ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং বঙ্গবন্ধু

43

আকতার হোসেন
বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের অঙ্গনে ভাস্কর্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে মাত্র কিছুদিন আগে দেশ জুড়ে এক ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সেটা কেটে উঠতে না উঠতেই আবার সেই সুপ্রিমকোর্টের একটি রায় এবং সেই রায়ের কিছু অভজারভেশন বা পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশ এখন উত্তপ্ত। অনেকে বলছে বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংকট চলছে। পরপর দুটি উত্তেজনায় সরকার এবং সুপ্রিমকোর্ট কেন মুখোমুখি সেটা অনেককে অবাক করেছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল যদি সরকার মেনে নিতে না চায় তবে সেই বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে নতুনভাবে তা উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিংবা ইচ্ছে করলে সরকার গণভোট দিয়ে দেশবাসীর মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত বিতর্কিত মন্তব্যের বেশিরভাগ অংশ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবেলা করার কথা। হয়তো অনেক ঝুট ঝামেলা আছে তবে এগুলো নিয়ে আইন বিভাগ, সরকারি দপ্তর, আইন বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত পরামর্শ এবং কোর্ট আর্গুমেন্টের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যারা আইন বিশেষজ্ঞ নন কিংবা আইন বিষয় অভিজ্ঞতা রাখেন না অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষ তারাও কেন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় তথা রায়ের অংশবিশেষ নিয়ে মতামত দিচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এর মূল কারণ সম্ভবত এই রায়ে কিছু কিছু কথা বলা হয়েছে যা অনেকেই মনে করছেন অপ্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রত্যাশিত। আবার কেউ কেউ মনে করছে দেশের শাসন ব্যবস্থা এবং সংসদ সহ কিছু কিছু বিষয়ে বিচারপতিরা নন কনফিডেন্স বা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাতেও অসুবিধা ছিল না কেননা আইনি ব্যাপারগুলো নিয়ে আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাই আলোচনা সমালোচনা প্রতিবাদ করে থাকেন। তারাই সমাধানের রাস্তা বের করে দেন। কথা হলো প্রতিবাদের ঝড়ে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে কেন এত উত্তেজনা। যে উত্তেজনায় দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা এখন মুখোমুখি সে বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
শোনা যাচ্ছে সরকার ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। এটাই স্বাভাবিক পদ্ধতি ও উত্তম ব্যবস্থা। তবে অস্বাভাবিক হচ্ছে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হয় সরকারকে কিছুটা কৌশলী হতে হবে, না হয় বিচার বিভাগকে পুনরায় কলম ধরতে হবে। উত্তেজনা এতোটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে পরিস্থিতি শান্ত করতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না পদ্ধতি খোঁজা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালত যদি রায়ের কিছু অংশ বাতিল করতে রাজি না হয় অথবা রায় অপরিবর্তিত রাখতে চায় তবে কায়দা করে যেন কিছু অংশ সংযোজনা কিংবা পরিবর্ধন করে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটা রূপ দেয়ার চেষ্টা করা।
আমি মনে করি সবকিছুর আগে সরকার পক্ষের উচিৎ হবে মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া তিনি তাঁর অভজারভেশনে ‘মেইড’ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন। “ঘড় হধঃরড়হ – হড় পড়ঁহঃৎু রং সধফব ড়ভ ড়ৎ নু ড়হব ঢ়বৎংড়হ. প্রধান বিচারপতি ‘ক্রিয়েট’ বা ‘বিল্ড’ এই সমস্ত শব্দ ব্যাবহার না করে কেন ‘মেইড’ ব্যাবহার করলেন সেই ব্যাখ্যা তিনি নিজেই ভাল দিতে পারবেন। তাঁর এই ‘মেইড’ মানে কি লিড বা নেতৃত্ব দেয়া বা উদ্বুদ্ধ করাকে তিনি বুঝিয়েছেন? তাহলে তো সমস্যা মিটবার কোন আশাই থাকবে না। যাইহোক এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার কথা হচ্ছে সবচাইতে বিতর্কিত অংশটুকুতে নতুন একটি শব্দ ব্যবহার করে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। যেমন উপরের কথাটি কি এই ভাবে বলা যায়? “ঘড় হধঃরড়হ – হড় পড়ঁহঃৎু রং ‘বাবৎ’ সধফব ড়ভ ড়ৎ নু ড়হব ঢ়বৎংড়হ. শুধু ‘এভার’ লাগিয়ে হয়তো প্রধান বিচারপতির চিন্তা বা উক্তিকে সার্বজনীন রূপ দেয়া সম্ভব। আর যদি তিনি বা সুপ্রিমকোর্ট এই ‘এভার’ বা এই জাতীয় কোন শব্দ যোগ করতে আপত্তি করেন তবে বুঝতে হবে, যে বা যারা বলছেন এই বাক্যে ‘ওয়ান পরশন’ মানে বঙ্গবন্ধুকে বোঝানো হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর একক প্রচেষ্টার সুফলকে অস্বীকার করার প্রবণতা, তবে সেই ধারণাই সত্য হয়ে দাঁড়াবে।
বলে রাখা ভাল যে একটি মাত্র শব্দ ‘এভার’ জুড়ে দিলে বাক্যটির কোন আমূল পরিবর্তন হবে না, মানে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যা বলতে চেয়েছেন তা সেই ‘এভার’ লাগালেও যা না লাগালেও তাই থেকে যাবে বলে যারা মনে করেন তাদের সাথে কিছুটা দ্বিমত রেখেই বলছি এতে বাক্যটি লেখার ভাব না বদলালেও লেখকের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যাবে। কেননা নো ন্যাশন, নো কান্ট্রির পাশে ‘এভার’ বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে ‘কখনো’ যোগ করলে যুগের পরিধি এবং ইতিহাসের রূপরেখাতে সর্বকালে সর্ব দেশের প্রেক্ষিতে কথাটা উঠে দাঁড়াবে। ব্যাপারটা এমন যে, কোন দেশ বা জাতি কখনো কারো এককের দ্বারা তৈরি হয় নি। এই কথাটি মেনে নেয়া সহজ এবং তা মেনে নিতে কেউ আপত্তি করবে বলে মনে হয় না। আর যদি শুধু মাত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিচারপতিরা নো ন্যাশন নো কান্ট্রি বলে থাকেন তবে এ তর্ক অনেক দূর যাবে যা দেশ ও জাতির জন্য মোটেই কাম্য নয়।
প্রধান বিচারপতি যদি মনে করেন আমার এখন শেষ সময় এবং যা বলতে চাই তা বলেই যাবো এবং রেফারেন্স হিসাবে সেগুলো লিপিবদ্ধ করে যাব যেমন বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা বাঙালি জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধুর একক কোন কৃতিত্ব নেই। এবং তিনি যদি মনে করেন বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে আমিত্বের অংশটুকু (‘ও’হবংং) তুলে ধরার চেষ্টা তিনি সঠিক ভাবে করেছেন (ওভ বি ধিহঃ ঃড় ঃৎঁষু ষরাব ঁঢ় ঃড় ঃযব ফৎবধস ড়ভ ঝড়হধৎ ইধহমষধ ধং ধফাড়পধঃবফ নু ড়ঁৎ ভধঃযবৎ ড়ভ ঃযব হধঃরড়হ, বি সঁংঃ শববঢ় ড়ঁৎংবষাবং ভৎবব ভৎড়স ঃযরং ংঁরপরফধষ ধসনরঃরড়হ ধহফ ধফফরপঃরড়হ ড়ভ ‘ও’হবংং) সেটাও কিন্তু আমাদের মত সাধারণ মানুষের ভেতর প্রশ্নবোধক হয়ে থাকবে। তাহলে বলতে হবে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে ভুল করেছেন অথবা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণে ২০ এর অধিক ‘আমার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যদি ভুল করে না থাকি তাহলে তিনি একই ভাষণে ১৮ বার ‘আমি’ এবং ১২ বার বলেছেন ‘আমাদের’। এমন কি বঙ্গবন্ধুরে অপর ঐতিহাসিক ভাষণ যেটা তিনি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ একই রেসকোর্স ময়দানে দিয়েছিলেন (বিস্ময়ের ব্যাপার হল একই ব্যক্তির দ্বারা একই স্থানে পরপর দুটি ভাষণ পৃথিবীর কোথায়ও ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করে নি, এ এক বিরল ঘটনা) সেখানে তো কিছুক্ষণ পর পর বলেছেন ‘আমি’ ‘আমি’। এই ‘আমি’ যে ব্যক্তিগত আমি না, অনেকের পক্ষ বা সমষ্টিগত আমি সেটা বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থাকলে বিচারপতিদের থাকবে না কেন।? কথাটা পরিষ্কার করার জন্য বা বঙ্গবন্ধু নিজে কখনো এককভাবে যে কোন কিছুর কৃতিত্ব নেন নি সে কথার সমর্থনে তাঁর সেই ১০ জানুয়ারি ভাষণের থেকে কিছু উক্তি তুলে ধরছি। ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরেই তিনি রেসকোর্স ময়দানে ‘আমিত্ব’কে অস্বীকার করেছেন কি ভাবে দেখেন; (১) ‘মুক্তিবাহিনীর যুবকেরা তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর’। পরিষ্কার স্বীকারোক্তি যে নতুন দেশ গড়ার পেছনে দেশের মুক্তিবাহিনীর কত বড় অবদান। তাইতো তিনি জাতির পিতা হয়েও তাদের জানাচ্ছেন সালাম। এমনি ভাবে বলেছেন (২ ) ‘ছাত্র সমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর’। (৩) ‘শ্রমিক সমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর’। (৪) ‘কৃষক সমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর’। (৬) ‘বাংলার হতভাগ্য হিন্দু মুসলমান আমার সালাম গ্রহণ কর’। (৭) ‘আমার কর্মচারীরা, পুলিশ ইপিআর… তোমাদের সকলকে আমি সালাম জানাই’। (৮) ‘আমার সহকর্মীদের আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি যাবার সময় যে কথা বলেছিলাম তাঁরা সকলে একজন একজন করে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে মুজিব ভাই বলে গেছে তোমরা সংগ্রাম কর, তোমরা স্বাধীন কর। তোমরা জান দাও, বাংলার মানুষকে মুক্ত কর আমার জন্য চিন্তা করো না। আমার সহকর্মীরা তোমাদের আমি মোবারকবাদ জানাই’।  (৯) মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের সাহায্যের জন্য ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তিনি বলেন; ‘আমি আমার সাত কোটি দুখী বাঙালির পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধিকে তাঁর সরকারকে ভারতের জনসাধারণকে মোবারক বাদ জানাই’। এই পর্যায়ে তিনি দেশের সমস্ত জনসাধারণের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। (১০) এছাড়াও যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের অপরাধ নিয়ে সেদিন তিনি বলেছিলেন; ‘একটা জিনিস আমি বলতে চাই “তোমাদের এপ্রুভাল নিয়ে আমার সহকর্মীরা”, ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে- জাতিসঙ্ঘের তত্বাবধানে অথবা ওয়ার্ল্ড জুরিসডিকশনের পক্ষ থেকে একটা ইনকোয়ারি হতে হবে। কি পাশবিক অত্যাচার, কি অন্যায় ভাবে আমাদের হত্যা করা হয়েছে এ সত্য দুনিয়ার মানুষদের জানাতে হবে’। এখানে উল্লেখ্য যে জনতার সামনে পাবলিক মিটিং বঙ্গবন্ধু তাঁর সহকর্মী বা দলের নেতাদের বলছেন তোমাদের এপ্রুভাল নিয়ে একটা কথা বলতে চাই।
কাজেই মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর মুখ দিয়ে উচ্চারিত ‘আমি’ মানেই বাংলাদেশে। সেই ‘আমি’ মানেই বাঙালি জাতি। আর বঙ্গবন্ধুকে যখন কেউ ‘ওয়ান পরশন’ হিসেবে সামনে তুলে ধরে তখন তাঁরা বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির কথাই তুলে ধরে। কাজেই প্রধান বিচারপতি হাতে লিখিত ‘ওয়ান পরশন’ যে ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাতে সর্বসাধারণের মনে হতেই পারে তিনি বঙ্গবন্ধুকেই উদ্দেশ্য এবং বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ জাতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। এ কথা সত্য হলে বলতে চাই; কোন ব্যক্তি তাজমহল একা তৈরি করে নি। তেমনি ভাবে একব্যক্তি মাইক্রোসফটের সবগুলো সফটওয়ার বানায় নি, কোন এক ব্যক্তি একা বাংলাদেশের সংসদ ভবন গড়ে তুলে নি। তবুও তাজমহলের কথা এলে সম্রাট শাহজাহানের নাম উচ্চারিত হয়, এভাবেই বিল গেটস মানেই মাইক্রোসফট কিংবা বাংলাদেশের সংসদ ভবন গড়ার কথা উঠলেই লুই কানের কথা উচ্চারিত হয়। সমস্তটাই পিরামিড তবুও মানুষ উপরের চুড়াতেই তাকিয়ে থাকে। সবটাই মসজিদ কিন্তু মানুষ খোঁজে মিনারের অংশটুকু। আবার সমস্তটাই মাটি তবুও গড়নের কারণে তাকে বলা হয় পাহাড়। এই ‘তৈরি’ বা প্রধান বিচারপতি যাকে বলেছেন ‘মেইড’ সেটা যদি বাংলাদেশকে উদ্দেশ্য করে বলে থাকেন, তবে বলবো বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের পিরামিড, তিনি বাংলাদেশ পাহাড়।
আর একটি অভজারবেশনে প্রধান বিচারপতি বলেছেন ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ (ফাদার এর বহুবচন) এই ক্ষেত্রে আমি বলবো এই বাক্যটিও পরিবর্তন করার সুযোগ নিতে হবে বা পরিবর্তনের সুপারিশ করতে হবে। অনেকে বলছে যারা ইংরেজি জানে না তারা শুধাশুধি ফাদার্স এবং ফাদার এর মধ্য পার্থক্যের ভুল ব্যাখ্যা করছে। কেননা ফাদার্স একটি ইংরেজি শব্দ যেখানে অনেকের অংশগ্রহণে একটি দেশ, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় সেখানেই ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বলা হয়।
যেমন আমেরিকার ইতিহাসে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সব চাইতে বেশি। আমি বলবো ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ ইংরেজি শব্দ না। এটা আমেরিকান ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক চুক্তিপত্রের চিত্র। যেখানে জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে কারো মতে পাঁচজন আবার কারো মতে সাতজনের নাম উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন গোত্র বা অঙ্গরাজ্যে বা গোষ্ঠী কিংবা তাদের কাজের পরিধির কারণে আধুনিক গণতান্ত্রিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রক্রিয়া চুক্তিতে এরা স্বীকৃতি পেয়েছে। আমেরিকা একাধিক রাষ্ট্রের ভেতর চুক্তিভিত্তিক একটি দেশ যেখানে সেই চুক্তিতে একাধিক ব্যক্তির স্বাক্ষর বা সম্মতি রয়েছে। যেমন আছে কানাডাতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সমাপ্তি পর্বে এক ব্যক্তি দ্বারা সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং সেই ব্যক্তিটির দ্বারা ভৌগোলিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপরেখা নির্ধারণ ও চিহ্নিত করনের পর সকলের অংশগ্রহণে একটি যুদ্ধের ডাক দেওয়া হয়। এই একই ব্যক্তির ডাকে সাড়া দিয়ে সমস্ত দেশবাসীর অংশগ্রহণে এবং মাত্র একটি যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দেশের নাম বাংলাদেশ। কাজেই এখানে কোন অঙ্গরাজ্য বা গোষ্ঠী কিংবা ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ দলিলের ভিত্তির উপর দাঁড়ানো কোন চুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্রের বাস্তবতার সাথে তুলনীয় নয়। আর তাই স্মরণ করা হয় একাধিক ইট-পাথর সমষ্টির যোগফল সেই পিরামিড বা পাহাড়ের অবদান। সবটাই মাটি তবুও তাকে যেমন বলা হয় পাহাড় তেমন সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় মুক্তি পাওয়া দেশে একজনই ফাদার এবং তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই বাংলাদেশের জাতির পিতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের আলোকে একাধিক ব্যক্তি বা অবস্থার স্বীকৃতি বাংলাদেশের বেলায় প্রযোজ্য নয়। এখানে মাটির কোন অংশকে অস্বীকার করা হচ্ছে না কিন্তু দেখানো হচ্ছে বিশাল এক পাহাড়কে। যদি সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ কথাটা রাখতেই চান তবে যে সংশোধনী এই ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ এর বেলায় গ্রহণ করা যেতে পারে তাহলো মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে উল্লেখ করা। যেমন ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স অব দ্যা লিবারেশন ওয়ার’ অথবা ফাউন্ডিং ফাদারস অব দ্যা বাংলাদেশী হিস্ট্রি, এই জাতীয় কিছু। কিন্তু জাতি বা ন্যাশনের ফাদার বলতে হলে তিনি হবেন বঙ্গবন্ধু। এখানে অন্য কোন মহান রাজনৈতিক ব্যক্তির অবদানকে ছোট করা হচ্ছে না। সেই সমস্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সাফল্য অবদান ত্যাগ ইত্যাদি ইতিহাসে সু-স্পষ্ট ভাবে লিখে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দিতে হবে তবে এদের কাউকে টেনে এনে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ এর স্থানে বসানো ঠিক হবে না।
পৃথিবীর কোন কিছুই চূড়ান্ত নয়, বিশেষ করে উল্লেখিত সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে এখনো আলোচনা বা রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলকে চেষ্টা করতে হবে গ্রহণযোগ্য সমাধান। সেই মেধা, ধৈর্য এবং কৌশল সরকার ও বিচার বিভাগের জানা আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

শেয়ার করুন