ময়নার জিজ্ঞাসা (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

8

মামুন খান
পার্টি অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে যায় হামিদা বানুর। মানসিক আর শারীরিক দু’ দিক থেকেই বিধ্বস্ত সে আজ। শেষতক জেরিন তার সর্বনাশ করেই ছাঁড়ল। মেজাজটা চড়ে আছে একেবারে তাল গাছের আগায়। মাথাটাও কেমন যেন ঘুরছে চর্কির মত। প্রেসার বেড়ে গেল কি না কে জানে। বড় মেয়ের জামাই গেল বার সিঙ্গাপুর থেকে প্রেসার মাপার মেশিন এনে দিয়েছিল। হামিদা বানু নিজে জানে না জিনিসটা কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। তবে শিউলিমালা জানে। প্রেসার মাপার উদ্দেশ্যে কন্যার ঘরে উঁকি মারে নেত্রী। খাটের ওপর মুখ গোমরা করে বসে আছে শিউলি।
“কি রে, কি হয়েছে? মুখ গোমরা করে বসে আছিস ক্যান”? মেয়েকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে হামিদা বানু।
“দ্যাখো না মা, আমার নেকলেসটা পাওয়া যাচ্ছে না”। ন্যাকা ন্যাকা আহল্লাদি স্বরে জবাব দেয় শিউলি। মেয়েটার চোখে মুখে ঝড়ের পূর্বাভাস। যে কোন সময় কান্না করে দেবে সে।
“কোন নেকলেস”? বুঝতে না পেরে পাল্টা প্রশ্ন করে জননী।
“ঐ যে- কালকে- ইয়ে–”, নেকলাসটা যে তার হবু স্বামীর দেওয়া, আর হবু স্বামীর নাম বলাটা যে কিঞ্চিত লজ্জাস্কর, এ কথা নেকলেস হারানোর কষ্টের মাঝেও বেমালুম ভুলে যায়নি শিউলিমালা। তাই ‘কোন নেকলেস?’, মায়ের এই প্রশ্নের জবাবে কিছুটা ইতস্ততঃ ভাব, আর খানিকটা আকার ইঙ্গিতের আশ্রয় নেয় সে। তবে চেহারার এই কাঁদলাম, কাঁদলাম কিন্তু মার্কা আহ্লাদী ভাবটা আগের মতই বজায় থাকে।
“বলিসকি? কোথায় রেখেছিলি? ভাল করে খোঁজ করেছিস”? উদ্বেগ প্রকাশ করে নেত্রী।
“হ্যাঁ, সব জায়গাতেই খুঁজেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে জিনিসটা বের করেছিলাম, তারপর-“উম ম ম”, একটু থেমে সকালের ঘটনা ইয়াদ করার প্রয়াস চালায় শিউলি।
“উম ম তারপর ময়না আ”
“ময়না? ময়না কি”? কন্যার অসমাপ্ত স্মৃতিচারণকে পরিণতির দিকে ঠেলতে চায় হামিদা বানু।
“আমি যখন বাথরুম থেকে আসলাম তখন দেখলাম ময়না হারটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।”
“ও বুঝেছি, হারামজাদি চোরণীরই কাজ এটা। কোথায়, হারামজাদিটা কোথায়? ময়না, এই ময়না”।
শিউলিমালার ঘর থেকে হুঙ্কার দিতে দিতে রান্নাঘরের দিকে যাত্রা করে নেত্রী। মেজাজ তার এখন দুই তাল গাছ সমান চড়ে গেছে।
সারাদিন আজকে রান্নার কোন ঝামেলা ছিল না। গতরাতের পোলাও আর গোশত দিয়ে দিনের খাবার কার্যক্রম সারা হয়েছে। ময়নার বরাতেও সাঁঝের বেলায় চারটে পোলাও আর এক টুকরা গোশত জুটেছিল। পোলাওয়ের স্বাদটা এখনও জিবে লেগে আছে। ঢেঁকুর দিলে পোলাও, পোলাও গন্ধটা নাকের মধ্যে এসে ধাক্কা মারে। পেট অবশ্য পুরোটা ভরেনি ময়নার। আর ‘দু’গা’ হলে পুষিয়ে যেত। পেট ভরা থাকলে নাভির চারপাশের সেই চিনচিনে বেদনাটাও থাকে না। তরকারি কুটছিল ময়না। আচমকা বেগম সাহেবার উত্তেজিত কণ্ঠ নিঃসৃত ময়না ডাক শুনতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তরকারি কুটা স্থগিত রেখে উঠে দাঁড়ায় সে। প্রায় সাথে সাথেই ঝড়ের বেগে হামিদাবানু রান্নাঘরে হাজির হয়। পেছনে পেছনে কন্যা শিউলিমালা।
“হার কোথায় রেখেছিস”? চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে গৃহকত্রী হামিদাবানু। প্রশ্নটা ঠিক ঠাহর করতে পারে না ময়না। কাচুমাচু হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বেগম সাহেবার দিকে তাকাতেই শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায় তার। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পায় কন্ঠ একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।
“কত্ত বড় সাহস হারামজাদীর। চোরনির ঘরের চোরনি শিগগির বল হার চুরি করে কোথায় রেখেছিস”?
এবারে কিছুটা বুঝতে পারে ময়না। ঘরের ভেতর থেকে কোন জিনিস চুরি গেছে, আর বেগম সাহেবার ধারণা জিনিসটা সেই চুরি করেছে।
“আ আমি কিছু চুরি করি নাই গো আম্মা”, শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে ফ্যাসফ্যাস করে কোনমতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ময়না।
“নিস নাই, না? ফের মিথ্যা কথা”, বা হাত দিয়ে আসামীর চুলের মুঠি ধরে ডান হাত দিয়ে ঠাস একটা চড় বসায় হামিদাবানু। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে ময়না।
“আমি কিচ্ছু চুরি করি নাই গো আম্মা বিশ্বাস করেন,” নতজানু হয়ে দুই হাত দিয়ে বেগম সাহেবার পা জড়িয়ে ধরতে উদ্দত হয় ময়না। কিন্ত হামিদাবানুর হাতের মুঠায় চুল আটকা থাকায় পদ মোবারক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
ক্রন্দনরত নতজানু ময়নাকে দেখে ক্ষণিকের জন্য সমস্ত দিনের অপমান আর গøানির জঞ্জাল সিনেমার ফ্লাশ ব্যাকের মত ভেসে ওঠে নেত্রী হামিদাবানুর অক্ষিপটে। সম্মুখে হাতজোড়, আর ক্রন্দনরত শিশুটি আর তখন শিশু থাকে না, হয়ে যায় ছেনাল মাগী, মক্ষীরানী- মিস জেরিন।
ইসসিরে এমনি করে যদি ঐ ‘ইয়েটা’ তার পায়ের তলে উপুড় হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করত! কল্পনার মানসপটে নতজানু মিস জেরিনের আবির্ভাব হওয়াতে হামিদাবানুর উত্তেজনা শতগুণে বেড়ে যায়। বা হাতে চুলের মুঠি ধরা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনে বায়ে, সামনে পেছনে তাকিয়ে লাঠি সোটা জাতীয় কিছু একটা খুঁজতে থাকে সে। পেয়েও যায়, দরজা আটকানোর কাঠের ডাসা। এবারে ময়নার চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে, দুই হাতে শক্ত করে ডাসাটা ধরে ময়নার পিঠ বরাবর আঘাত করতে উদ্দত হয়। সেই সাথে গলগল করে এক গাদা খিস্তি খেউড় বেরিয়ে আসে। মেঝেতে ধপাস করে পরে যায় ময়না। লাঠির আঘাতের আলামত টের পেয়ে যুগপৎ বাম হাত মেঝেতে ঠেকিয়ে শরীরের ভার সামলায়, আর অন্য হাতে শুন্যে ভেসে আসা লাঠির আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার বৃথা চেষ্টা চালায় ময়না। হাউমাউ করে কেঁদে আকুতি জানায় সে, “আমারে আর মাইরেননা গো আম্মা, আমি কিছু চুরি করি নাই। ও আফা আমারে বাঁচান। আমারে মাইরা ফালাইল, আমারে বাঁচান”।
কোন সাহায্য আসে না অদূরে দন্ডায়মান শিউলিমালার কাছ থেকে। জেরিনের ওপর প্রতিশোধ নেবার পরম আনন্দে, উত্তেজনার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে ততক্ষণে নেত্রী হামিদাবানু। আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য করুণ আর্তি জানাতে থাকে ময়না। সেই সাথে কাত হয়ে বসা অবস্থাতেই এক হাতে ভর করে ছেঁচড়িয়ে ছেঁচড়িয়ে পেছাতে থাকে। কিন্তু উপুর্যুপুরি আঘাত আসায় ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না। পাশেই দাঁর করিয়ে রাখা তরকারি কোটার ধারালো বটিটায় বা হাতের কব্জি কচাৎ করে আটকে যায়। পরক্ষণেই চিরিক দিয়ে রক্ত ছোটা শুরু হয়। অক্ষত হাত দিয়ে, কাটা হাত টা চেপে ধরে মেঝেতে গড়িয়ে পরে ময়না।
রক্ত দেখে কিছুটা স্তিমিত হয় হামিদাবানু। পাশ থেকে শিউলিমালাও এবারে জননীকে রণে ভঙ্গ দেবার অনুরোধ জানাতে থাকে।
শোবার ঘরে রেখে আসা হামিদা বানুর মুঠো ফোন থেকে ক্রমাগত রিং বাজার শব্দ শুনে মায়ের শোবার ঘরের উদ্দেশ্যে দৌড় দেয় শিউলি। কন্যার অনুরোধে হোক আর ফোনের শব্দেই হোক আপাতত রণে ভঙ্গ দেয় হামিদাবানু। এখন বেশ তৃপ্তি বোধ করছে সে।
“আম্মু তোমার ফোন, থানা থেকে”, মায়ের দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয় শিউলিমালা।
কপাল কুচকায় নেত্রী। সেই সাথে স্বগোতক্তি করে বলে, “থানা থেকে আবার কি চায়”? হাতের লাঠি খটাং করে মেঝেতে ফেলে ফোন হাতে নেয় হামিদা বানু, আর মেয়েকে ইশারায় রান্না ঘরের বাতি অফ করতে বলে। জননীর আদেশে রান্না ঘরের লাইট বন্ধ করে মায়ের পিছে পিছে ড্রইং রুমের দিকে পা বাড়ায় শিউলিমালা। তবে আসার আগে বাইরে থেকে রান্না ঘরের শেকল টেনে দিতে ভুল করে না সে। সাবধানের মাইর নেই, যদি নেকলেসটা আদায় হবার আগেই ময়না পালিয়ে যায়।
“হ্যালো, মিস হামিদা বানু বলছি” ফোন কর্তাকে নিজের উপস্থিতি জানায় হামিদা বানু।
অন্য প্রান্তে কি কথা হচ্ছে তা শুনতে পায় না শিউলি। তবে এই প্রান্তে জননীর কুচকানো কপাল, উদ্বিগ্ন মুখাবয়ব, হু হা, আচ্ছা ঠিক আছে জাতীয় সংক্ষিপ্ত বাক্যালাপে অশুভ কোন ঘটনার আলামত টের পায় সে। মায়ের দূরালাপনি শেষ হতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় শিউলি।
“তোর ভাইয়াকে থানায় ধরে নিয়ে গেছে। ওসি সাহেব ফোন করেছিল। কি কারণ তা বিস্তারিত জানায়নি”। কথা অসম্পূর্ণ রেখেই ধপাস করে সোফায় বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে হামিদা বানু।
“আমার হাত পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে রে। তোর আব্বু যদি এসময় থাকত। তার ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর যে কবে শেষ হবে তা আল্লাহ্ই ভাল জানে”।
“এখন কি হবে আম্মু”?
“কী আর হবে থানায় গিয়ে ছুটিয়ে আনতে হবে। ড্রাইভার, এই ড্রাইভার”। শোফায় বসা থেকে হাঁক ছাড়ে হামিদা বানু। এই ড্রাইভার ব্যাটার নামটা তার কিছুতেই মনে থাকে না। অবশ্য প্রতি মাসে একজন করে ড্রাইভার বদলি হলে নাম মনে না থাকারই কথা। আরো দুই বার হাঁক ছাড়ে সে, ড্রাইভার, ঐ ড্রাইভার বলে। প্রতিউত্তর না পেয়ে নিজেই এগিয়ে যায় ড্রাইভারের খোঁজে।
হামিদা বানু আর শিউলিমালা চলে যাবার পরও অনেকক্ষণ জবাই করা মুরগীর মত যন্ত্রনায় মেঝেতে ছটফট করে ময়না। আষাঢ় মাসের বানের পানির মত কলকলিয়ে রক্ত ছুটছে কাটা হাত থেকে। অক্ষত হাত দিয়ে ক্ষত হাতটাকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো। পিঠের নীচটা কেমন যেন ভেজা, ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে লাগছে। মাদুরটা বেছাতে পারলে, সেই সাথে ছেড়া কাঁথাটা গায়ে জড়াতে পারলে মন্দ হত না। পিয়াস লেগেছে তার খুব। এক মগ ঠাণ্ডা পানি যদি পাওয়া যেত! মাথাসহ শরীরের উপরিভাগ দিয়ে জোর খাটিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে ময়না। কিন্তু পারে না। খানিক বিরতি দিয়ে আবার চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর মাথাটা সামান্য উঁচু করতে পারে মাত্র। এটুকু করেই হাফিয়ে উঠে সে। জানালার ফাঁক গলে রাস্তার বিজলি বাতি থেকে ঠিকরে আসা আলোকরশ্মি এতক্ষণ ঘরটাকে আলোকিত করে রেখেছিল। সেই আলোও ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসছে। হাতের টনটনে ব্যথাটা খুব একটা বোধ হচ্ছে না। তবে প্রচন্ড শীত লাগছে ময়নার। একটা কাঁথা যদি গায়ের ওপর কেউ দিয়ে দিত! হঠাৎই মায়ের কথা মনে পড়ে তার। মা’টা যে আচানক কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেল তা আজও বোধে আসে না। সদরঘাট বস্তির সেই ঘুপচি ঘরে তাকে ঘুমে রেখে নিত্যিদিন মা তার বাইরে যেত। ফিরত সেই সাঁঝের কালে। সঙ্গে থাকত একথালা ভাত, কিনারে ঘৎসামান্য সালুন। কোনদিন শাকপাতা, কচু ঘেচু, কোনদিন মাছের কাটাকুটি, কোনদিন বা গোশতের হাড়গোড়। মা বেটিতে মিলে, মাচানের ওপর বসে খুব আয়েশ করে সেই ভাত দুটো খেয়ে নিত। থালার কোনায় সামান্য একটু সালুন মাখা ভাত থেকেও যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে ময়না সেই ভাত দিয়ে উদর আংশিক পুর্ণ করত। তারপর সারাটা দিন মন্দ কাটত না তার। কখনো চৌকাঠের ওপর উদাস হয়ে বসে থেকে, কখনো পাশের ঘরের আম্বিইয়া খালার দুধের বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আঁদর করে কেটে যেত একরকম। আম্বিয়া খালা তাকে ‘মোহাব্বত’ করত বেশ। মোয়াটা, কি মুডড়টা, কি খোশবু ওয়ালা বিস্কুটটা, মোটের ওপর প্রতিদিন কিছু না কিছু জুটে যেত আম্বিয়া খালার কাছ থেকে। দেখতে দেখতে বেলা পরে আসত। কখনো দেরি হলে, ময়না তার তেলচিটে বালিশের তলা থেকে সযতেœ রাখা আদর্শীলিপি বইটা বের করে পাতা উলটিয়ে দেখত। এই বইটা তাকে দিয়েছিল ‘সোন্দর’ মত এক মাস্টারনী ‘আফা’।
মাস্টারণী ‘আফা’ তার হাতে বইটা দিয়ে বলেছিল, “এই মেয়ে তোমার নাম কি”?
“ময়না”।
“বাহ খুব সুন্দর নাম। বয়স কত”?
বয়সের ব্যাপারটা ময়না ঠিক বোঝে না। তাই হা করে তাকিয়েছিল সে। মাস্টারনি ‘আফা’ সেদিন আরো অনেক সুন্দর সুন্দর কথা তাকে বলেছিল, কিন্তু এখন মনে পরছে না তার। তবে ঐ সুন্দর মত মহিলা যে তাকে বারবার ইস্কুলে যেতে বলেছিল, এ ব্যাপারটা তার স্পষ্ট মনে আছে। স্কুলে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি ময়নার।
সেদিনের কথা পরিষ্কার মনে আছে ময়নার। সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি। শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছিল। সারাদিন কাঁথা মুরি দিয়ে শুয়েছিল সে। এমনকি আম্বিয়া খালার ঘরেও যায়নি। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামল। মায়ের অপেক্ষায় আছে ময়না, মা আসে না। সাঁঝ গডড়য়ে নিশী গভীর হয়। অপেক্ষা করতে করতে একসময় দুচোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে। পরদিন সকালে আম্বিয়া খালা এসে ঘুম ভাঙ্গায়।
“আলো ময়না, তর মায় কুনে? রাইতে আহে নাই”?
?শায়া থেকে উঠে বসে ডাইনে বায়ে মাথা নাড়ে ময়না।
“কস কি! কিছু খাইছস”?
“আইচ্ছা নু যাই, আমার ঘরে যাই। দুগা পান্তা আছে। খাইয়্যা নে”।
?গাগ্রাসে পাস্তা টুকু খেয়ে আবারও অপেক্ষা করতে থাকে সে। একদিন, দুই দিন, তিন দিন কাটল তার এভাবে, আম্বিয়ার আশ্রয়ে। চতুর্থ দিনের মাথায়, আন্বিয়ার হাত ধরে এই বাডড়তে এসে হাজির হল ময়না।
চলে যাবার আগে ময়নার বুকে, মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে আঁদর করে বলেছিল আম্বিয়া খালা,
“এইহানে থাক, খাওয়া পরার অবাব অইব না। এরা খুব বালা মানুষ। ঠিক মত থাহিস। তর মায় আই লেই আমি খবর দিমু”।
এরা কি ‘বালা’ মানুষ? বুঝতে পারে না ঠিক ময়না। বালা মানুষ হলে বিনা দোষে এইভাবে কেউ মারতে পারত? হারটা সে সকালে একবার হাত দিয়ে ছুঁয়েছিল ঠিকই.। কিন্ত চুরি করেনি। হার চুরি করে লাভ কি তার? যখন ভীষণ খিদা পায়, নাভির চারধারে বেদনাটা যখন চিনচিন করে ওঠে তখন একটু কিছু মুখে দিলে খুব আরাম লাগে। সোনার হারতো আর মুখে দেওয়া যায় না। নিশুতি রাতে, চারিধার যখন ঝুম অন্ধকার, ছেড়া কাঁথার ফাঁক গলে শিশ কেটে টালকা বাতাস যখন চামড়া ভেদ করে হাড়ে হাড়ে কাঁপন লাগায়, তখন মনে হয় মায়ের ‘গতর’ থেকে যদি একটু ওম নেওয়া যেত, আর সেই সাথে টকটক, ঘামঘাম গন্ধটা। সোনার হার জডড়য়ে শুয়ে থাকলে কি মায়ের শরীরের ওম আর গন্ধটা পাবে সে?
“এইখানকার মানুষ গুহল্যান এত ফাষান ক্যান”? মায়ের মুখে একবার ‘ফরি’ (পরী) না কি ফেরেস্তার ‘হাস্তর’ শুনেছিল ময়না। হয়ত বা ‘ফরিই’ হবে। বড় বড় ডানা ওয়ালা পরী। দুনিয়ার মানুষের যখন খুব কষ্ট হয়, তখন আসমান থেকে পরী নেমে আসে। আসমানের পরী জমিনে নেমে এসে মানুষটাকে নিয়? আবার আসমানে উড়াল দেয়। ইসসিরে, আসত যদি এখন একটা ‘ফরি’ নেমে। তার যে ভীষণ কষ্ট। ‘ফরি’ টা তাকে ডানায় চাপিয়ে উডড়য়ে নিয়ে যেত অন্য কোন ‘দুইন্যায়’। যেই ‘দুইন্যার’ মানুষ ‘গুইল্যান’ এত ‘ফাষান’ না। সে দুনিয়ায় কোন কষ্ট নেই। কোন দুঃখ নেই।
খুব বেশী কিছু তো চায় না ময়না। দু বেলা দু’মুঠো আহার। পোলাও, গোশতের দরকার নেই। পানি-পান্তা, সাথে কচু-ঘেচু। তা না হলে একটু কাচা মরিচ, আর নুনের ছিটা। পরণের কাপড়টা কোনরকম হলেই চলবে। ঘুমানোর জন্য লেপ তোষক আর পাকা মেঝের দরকার নেই। শুধু মায়ের শরীরের ওম আর টকটক, ঘামঘাম গন্ধটা হলেই চলবে। আর সকাল, বিকাল, কি সাঁঝের বেলা যখনই সুযোগ হয় মাস্টারণী ‘আফার’ দেওয়া অ, আ, ই, উ বইটা সুর করে পড়া। ব্যাস, ব্যাস আর কোন চাওয়া নেই ময়নার। আসবে নাকি আসমানের ফেরেস্তা তাকে ডানায় তুলে নিতে?
“আয়, আয়——‘ফরি’ আয়, আসমানের ‘ফরি’ জমিনে আয়। জানালার ফাঁক গলে আলোক রশ্মি তীরের মত এসে বিঁধে ময়নার অক্ষিকোটরে। সেই আলোক রশ্মির উৎসেরও অনেক পেছনে এক অসীম শূন্যতা। অসীম শূন্যতার গাড় অন্ধকার বুক চিরে হঠাৎই উদয় হয় বিশাল দুই ডানা ওয়ালা একটা কিছু।
ওইতো আসছে, ময়নার দিকেই আসছে। আয় আয় আয় ‘ফরি’ আয়। ডানাওয়ালা সেই পরী যতই তার দিকে আসতে থাকে, আলোর তেজ যেন ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। যন্ত্রণা হচ্ছে ময়নার, ভীষণ যন্ত্রণা। তা যন্ত্রণা একটু হলোই বা, তবুও সে চোখের পাতা বন্ধ করবে না। দু’চোখ ভরে দেখতে চায় সে পরীটাকে। এই বিশাল ডানাওয়ালা পরীই যে তাকে নিয়ে যাবে শান্তির সেই দুনিয়ায়। যত কষ্টতো এই দুনিয়ায়। আজকেই, এখনই, এই মুহুর্তেই সব কষ্টের পরিসমান্তি। তারপর? শান্তি, শুধুই শান্তি, সীমাহীন শান্তি।
খুব কাছে এসে পড়েছে পরীটা খুউব কাছে। এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। কাল বিলম্ব করে না ময়না। দু হাত বাডড়য়ে বুকে জডড়য়ে ধরে সে, আসমান থেকে ভানা মেলে উড়ে আসা শান্তির পরীটাকে।
?কাতোয়ালী থানার ওসি হরিপদ দাস বছর দুই আগে উথুলিয়া থানা থেকে বদলি হয়ে কোতোয়ালী থানায় এসেছে। এই সরকারের দুই বছর সময় কালে শুধু ঢাকা শহরই না, সমস্ত বাংলাদেশের থানাপতিরা অন্ততঃ চারবার, আবার কেউ কেউ আধ ডজন বার পর্যন্ত বদলির হুকুম পেয়ে গেছে। কিন্তু ওসি হরিপদ যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। হরিপদ যে বহুত এলেমদার পুলিশ অফিসার, সে সম্পর্কে হামিদাবানু আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। কাজেই ছেলের এ্যারেস্টের খবরে ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হলেও বাইরে একেবারে শ্বাপদ শীতল ভাব দেখানোর প্রয়াস চালাচ্ছে সে।
সময়টা তার এমনিতেই খারাপ যাচ্ছে। ওসির মুখ থেকে ঘটনা যা শোনা গেল তার সারমর্ম হচ্ছে যে, বাদামতলীর
?কান এক চালের আড়তের পেছনে অনেক দিন ধরেই ইয়াবা সহ অন্যান্য মাদক দ্রব্যের রমরমা ব্যবসা চলে আসছিল। সরকারের ইচ্ছা ছিল না তাই পুলিশ এ ব্যাপারে খুব একটা গা করেনি। কিন্ত এখন সরকারের টালমাল অবস্থা। নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর সময় এখন না। ঘটনার বয়ান হামিদাবানুর উদ্দেশ্য হলেও, ওসি হরিপদর দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছিল মায়ের পাশে বসা অষ্টাদশী শিউলিমালার দিকে। ব্যাপারটা হামিদাবানুর দৃষ্টি এড়ায় না। হরিপদ দারোগার যে অল্পস্বল্প না, বেশ ভাল রকমের আলুর দোষ আছে সে সম্পর্কে হামিদাবানু পুর্বজ্ঞাত। আর সে জন্যই থানায় আসার সময়, শিউলিমালা যখন আগ বাডড়য়ে বলল, “মা আমি তোমার সাথে আসি”? তখন আপত্তি জানায়নি সে- যে রোগের যে দাওয়াই।
“তা মনে করেন যে, আখড়া রেইড দেওয়ার পর গনিমতের মাল সহ মোট সতের জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অবশ্য এদের মধ্যে আপনার ছেলের নাম নাই। হে হে হে——-“, হরিপদ দাস দুই হাত কচলাতে কচলাতে একবার হামিদা বানুর দিকে আরেকবার শিউলিমালার দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার হাত কচলাতে কচলাতে শুরু করে হরিপদ দারোগা, “ মনে করেন যে, আপনি নিজেদের লোক। কিন্ত ধরেন বিনা নির্বাচনের সরকার, তার উপর টালমাল অবস্থা। চারিদিকে ক্রস ফায়ার, হয় জংগী আর না হয় বাবা ব্যবসায়ী। সেইম স্ক্রিপ্ট, বুঝলেন না, সময় খুব খারাপ”।
“তুই ব্যাটা আধ পয়সার বিষ্ঠা খোর পুলিশ অফিসার। তুই সরকারের কি বুঝিস? তোর কাজ হচ্ছে দিন রাত বিষ্ঠা খাওয়া। আসলেই সময়টা খারাপ”, মনে মনে ভাবে নেত্রী। তা না হলে হরিপদ দারোগা তার সামনে হাত কচলায় টাকার জন্য?
রাগে গা জ্বলে হামিদা বানুর, “হারামজাদা হরিপদ দাস, তোর পশ্চাদদেশ উদাম করে, ঠাস, ঠাস দু’ঘা সিঙ্গাপুরি রাংতা বসানি, আর তার উপর আধা কেজি নুনের ছিটা দিতে পারলে দিলটায় একটু শান্তি মিলত”।
কিন্ত মনের জ্বালা, সাত জমিন নীচে জেনদা দাফন কনে হাস্য বদনে বলতে শুরু করে হামিদাবানু, “ওসি সাহেব, সেই যৌবনকাল থেকে ‘রাজনীতিক’ করে আসছি আমি। অত্র এলাকার আমিতো একজন ‘দাযড়ত্ব’ নাকি? ওসির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে কোনরকম বিরতি না দিয়েই আবারও বলতে থাকে নেত্রী, “রাজনীতিক করলে, এলাকাবাসির দেখভাল করতে গেলে পদে পদে শত্রু তৈরী হয়। আমার ছেলে সোনার টুকরা ছেলে। আমার বিরুদ্ধে আমার প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্রের নীল নক্সা তৈরী করেছে। তার অংশ হেসাবেই আমার ছেলেকে ——“, কথা অসমাপ্ত রেখে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পলিখিনে মোড়া এক বান্ডিল নোট বের করে টেবিলের ওপর রাখে হামিদাবানু।
আর মনে মনে বলে, “খা বিষ্ঠা খোর, খা। তোর জন্য ব্যাগে করে বিষ্ঠা নিয়েই এসেছি”।
চিলের মত ছোঁ মেরে বান্ডিলটা তুলে নিয়ে বসা অবস্থায় ঈষত কাত হয়ে প্যান্টের পকেটে চালান দিয়ে দেয় হরিপদ দারোগা। সেই সাথে হাত কচলানোও বন্ধ হয়ে যায়। পরমুহূর্তে কিছু একটা মনে পরার ভঙ্গিতে বলে, “ও ভাল কথা, মিস বানু। যে লোকটা মাদক বিক্রি করত তার কাছ থেকে একটা জিনিস পাওয়া গেছে। জিনিসটা নাকি আপনার ছেলে ওকে দিয়েছে বকেয়া শোধ বাবদ”।
ড্রয়ার খুলে ডায়মন্ড বসানো নেকলেসটা হামিদাবানুর সামনে দোকানদারের মত মেলে ধরে হরিপদ, “দেখেনতো, জিনিসটা আপনার কিনা”?
?চাখের সামনে প্রিয়তমের দেওয়া উপহারটা জ্বলজ্বল করতে দেখে উত্তেজনায় জিনিসটার মালিকানা দাবি করতে উদ্দত হয় শিউলিমালা। কিন্তু পরমুহূর্তে উরুর ওপর জননীর হাতের চাপে কিছু বলতে গিয়েও বলে না সে।
“না না ওসি সাহেব। আমার এ ধরণের কোন হার নেই। আর আমার ছেলে এ জিনিস পাবে কোথা থেকে”?
হামিদাবানু হারটার মালিকানা স্বীকার না করায় যারপরনাই খুশী হয় হরিপদ দারোগা। আজকের দিনটা তার মন্দ গেল না। অবশ্য মন্দ দিন তার কোনদিনই যায় না।
?ছলেকে নিয়ে ঘরে ফেরার পর ময়নার কথা মনে পরে হামিদা বানুর। ‘ছেমড়িটাকে’ এভাবে মারা উচিৎ হয়নি তার। মেয়েটার হাতও কেটে গিয়েছিল বোধহয় একটু। এখন কি অবস্থায় আছে তা দেখবার জন্য ময়নাকে ডাক দেয়, “ময়না, ও ময়না”।
দু ‘তিন বার ডাকার পর কোন সাড়া না পেয়ে ধুপধাপ দৌড়ে গিয়ে শেকল খুলে রান্না ঘরে প্রবেশ করে হামিদাবানু। ঘরময় গাঢ? অন্ধকার। দেয়াল হাতড়ে বাতি জ্বালিয়ে মেঝেতে তাকাতেই আঁতকে ওঠে সে। পুরোটা মেঝে রক্তে রক্তে সয়লাব। ঘরের ঠিক মাঝখানে উত্তর দিকে শিয়র রেখে সটান চিৎ হয়ে পরে আছে ময়নার হাড্ডিসার ছোট্ট দেহখানা। হাতদুটো বুকের ওপর আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে ভাঁজ করা, বুকের পাঁজর ওঠানামার কোন লক্ষণ নেই। মায়া হরিনীর মত চোখ দুটো পুরোপুরি খোলা। সেই চোখের দু’কোন থেকে শুকিয়ে যাওয়া নদীর গতি পথের মত কালসে একটা দাগ দু’কপোল বেয়ে ওষ্ঠ প্রান্তে এসে থেমে গেছে।
শাযড়ত ময়নার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকে হামিদাবানু, “ময়না, ও ময়না”। কোন সাড়া নেই। এবারে দু বাহু স্পর্শ করে মুদু ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকে, “ময়না, ময়না”।
ময়না কোন কথা কয় না। স্থির, নিস্তব্ধ, পাথরের মত নিঃস্পলক তাকিয়ে থাকে শুধু। কত প্রশ্ন, কত শত জিজ্ঞাসা যেন তার সেই অপলক চাহনিতে। যেন ময়না বলতে চাইছে, “মানুষ গুইল্যান এত ফাষান ক্যান? খুব বেশি কিছুতো চাই নাই আমি। দুই বেলা দুই মুঠ পানি পাস্তা, মায়ের গতরের ওম আর টকটক, ঘামঘাম গন্ধ, নতুন পুরানো যা কিছু হয় একটা কি দুইটা জামা, আর মাস্টারনি আফার দেওয়া সেই বইডা সুর কইরা পড়া- অ আ ই উ – – -। দুইন্যার মানুষ গুইল্যান আমারে এসবের কিছুই দেয় নাই। মানুষ গুইল্যান এত ফাষান ক্যা”?
ময়নার সেই অব্যক্ত প্রশ্নগুলো বুঝতে পারেনা হামিদাবানু। হামিদাবানুরা এতসব বুঝতেও চায় না।
টরন্টো
mkhan1969@yahoo.com

শেয়ার করুন