঠিন এক সংগ্রাম। সুন্দরবনের নিকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের আয়োজন দেখে ইউনেস্কোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ সুন্দরবন ইউনেস্কো ঘোষিত একটি অন্যতম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
সব শেষে তেরেসা উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের থেকে বিষয়টির উপর মন্তব্য শুনতে চাইলেন। আমার মন্তব্য ছিল এরকম- পরিবেশ সুন্দর এবং বাসোপযোগী রাখার দায়িত্ব শুধু সরকার, সিটি কর্পোরেশন, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড বা এরকম কোন সংস্থার উপর ছেড়ে দিলে চলবে না। পরিবেশ নির্মল রাখতে এবং বিপন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করতে প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। পরিবেশ নষ্ট হয় এরকম যেকোন কাজ করা থেকে সবসময় প্রত্যেককে বিরত থাকতে হবে তবেই পরিবেশ থাকবে মানুষের বসবাসের অনুকুল ও সুন্দর।
ওয়ার্কশপ সমাপ্ত হলে এক্সেস এলায়েন্স থেকে বের হয়ে বাসার পথে নামলাম। হাঁটতে হাঁটতে একসময় এসে পড়লাম ডেন্টোনিয়া পার্ক সকার ফিল্ডের পাশের রাস্তায়। দেখলাম দর্শকে ঠাসা সকার ফিল্ড। মনে মনে ভাবলাম- কি ব্যাপার! এ ফিল্ডে দর্শকের এমন ভিড়তো কোনদিন দেখিনি।
কাদের খেলার টানে ফিল্ডে এত দর্শকের সমাগম। তারাতাড়ি আমিও দর্শকের সারিতে ঢুকে গেলাম। কথা বলে জানলাম খেলা হচ্ছে স্থানীয় টরন্টো একাদশের সাথে মন্ট্রিয়ল থেকে আগত মন্ট্রিয়ল একাদশের। দুটো দলই বাঙালি খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত। দর্শকদের অবস্থাও তাই। দল গঠন, খেলার আয়োজন সবই হয়েছে বাঙালিদের দ্বারা। দুদলের খেলোয়াড়দের ভালো করে দেখলাম। দেখে আমার মনে হলো চৌকশ খেলোয়াড়ের সংখ্যা টরন্টো দলের চেয়ে মন্ট্রিয়ল দলে বেশি। আমার ধারণা সঠিক হলো। চট করে বল টরন্টোর জালে ঢুকে গেল। টরন্টোর গোলকিপার কিছুতেই গোল হওয়া ঠেকাতে পারলো না। এরপর খেলায় উত্তেজনার মাত্রা বেড়ে গেলো। দুদলের খেলোয়াড়্দরে মধ্যে পড়ি-মরি ভাব, উন্মাদনা।
টরন্টো চায় মন্ট্রিয়লের জালে বল ঢুকিয়ে খেলায় অন্ততঃ সমতা আনতে; অন্যদিকে মন্ট্রিয়ল চায় টরন্টোর যেকোন প্রচেষ্টা প্রতিহত করে জয়ের মুকুট মাথায় পরতে। রেফারি ও শক্ত অবস্থানে। মাঠে থাকতে হলে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে খেলার শত ভাগ নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। ঘন ঘন বাঁশি বাজছে; ফাউল, কর্ণার, প্যানাল্টি। দুদলের দুজনকে লাল কার্ডও দেখিয়ে দিলেন রেফারি। এভাবেই চলছিল। হঠাৎ খেলা সমাপ্তের বাঁশি বেজে উঠলো। খেলায় টরন্টো দল হেরে গেলো।
টরন্টোর বাসিন্দা বলে একটু খারাপ লেগেছিল। পরক্ষণেই ভাবলাম- ক্ষতি কি? ছেলেগুলি দীর্ঘ ৫৫০ কিঃ মিঃ পথ পাড়ি দিয়ে এক বুক আশা নিয়ে টরন্টো পর্যন্ত এসেছে কষ্ট করে। জয়ের আনন্দ বুকে নিয়ে হাসি মুখে ওরা ঘরে ফিরে যাক।
ওরাওতো বাঙালি, আমাদেরই ছেলে। পরাজয়ের গøানি নিয়ে ফিরবে কেন? পরে আমাদের টরন্টো দল যখন মন্ট্রিয়ল যাবে তখন সেখানে নিশ্চয় টরন্টো দল জয়ী হবে। খেলা শেষে সবাই চলে গেলো। আমি আর নিতীশ নামের এক দর্শক বসে বসে কথা বলছিলাম। মাঠের দিকে তাকিয়ে খুবই হতাশ হলাম আর মনে মনে ভাবলাম এটা কি ঢাকার মাঠ নাকি টরন্টোর। আমিতো এখানে আসলাম পরিবেশের উপর অনুষ্ঠিত একটি ওয়ার্কশপ শেষ করে। ওয়ার্কশপে কি শুনলাম আর এখন কি দেখছি। ওয়ার্কশপের বক্তা তেরেসা বলেছিল পরিবেশ সুন্দর ও নির্মল রাখতে হলে পানির বা সফ্ট পানিয়ের প্লাস্টিকের বোতল, কফি কাপ, সিগারেটের প্যাকেট, পলি ব্যাগ ইত্যাদি, যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলা যাবে না। সেগুলিকে নির্দিস্ট বিন-এ রাখতে হবে।
দেখলাম মাঠের চার পাশে ঘাসের উপর পড়ে আছে পানির এবং অন্যান্য পানিয়ের খালি প্লাস্টিকের অসংখ্য বোতল। অথচ কাছেই ছিল এগুলি ফেলার বিন। নীতিশ বাবুকে বললাম- “মাঠের একি দশা! এগুলি পরিষ্কার করবে কে?” বাবু হেসে বললেন- “দর্শক খেলায় এমন নিমগ্ন ছিল যে ভুলে গিয়েছিল এটা টরন্টো। অসুবিধা নাই কাল ক্লিনার বিন ক্লিন করতে আসলে সব বোতল কুড়িয়ে নেবে”।
আমি বললাম, “না হয় নেবে, কিন্তু তার মনে কি কোন প্রশ্ন জাগবে না? সেকি জানবে না কারা মাঠের এ হাল করেছে? সেকি বিরক্ত হবে না? ক্ষীণ কন্ঠে একটা বাজে কমেন্ট করবে না? তারপর বললাম- “একটু পর চার পাশের বাসভবন থেকে মা-বাবার সাথে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এখানে আসবে হাঁটতে খেলতে। এখানে ছোট বেলায়ই বাচ্চাদের মনে সৌন্দর্য বোধ জাগিয়ে তোলা হয় এবং এ স্বচ্ছ বোধ নিয়েই তারা বড় হয়। এসব বাচ্চারা মাঠের এ দশা দেখবে এবং নিশ্চয় প্রশ্ন করবে কারা করেছে মাঠের এ হাল। মা-বাবারা নিশ্চয় বলবে, “বাঙালিদের খেলা ছিল মাঠে, তারাই মাঠ নোংরা করে রেখে চলে গেছে”। মা-বাবারা যে বলবেন তা আমি নিজের কানে শুনবো না, কিন্তু বলবেন যে এটা ভেবেই বাঙালি হিসেবে লজ্জা বোধ করছি।

শেয়ার করুন