বন্ধন

55

প্রতিমা সরকার
কাজ শেষে বাসায় যাবো বলে সাবওয়েতে অপেক্ষা করছিলাম বাসের জন্য। সাবওয়ের ভিতরে কিছু চীনা দোকান আছে, ঘুরে ঘুরে এটা সেটা দেখছিলাম। হঠাৎ একটা শিশুর কান্না আর মেয়েলি কণ্ঠে ‘ধুত্তুরি’ শুনে পিছন ফিরে দেখি একটা স্ট্রলারে দেড়-দুই বছরের ছোট একটি বাচ্চা জোরে জোরে কাঁদছে আর বাচ্চার মা ফ্লোর থেকে পরে যাওয়া কিছু জিনিস তুলছে।সাহায্য করতে এগিয়ে গিয়ে দেখি, ওমা এ যে শিমুল! দুবছর আগে একসাথে ইংলিশ একটা কোর্স করতে গিয়ে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল।শিমুলও দেখি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।দুজনে মিলে হাত লাগিয়ে ছড়ানো ছিটানো জিনিসগুলো তুলে ফেললাম।
আমি বললাম, শিমুল তুমি কেমন আছো।অনেক দিন পর দেখলাম তোমাকে। কোনো যোগাযোগ নেই। কি ব্যাপার? দিদিকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?এক সাথে এতগুলো প্রশ্ন করে দেখি শিমুল হাসছে।
—না দিদি। ভুলিনি। তোমাকে ভুলে যাবো কীভাবে ভাবলে?আসলে পড়া শেষ করার পর বিভিন্ন ব্যস্ততায় আর যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠেনি। তা তুমিও তো কোনো যোগাযোগ করোনি।শিমুলের গলায়ও অভিযোগ।একটু বিব্রত হয়ে বললাম, তোমার ফোন নম্বরে অনেকবার কল দিয়েছি কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি। তুমি মনে হয় নাম্বর বদলে ফেলেছ।
শিমুল বললো, হ্যাঁ দিদি।নম্বরটা বদলে ফেলেছিলাম, তাই যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি।
ততক্ষণে দেখি বাস ও চলে এসেছে।কিন্তু এতদিন পরে শিমুলের সাথে দেখা, ভালো করে দুটো কথা না বলেই চলে যাবো?তাই শিমুলকে বললাম, তোমার সময় থাকলে কফিশপে একটু বসি চলো। তোমার দেরি হবে নাতো?কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম!শিমুল বলল, না দিদি কিছু দেরি হবে না।চলো বসি।ওর বাচ্চাটি দেখি এর মধ্যে কখন ঘুমিয়ে গেছে।ভালোই হলো বিরক্ত করবে না। একটা কফিশপে ঢুকে দুটো কফির অর্ডার দিয়ে বললাম, এবার বলো কেমন কাটছে তোমার দিনকাল?বাচ্চার বয়স কত হলো? এও দেখি মেয়ে। বড় মেয়েটি কত বড় হলো? কোন গ্রেডে পড়ে? আবারও একসাথে কয়েকটি প্রশ্ন করে ফেললাম।আসলে অনেকদিন পর শিমুলকে দেখে খুব ভালো লাগছিল।বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই পড়ার সময়ের কথা।দুটি বছর একসাথে কী যে সুন্দর সময় কাটতো আমাদের! খুব ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল দুজনের মধ্যে।যদিও বয়সে আমার চেয়ে দু-তিন বছরের ছোটই হবে শিমুল কিন্তু তাতে আমাদের বন্ধুত্ত্বে কোনো সমস্যা হয়নি।দুজনেই দুজনের হাড়ির খবর জানতাম।
শিমুল দেখতে খুব সুন্দর।যেমন গায়ের রঙ, তেমন চুল,ফিগার!এক কথায় বলতে গেলে রূপবতী বলা যায় তাকে।ওর সবচে সুন্দর হলো চোখ।যাকে বলা হয় ডাগর কালো চোখ, শিমুলের চোখ দুটি ঠিক তেমনি। চোখের মনি দুটো কুচকুচে কালো। যা সচরাচর দেখা যায় না। অমন চোখের জন্য ওকে আরও বেশ আকর্ষণীয় লাগতো। কিন্তু সেই ডাগর কালো চোখ দুটি কেন যেন সব সময় বিষণ্ন থাকতো।আমি মাঝেমাঝে তাকে বিষণ্ণ-সুন্দরী বলেও ডাকতাম।যতই ওর ঘনিষ্ঠ হচ্ছিলাম একটু একটু করে ওর সম্পর্কে জানতে পারছিলাম ।
বেশ কয়েক বছর আগে বিয়ে করে শিমুল স্বামীর সাথে কানাডায় এসেছিল। ওর স্বামীরা তিন ভাই, বাবা-মাসহ আগে থেকেই কানাডায় বসবাস করতো। শিমুল ছিল মা-বাবার একমাত্র সন্তান । শিমুলের আপন মামা কানাডায় ছিল, উনিই মূলত এই বিয়ের ঘটকালি করেন ।পরে শিমুল তার মা বাবাকেও স্পন্সর করে কানাডায় নিয়ে আসে।ও কিছুদিন একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করেছিল। এর মধ্যে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ায় কাজ ছেড়ে দিয়েছিল।বাচ্চা হবার কিছুদিন পরে শিমুল জানতে পারে ওর স্বামী পরনারীতে আসক্ত।এছাড়াও মদ, জুয়া খেলার নেশাও ছিল।শিমুল কেঁদে কেটে মদ, জুয়ার নেশা কিছুটা ছাড়াতে পারলেও অন্য মেয়ের আসক্তিটা ছাড়াতে পারেনি। বিয়ের আগেও নাকি একাধিক মেয়ের সাথে সময় কাটাতো। ওর বরের কাজই হলো রাতে, তাই বাড়িতেও তেমন কেউ জানতো না তার এই কীর্তিকলাপ।
শিমুল যখন এসব জানতে পারে তখন তার মেয়ের বয়স এক বছর। তারপর এ নিয়ে অনেক কিছু- রাগ, অভিমান, ঝগড়া করে বাবার বাড়ি চলে যাওয়া। শ্বশুর-শাশুড়ি গিয়ে বুঝিয়ে নিয়ে আসা। স্বামী রত্নটিও আর করবো না বলে কথা দেয়া, আরো কত কি! তারপর সময় বয়ে গেছে। মেয়েও আস্তে আস্তে বড় হয়েছে, শুধু বদলায়নি স্বামীর স্বভাবটি।এ নিয়ে প্রায়দিনই ঝগড়া, কথা কাটাকাটি লেগেই থাকতো।ওর বর প্রথম দিকে ঝগড়ার সময় গালগালাজ করতো, পরে গায়ে হাত তুলতো। শশুর বাড়ির লোকজন কিছু বলতো না।বরং ঝগড়ার সময় ভাইয়ের বৌরা মজা নিত।শিমুলের শ্বশুর মারা গিয়েছিলেন, এক ভাসুর আর এক দেবর ও তাদের বৌসহ শাশুড়িকে নিয়ে ছিল একান্নবর্তী সংসার।শাশুড়ি যদিও শিমুলকে আদর করতেন, কিন্তু তার কিছুই বলার ছিল না।
এসব কথা আমার শিমুলের কাছ থেকে শোনা।শিমুল যখন তার জীবনের কথা গুলি বলতো আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।মনে হতো আজকের দিনে কীভাবে সম্ভব একজন নারীকে এভাবে নির্যাতন করা তাও কানাডার মতো উন্নত দেশে! প্রায়শ ওকে জিজ্ঞেস করতাম, আচ্ছা শিমুল, কিছু মনে করো না, তোমার স্বামী দুঃচরিত্র, মদ খায় । সবচে বড় কথা তোমাকে মারধর করে। তারপরও তুমি কেন এই সংসারে পড়ে আছো? এমন না যে এদেশে তুমি একা, তোমার মা-বাবা সবাই এখানে আছে । তুমি তো তাদের কাছে গিয়ে থাকতে পারো। (চলবে)

শেয়ার করুন