মুনিয়ার বিয়ে-২

51

শুজা রশীদ
ছেলেপক্ষ এলো শনিবার সন্ধ্যায়। আসবার কথা ছিল আটটার দিকে, তারা এলো কাঁটায় কাঁটায় আটটায়। ছেলের সময় জ্ঞান নাকি সাংঘাতিক। রাব্বি গজরাতে গজরাতে বলল, “বাড়াবাড়ি!”
শিলা প্রচুর রান্না বান্না করেছে। বাড়ি সুন্দর করে সাজিয়েছে। মুনিয়াকে একটা সবুজ শাড়ি পরতে হয়েছে, চুল খোপা করতে হয়েছে। মেকআপ করবার পর তাকে একেবারে মুভির নায়িকাদের মত লাগছে।
রাব্বি ভ্রু কুঁচকে ওকে কয়েকবার দেখেছে। “এতো সুন্দর করে সাজবার কি দরকার ছিল?”
শিলা মুখ ঝামটা দিয়েছে, “ওকে দেখতে আসছে। ও কি ভুত সেজে থাকবে?”
শিলা লীলাকেও দাওয়াত দিয়েছে। মোতালেব পরিবারের সাথে তারই ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তাদেরই একমাত্র ছেলে রাজুর বিয়ের ঘটকালী করছে সে। মোতালেবের স্ত্রী বীনা নাকি এক সময় তার সাথে এক স্কুলেও পড়েছে।
মোতালেবের বয়েস রাব্বির মতই। তবে সে বেশ মুটিয়ে গেছে। তার মাথার চুলও বেশ পড়ে গেছে। রাব্বি এখনও শরীরটাকে মজবুত রেখেছে। পারিবারিক সুত্রে তাদের টাক নেই, ফলে তার মাথা ভর্তি চুল। লিভিংরুমে মুখোমুখি বসে মনে মনে একটু ভালো বোধ করছে রাব্বি। ব্যাটা আকাউন্টেন্ট, খুব ভাব ধরে ইগড চালিয়ে এসেছে, ভেবেছে দোকানদারকে তার জৌলুস দেখিয়ে কাবু করে দেবে। হোদল কোতকোত!
তার স্ত্রী বীনা অবশ্য সুন্দরী এবং খুব হাসি খুশি। তাকে অপছন্দ করবার কিছু নেই। তাদের ছেলেটি খুব ফিটফাট হয়ে এসেছে, কোট-প্যান্ট-টাই, একেবারে সাহেব। তবে দখে ভদ্র সদ্র মনে হচ্ছে। একটু মনে হয় ঘাবড়ে আছে। মুনিয়ার সাথে ‘হাই’ বলেছে, মুরুব্বীদের সালাম দিয়েছে, তারপর থেকে একেবারে চোখ নামিয়ে বসে আছে।
মনে মনে একটু বিরক্ত হচ্ছে রাব্বি। একটু স্মার্টগিরি দেখালে ভালো হত, অপছন্দ করতে কষ্ট করতে হত না। বাক বাকুম করা ছেলেদের একেবারে দু চোক্ষে দেখতে পারে না রাব্বি। লীলা বসে আছে দু’ দলের মাঝখানে একটা গদি মোড়া চেয়ারে। তার সাজগোজ দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের কন্যা যেন সে-ই।
প্রাথমিক আলাপচারীতা শেষ হবার পর দুই পক্ষই একটু চুপ। শুধু মোতালেব রাব্বির দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে সমানে নিঃশব্দে হেসে চলেছে। অসম্ভব বিরক্ত হচ্ছে রাব্বি। ব্যাটা কি চিড়িয়া দেখছে নাকি? তার অস্বস্তি দেখে মোতালেব যেন আরোও আনন্দ পেল। এবার সশব্দে হেসে উঠল সে।
“আমাকে চিনতে পারনি?”
রাব্বি চমকাল। “মানে?”
মোতালেব বলল, “ভালো করে দেখ। প্রায় ছত্রিশ বছর পর দেখা। আমার অনেক চেঞ্জ হয়েছে। তোমাকে দোষ দেই না। তবে তুমি কিন্তু এখনও একদম আগের মতই আছো।” রাব্বি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল। ব্যাটাকে চিনতে না পারার যথেষ্ট কারণ আছে। উনিশ বিশ বছরের মোতালেব ওরফে মতু ছিল হ্যংলা পাতলা, বাবরী চুলো যুবক।
“মতু!”
হা হা করে হাসল মোতালেব। “এই তো চিনেছ। এসো কোলাকুলি করি। এতোদিন পর দেখা।”
মোতালেব দু’ হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছিল, রাব্বি কড়া গলায় বলল, “থামো!”
তার কন্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, সবাই চমকে উঠল। মোতালেবের মুখের হাসি মুছে গেল। রাব্বি তার দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে তীব্র কন্ঠে বলল, “ছত্রিশ বছর কেন, ছত্রিশ হাজার বছর পার হলেও তোমার মত হারামীর সাথে আমি কোলাকুলি করব না। তোমার পরিবার নিয়ে এক্ষুনী আমার বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাও।”
শিলা আর্তচীতকার করে উঠল, “কি বলছ এসব? মুনিয়ার বাবা, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?”
মুনিয়াও বিস্মিত দৃষ্টিতে তার বাবাকে দেখছে। তাকে এইভাবে রাগতে সে কখন দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। রাজু এবং বীনা ও ভড়কে গিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।
লীলা তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল, “হচ্ছে কি এসব? রাব্বি ভাই? এমন করছেন কেন?”
রাব্বি তার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “লীলা ভাবি, দয়া করে এদেরকে নিয়ে এক্ষুনী বিদায় হন। এই লোকটার মুখ আমি আর কখন দেখতে চাই না। বদমাশ। ওর ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেয়াতো দূরে থাক, ও যে শহরে থাকে সেই শহরের ত্রিসীমানায় আমি আমার মেয়েকে যেতে দেব না।”
মোতালেব বিব্রত কন্ঠে বলল, “তুমি এখনও আমার উপর রেগে আছো? কবেকার ঘটনা…”
রাব্বি তার নাকের ডগায় আঙ্গুল নাড়িয়ে বলল, “বেরিয়ে যাও। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাবধানে নামবে। পড়ে টড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙে আমার নামে কেস ঠুকে দেবে, সে সব হবে না।”
শিলা স্বামীর কাণ্ড দেখে একেবারে হতবাক হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে সে এখনই মূর্ছা যাবে। মাথাটা ঘুরছে। এমনিতেই ইদানীং ভার্টিগোর সমস্যা দেখা দিয়েছে। মুনিয়া সময়মত টের পাওয়ায় শিলা মেঝেতে পড়ল না। সে মাকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল শিলার।
শিলার যখন জ্ঞান ফিরল, সে তখন নিজের বছানায় শুয়ে আছে। পাশেই মুনিয়া বসে, মাথায় হাত বুলাচ্ছে। কতক্ষন পেরিয়ে গেছে কে জানে।
“মামনি, এখন ভালো লাগছে?” মুনিয়া উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইল।
“ওরা কি চলে গেছে?” শিলা কাঁতর কন্ঠে জানতে চায়।
মাথা দোলাল মুনিয়া। হ্যাঁ। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল শিলা। “ঐ পাগলটার সাথে আমি জীবনে কথা বলব না।”
রাব্বি কাছেই একটা চেয়ারে উদ্বিগ্ন মুখে বসে ছিল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, মুনিয়া চোখ মটকাল। চেপে গিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল রাব্বি।
শিলা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, “ঐ পাগলটা কেন এমন করল? কিছু বলেছে তোকে?”
মাথা নাড়ল মুনিয়া।
শিলা বিড়বড়িয়ে বলল, “ইচ্ছে করে করেছে। বিয়েটা যেন না হয়। ছিঃ ছিঃ। আমি কাউকে মুখ দেখাব কি করে? লীলা ভাবী আর কখন কোন সম্পর্ক নিয়ে আসবে? তোর এখন কি হবে রে?”
মুনিয়া ফিক করে হেসে ফেলল। “আমি মনে হয় আইবুড়োই থেকে যাবো মামনি।”
শিলা আহত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতে সে দ্রুত সামাল দিল, “ঠাট্টা করছি মামনি!” (চলবে)

শেয়ার করুন