প্রত্যাশার আলোয় রাঙানো নতুন বাংলা বছর

24

সুহেল ইবনে ইসহাক
‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা’
বাংলা নববর্ষ কড়া নাড়ছে হৃদয় দোয়ারে। পুরোনো সব গ্লানি মুছে নতুনের আগমনী বার্তা জানান দিতেই যেন বারে বারে নতুন করে, নতুন রঙে ফিরে আসে বাংলা নববর্ষ। তাই বাংলা নববর্ষ বরণ করে নিতেই এখন বাঙালির ঘরে ঘরে চলছে নানা উৎসবের আয়োজন।
বাঙালি জাতির চিরন্তন প্রধান উৎসব পহেলা বৈশাখ। আবহমান অতীত থেকে এ উৎসবটি আমরা পালন করি। পহেলা বৈশাখ আমাদের আদিকালের সংস্কৃতি। সময়ের পরিক্রমায় বর্ষবরণ উৎসব এখন বাঙালির সবচাইতে বড় উৎসব। পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়।
পয়লা বৈশাখ- এই শব্দদ্বয় বা বাক্যাংশের সঙ্গে কালবৈশাখীর ঝড়, বৈশাখী মেলা, মেয়ের জামাই ও আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রণ করা, আত্মীয় বাড়ি বেড়ানো, কৃষকের আসছে বছরের ফসলি পঞ্জিকা তৈরি করা, ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঢেলে সাজানোর উদ্দেশ্যে বিগত বছরের বকেয়া ওঠানোর জন্য হালখাতা অনুষ্ঠান ইত্যাদি বাঙালি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় নববর্ষ উদ্যাপনের কতিপয় অপরিহার্য অংশ বলেই ধরা হয়। নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব। আমাদের জাতীয় চেতনা তথা একান্ত বাঙালি সত্ত্বার সঙ্গে পহেলা বৈশাখ অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দেয়। এদিন আমরা কোনো বিশেষ ধর্ম-বর্ণ নয় বরং একটিমাত্র অখন্ড বাঙালি সত্তা এই বোধে উত্তীর্ণ হতে পারি। এ দিনটিকে সামনে রেখে শিশুরা জানতে পারে বাঙালির ইতিহাস। নববর্ষ আমাদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। সর্বোপরি নববর্ষের প্রেরণায় আমাদের মধ্যকার সুপ্ত মানবিক মূল্যবোধ নতুনভাবে জাগ্রত হয়, মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে সম্প্রীতি।
মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথ ধরে সব কিছুতেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এগুলোর মধ্যে কিছু ইতিবাচক আবার বেশকিছু নেতিবাচক। বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাঙালি জনগণ নিজস্ব সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির মাধ্যমে এ উৎসব পালন করে থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে দূষিত করছে। নাচ-গান, মেলা ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার স্থান দখল করছে বিদেশি সংস্কৃতি। এতে নববর্ষ উদযাপনের প্রকৃত স্বাদ ও তৃপ্তি থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। উৎসব উদযাপনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বাণিজ্যিকীকরণ ও অতিরিক্ত উম্মাদনা উৎসবের মূল আনন্দকে মলিন করে দিচ্ছে। মানুষ নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ছে। সংস্কৃতি হলো যে কোনো জাতির মানস দর্পণ, যে দর্পণে প্রতিফলিত হয় সামগ্রিকভাবে গণমানুষের চিন্তা-চেতনা, তথা তাদের জীবন ও মূল্যবোধ। আর সেই মূল্যবোধের অর্থই হচ্ছে সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের উপাসনা। একটি কলি পূর্ণ বিকশিত না হলে যেমন তাকে ফুল বলা যাবে না, ঠিক তেমনি জাতির আংশিক জীবনের প্রতিচ্ছবি কোন কিছুকে পরিপূর্ণভাবে সংস্কৃতি বলা যায় না।
অর্থাৎ সংস্কৃতি এমন হতে হবে, যার মাধ্যমে জাতি নির্ভেজাল পরিপূর্ণতা লাভ করে, যে সংস্কৃতি সত্যিকার অর্থে কল্যাণের প্রতীক। জাতির আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, আহার-বিহার থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিপূরক যে চেতনা তার অন্য নামই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির নিজস্ব গতিপথ আছে। এক একটি জাতি, তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে আপন পথে অগ্রসর হয়, বিকশিত হয়। এই বিকাশের সঙ্গে শেকড়ের সম্পর্ক। বলা বাহুল্য, নিজস্ব সংস্কৃতি অনিকেত নয়। পৃথিবীর কোনো জাতিই তার নিজের সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে নিজের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করতে পারেনি। ভিনদেশী সংস্কৃতির পরিতোষক যারা তারা কোনো সংস্কৃতি দিয়েই তাদের যাপিত জীবনকে পরিপূর্ণ করতে পারে না। বরং তারা হন ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী।’ সত্যিকার অর্থে আগেকার দিনের নববর্ষ এবং বর্তমানের মাঝে অপ্রত্যাশিত কিছু পরিবর্তন এসেছে; যা কিনা বাঙালি জাতি এবং তার নিজস্ব সংস্কৃতির উপর হুমকি স্বরূপ। বৈশাখের নবপ্রভাতেই বাঙালির তাই কায়মনো প্রার্থনা-যা কিছু ক্লেদাক্ত, গøানিময়, যা কিছু জীর্ণ বিশীর্ণ দীর্ণ, যা কিছু পুরনো- তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। গ্রীষ্মের এই তাপস- নিঃশ্বাস বায়ে পুরনো বছরের সব নিষ্ফল সঞ্চয় উড়ে যাক, দূরে যাক, যাক দূর-দিগন্তে মিলিয়ে।
জাতীয় জীবনেও নববর্ষ এক সর্বজনীন উৎসবের রূপ ধারণ করে আছে। নববর্ষের মেলা অর্থাৎ বৈশাখী মেলা এ দেশের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। বিচিত্র জিনিসের সমাহার ও আনন্দ-কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে বৈশাখী মেলা। এ মেলার মধ্যেই নববর্ষের যথার্থ আনন্দময় রূপটি প্রত্যক্ষ করা যায়। মোট কথা, নববর্ষ আমাদের জীবনে পরম আনন্দের উৎসব। এটি জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। জাতীয় জীবনেও নববর্ষের তাৎপর্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের ভিত মজবুত করতে প্রতিবছরই ফিরে আসে পহেলা বৈশাখ। সারা বছরের ক্লেদ-গ্লানি, হতাশা ভুলে এ দিন মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। বিশেষত, নগরজীবনে এর প্রভাব অনেক বেশি। কেননা, নাগরিক জীবনের চাপে নগরবাসী মানুষ সারাবছর বাঙালি ভাবধারা বলতে গেলে প্রায় ভুলেই থাকে। বাংলা নববর্ষে এসে নগরবাসীর মনে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া দিয়ে যায়। নববর্ষের প্রেরণায় বাঙালি নতুন করে উজ্জ্বীবিত হয়ে ওঠে। নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
নববর্ষ আমাদের জীবনে কেবল মাত্র একটি উৎসব নয় বরং এটি একটি চেতনার প্রতিরূপক। মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে নববর্ষ আমাদেরকে উজ্জীবিত করে একান্তই মানবতাবোধে। এ দিনটি আমাদের দরিদ্র, নিপীড়িত, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগায়। নববর্ষ একদিকে যেমন নির্মল আনন্দের খোরাক, অন্যদিকে তেমনি একটি চেতনার ধারক। আর তাই কোনো সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস যেন আমাদের ঐতিহ্যকে গ্রাস করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রত্যেক বাঙালিকেই সচেতন হয়ে উঠতে হবে।
বাঙালির মর্মমূলের আনন্দ-আর্তি, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা, শ্রেয়বোধ এবং শুভবুদ্ধিকে প্রকাশ ও মূর্ত করে তোলার এক অনবদ্য উৎসবই হলো পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ। ধর্মীয় উৎসব সমূহ যার যার কিন্তু বাঙালির নববর্ষ উৎসব সবার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অভিন্ন হদয়াবেগে স্পন্দিত হয় নববর্ষের এক অন্যতম অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলা। বিশেষত গ্রামীণ জীবনে বা সমাজে এ মেলার গুরুত্ব বহুবিধ এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। গ্রীষ্মের অগ্নিজিহবাও হয়তো বাতাসে লকলক করে নেচে উঠবে। অগ্নিবরণ নাগনাগিনীপুঞ্জও তাদের সঞ্চিত বিষ উগড়ে দিবে বাংলার ভূ-প্রকৃতিতে। তারপরও বাঙালি এই খরতাপ উপেক্ষা করে মিলিত হবে তার সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। দেশের প্রতিটি পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসব মুখরতার বিহবলতা। কারণ এটি বাঙালির আনন্দের দিন, পয়লা বৈশাখ।
গ্রামের জীবনে ধর্মীয় উৎসবের মতোই নববর্ষ উৎসবও নিয়ে আসে মিলনের আনন্দ। বৈশাখী মেলায় থাকে কবিগান জারি সারি ভাটিয়ালি বাউল ভাওয়াইয়া গম্ভীরা পালাগান প্রভৃতি। বাঙালির প্রাণের এ সুর গ্রামবাংলার মানুষের হৃদয়ে তোলে অপার আনন্দের মূর্ছনা। গ্রামীণ জীবনে বৈশাখী মেলা কিছুটা হলেও তাদের দুঃখ বেদনা, অর্থনৈতিক সংকট, শ্রমব্যস্ততাকে লাঘব করে। “ মুছে যাক গ্লানি, ঘুঁচে যাক জরা / অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”- কবিগুরুর এই কামনা সত্যি প্রতীয়মান হয় গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে। নববর্ষ যেমন নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখায়, তেমনি নববর্ষভিত্তিক বৈশাখী মেলা সারা বছরের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেবকে ভুলিয়ে দেয়। পুরনো আর নতুনের মেলবন্ধন ঘটায় নববর্ষ উৎসব । আর এই মেলবন্ধনের সেতু নির্মিত হয় বিশেষ করে গ্রাবাংলায় মাসব্যাপী বৈশাখি মেলায়।
বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে আমরা যদি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করতে পারি আমরা আমাদের সংস্কৃতির মূল ধারায় প্রবাহিত হবো, মনেপ্রাণে বাঙ্গালী হবো তাহলেই আমাদের জন্য মঙ্গল। তা না হলে আমাদের নিজস্ব যা কিছু অর্জন তাও হারিয়ে যেতে থাকবে। আর পরের ধনে পোদ্দারী করতে গিয়ে আমরা বারবার বাধাগ্রস্ত হবো, দিকভ্রান্ত হবো, ছিটকে পড়বো অজানা কোনো গন্তব্যে।
‘অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ হয় না’ এটি আমাদের মানতেই হবে। যদি না মানি তাহলে হারানো ছাড়া পাওয়ার কিছু থাকবে না। ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’ এমন পরিণাম যেনো জাতির সন্তানদের না হয়। আমরা আমাদের শূন্যতাকে পূরণ করবো আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায়। জাতিসত্তার উৎস সন্ধানে আমাদের ব্যাপৃত হতেই হবে। এ সত্তার মর্মমূলেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রাণশক্তি। নিজস্ব প্রাণ বন্যায় অভিষিক্ত হতে চাইলে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির কাছে ফিরে যেতেই হবে।সকল না পাওয়ার বেদনাকে ধুয়ে মুছে, আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে সূচি করে তুলতেই আবার এসেছে পহেলা বৈশাখ। নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশার আলোয় রাঙানো নতুন বাংলা বছর ।
লেখক : কবি ও কলাম লেখক , টরন্টো , কানাডা ।

শেয়ার করুন