মুনিয়ার বিয়ে

45

শুজা রশীদ
১.
বাসায় ফিরতে ফিরতে মুনিয়ার সাধারণত একটু রাত হয়। নতুন কাজ। বস এক গাদা ডকুমেন্ট ধরিয়ে দিয়েছে। পড়, শেখ। কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন শেষ করার সাথে সাথেই মন্ত্রের মত কাজটা হয়ে গেল। মুনিয়া যতখানি না খুশি হয়েছে তার চেয়ে শত গুন বেশি আনন্দিত হয়েছে তার বাবা-মা। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের মিষ্টি পর্যন্ত খাওয়ানো হয়েছে।
ড্রাইভ ওয়েতে গাড়ি রেখে তর তর করে দোতলায় উঠে এলো মুনিয়া। স্কারবরোর বাঙালি পাড়ায় বাড়ি, নীচতলায় ভাড়াটে, ওপরে থাকে ওরা তিনজন- বাবা রাব্বি, মা শিলা এবং সে। ছোট পরিবার, সুখী পরিবার। মুনিয়ার কাছে চাবি থাকে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই বুঝল ডালমে কুচ কালা হ্যায়। বাপী লিভিং রুমে খবরের কাগজের মধ্যে মাথা গুঁজে পড়ে আছে, মামনি রান্না ঘরে, নিঃশব্দে রান্না করছে। এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। দু’জনের মধ্যে গলায় গলায় ভাব। সারাক্ষণ এটা সেটা নিয়ে খুনসুটি করতেই থাকে। একটা কাপড়ের দোকান আছে রাব্বির, ড্যানফোর্থ রোডের উপরেই। প্রায়ই দেখা যায়, খদ্দের পাতি কম থাকলে সে দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে আসে। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে চা-নাস্তা খায়। মাঝে মাঝে হাঁটতে বের হয়। মুনিয়ার খুব ভালো লাগে। চারদিকে এতো পরিবারে ঘুন ধরতে দেখেছে যে বাবা-মায়ের এই মধুর সম্পর্ক দেখে তার মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু আজ কি হল?
নিজের ঘরে ঢুকে হাতের ব্যাগ বিছানায় ছুড়ে ফেলে লিভিং রুমে চলে এলো। “বাপী! এটা তো দু’দিন আগের কাগজ। আজকের কাগজ আসেনি?”
রাব্বি নীরবে মাথা নাড়ল। হ্যাঁ কি না বোঝা গেল না। “চা খেয়েছ?”
মুনিয়া নরম গলায় জানতে চাইল। ঝগড়া-ঝাটি যদি হয়ে থাকে সেটা মায়ের কাছেই জানা যাবে।
আবার মাথা নাড়ল রাব্বি, খাবে কি খাবে না বোঝা গেল না। মুনিয়া রান্না ঘরে চলে এলো। শিলা এক নজর তাকিয়ে ওকে দেখে আবার রান্নায় মনযোগ দিল। “কাজ কেমন লাগছে?”
“ভালো। ঘটনাটা কি তাই বল? আমাদের বুড়ো খোকা পুরানো কাগজে মুখ গুঁজে বসে আছে কেন?”
সাধারণ ঝগড়া-ঝাটি হলে এই পর্যায়ে ঠোট টিপে হাসত শিলা। আজ তার ব্যতিক্রম হল। মনে মনে প্রমাদ গুনল মুনিয়া।
“সমস্যা তো তোকে নিয়েই হচ্ছে,” শিলা বিড়বিড়িয়ে বলল।
আকাশ থেকে পড়ল মুনিয়া। “কেন? আমি কি করলাম?”
“কিছু করিসনি। করলেই হয়ত ভালো ছিল।”
“মামনি, ব্যাপারটা খুলে বলত। এই রকম রহস্যময় কথাবার্তা আমার ভালো লাগছে না।”
শিলা তরকারীতে লবন চাখছে, মনে হল ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিল। “তোর লীলা আন্টি এসেছিল।”
লীলা আন্টি! মুহূর্তের মধ্যেই সব কিছু পরিস্কার হয়ে গেল মুনিয়ার কাছে। “ঘটক আন্টি কি আবার কোন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল?”
“তোর ঘরে টেবিলে বায়োডাটা আছে।”
“নিশ্চয় তুমি আসতে বলেছ,” মুনিয়া একটু বিরক্ত হয়ে বলে। সে ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার পর থেকেই মা এই ঘটক আন্টির সাথে আঁতাত পাতিয়ে তার জন্য ছেলে খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাপীর রাগের কারণটা এবার বোঝা গেল। সে মেয়ের বিয়ে ঝট করে দিতে চায় না। কষ্ট করে পড়াশুনা করেছে, আগে ক্যারিয়ার গড়–ক, পরে বিয়ে। বিয়ে তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।
শিলা ঝাঁঝের সাথে বলল, “বাপের সাথে আঁতাত করিস না। চারদিকে তাকিয়ে দেখেছিস কত মেয়েরা আইবুড়ো হয়ে বসে আছে, বিয়ে হচ্ছে না। বাপ-মা প্রেম-ট্রেম করতে দেয়নি, কোন ভালো ছেলেও আনতে পারেনি, মেয়েগুলো চাকরি করছে আর বুড়ি হচ্ছে। আমার মেয়েকে আমি সেরকম হতে দেব না।” শেষে উক্তিটুকু গলা বাড়িয়ে লিভিংরুম উপলক্ষে ছুড়ে দেয়া।
“অল্প বয়সে বিয়ে করে নিজের সত্ত্বা বিকিয়ে দেবার চেয়ে আইবুড়ি থাকাও ভালো,” রাব্বিও গলা উঁচিয়ে জবাব দিল।
“দেখেছিস কি ধরনের কথা বলে? ওর কোন কা জ্ঞান আছে?” শিলা মুনিয়ার কাছেই বিচার দিল।
মুনিয়া জানে তার মাকে বোঝাতে গেলে দশ কথা শুনতে হবে। মেয়ে আইবুড়ো থাকবে এই ভয়ে বহুদিন ধরেই শিলার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সে নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে বায়োডাটাটা হাতে নিয়ে লিভিংরুমে চলে এলো। বাবার পাশে বসে দ্রæত চোখ বোলাল। ছেলেটারও কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড। একটা ব্যাংকে প্রোগ্রামার এনালিস্ট হিসাবে কাজ করছে। বছর তিনেক। যার অর্থ সামান্য বড় মুনিয়া চেয়ে। দেখতে-টেখতে ভালোই। পছন্দ না হবার মত না। পরিবারও ভালো। টরন্টোতে রিচমন্ড হিলে বাড়ি। বাবা একাউন্টেন্ট। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অনেকেই খুব শিক্ষিত, কয়েকজন দেশে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সব দিক দিয়েই সোনায় সোহাগা। এত দিন ঘটক আন্টি যে ধরনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে সেগুলোর চেয়ে অনেক ভালো। এটাকে কাটানো সমস্যা হবে।
রাব্বি খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “কি দেখছিস এতো?”
মুনিয়া মুখ বাঁকাল। “কোথা থেকে যে এইসব নিয়ে আসে লীলা আন্টি। সময় নষ্ট।” বায়োডাটাটা হেলায় সোফার উপর ছুড়ে দেয় সে।
রাব্বির মুখে হাসি ফুটল। “তোর মাকে তো বোঝানো যায় না। যাকে দেখেই তাকেই পছন্দ। মন দিয়ে চাকরি কর। ঈঊঙ হবি একদিন।”
মাথা দোলাল মুনিয়া। “ঠিকই বলেছ বাবা। এই সব বিয়ে টিয়ে করে জীবন বরবাদ করার কোন মানে হয়?”
রান্না ঘর থেকে শিলা খুন্তি হাতে ছুটে এলো। “কি বললি?”
রাব্বি বলল, “যা সত্য তাই বলেছে। আমার মেয়েটা তোমার কি সমস্যা করছে যে তুমি তাকে বিদায় দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ?”
শিলা ভ্রæ কুঁচকে তাকাল। “মেয়ে তোমার একার? আমি ওকে পেটে ধরিনি? বড় করিনি? বিয়ে হলেই দূরে চলে যাবে কেন? কাছাকাছি বিয়ে দেব।”
রাব্বি খবরের কাগজে ফিরে গেল। “ও এখন বিয়ে করবে না।”
মেয়ের দিকে তাকাল শিলা। “তুই বলেছিস এই কথা?”
বড় করে মাথা নাড়ল মুনিয়া। রাব্বি কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকাতেই মাথা নাড়ানোর দিক বদলে উপরে নিচে করতে লাগল। শিলা ধমকে উঠল। “একবার মাথা নাড়ছিস, আরেকবার দোলাচ্ছিস- হ্যাঁ কি না সেটা পরিস্কার করে বল।”
বিপদে পড়ে গেল মুনিয়া। বাবা-মা দু’জনাই বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ইতস্তত করে বলল, “তেমন ভালো ছেলেটেলে তো পাওয়া যাচ্ছে না…”
শিলা দ্রæত বলল, “এই ছেলেটার কি সমস্যা? সব দিক দিয়ে ভালো। দেখতে ভালো, ভালো কাজ করে, ফ্যামিলি ভালো, কাছাকাছি থাকে- আর কি ভালো হতে হবে? নাকি তোর কেউ আছে? কখন তো কিছু বলিসনি।”
রাব্বি কাগজ নামিয়ে রেখে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে। মুনিয়া হেসে ফেলল। “কি যা তা বলছ, মামনি?”
শিলা চেপে ধরল। “পরিস্কার করে বল তোর পছন্দের কেউ আছে কি নেই?”
“নেই। বললাম তো।” মুনিয়া বিরক্ত হবার চেষ্টা করে। রাব্বির মুখে হাসি ফিরে এসেছে, দৃষ্টি নমনীয় হয়েছে।
শিলা বলল, “জানতাম। তবুও তোর মুখ থেকেই শুনে নিলাম। এই বায়োডাটাটা আমার ভালো লেগেছে। দেখতে তো ক্ষতি নেই। ওরা এই শনিবারে আসবে তোকে দেখতে।”
মুনিয়া নার্ভাস ভঙ্গীতে বাবার দিকে তাকাল। “এই শনিবার? বাপী?”
গররর করে বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা বলল রাব্বি। এবার পরিস্কার হল তার রাগ করবার আসল কারণ। কাগজের পেছনে মুখ ঢাকল আবার।
শিলা বলল, “আচ্ছা, দেখতে এলেই কি বিয়ে হয়ে যায়? দেখতে তো ক্ষতি নেই। তারা আসুক। পরিচয় হোক। ছেলেমেয়েতে দেখা হোক। যদি ওদের পরস্পরকে পছন্দ হয় তার পরে না অন্য আলাপ। তোর বাবাকে এটা বোঝানো যায় না। আমার উপর খামাখা গাল ফুলিয়ে আছে।”
রাব্বি চাঁপা গলায় বলল, “চন্ডালিনী!”
শিলা খুন্তি হাতে এক পা এগিয়ে এলো, “আবার বললে দেব একটা বাড়ি!” (চলবে)

শেয়ার করুন