সোনালী সেই দিনের কথা

69

সুহেল ইবনে ইসহাক

সিক্ত মাটির সোঁদা গন্ধ গায়ে মেখে সেই শ্যামল প্রান্তরের কানন কুসুম,
দূর্বাঘাস আর শুকনো পল্লবের মর্মর ধ্বনি পদদলিত করে,
শুভ্র কাশবন ছাড়িয়ে অপু-দুর্গার মতো ছুটতে ছুটতে
কালের ভেলায় চড়ে হেঁটে চলেছিলাম এই সবুজ গ্রামে।
এখনো খুঁজে বেড়াই কিশোর বেলার হারিয়ে যাওয়া
এক টুকরা নীল আকাশ,
স্মৃতিময় গ্রামের বন বাদাড়ে মিশে থাকা
দুরন্ত বালক বেলার ছায়া।
কোন অবসন্ন ক্ষণে সুযোগ পেলেই স্মৃতির মধ্যে ডুব দেই।
খুব একাকী কোন এক নিরালা ক্ষণে কিংবা পড়ন্ত বিকেলের
কোন তমসাচ্ছন্ন বেলায় ঘুরে বেড়াই
চেতনার রঙে রাঙানো সবুজ প্রান্তরে,
খোঁজে ফিরি মনের আঙিনায় সযতেœ জমিয়ে রাখা
অতীতের সবুজ হিরন্ময় মূহুর্তগুলোকে,
যেখানে ডুব দিয়ে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারি বিনিদ্র প্রহর,
দীর্ঘ রজনী।
মা শুটকীবর্তা, পিঠে, কোর্মা, পোলাও রান্না করে
আহারদান করিয়ে কী যে আনন্দ পেতেন!
সেটাই হয়ে রইলো সমুদয় জীবনের সম্পদ।
বাসুদেব বাড়ির রথমেলা থেকে বাবার কিনে দেয়া বাঁশের বাঁশি, মাটির ঘোড়া,
আটকোটার বনে ঘুঘুরছানা খুঁজে ফেরা কত যে উদাস দুপুর
মরীচিকার মোহে হারিয়ে ফেলেছি সেসব হিরন্ময় দিনগুলো,
শৈশবের স্মৃতি আজ কষ্ট নদীজলে নিমজ্জিত।

বইয়ের পাতা উল্টানোর মত করে বার বার ফিরে তাকাই
ফেলে আসা স্বপ্নাতুর পর্বগুলোতে,
দোলতে থাকি স্বপ্নের দোলাচলে।
আর সেই পাতা ঝরা সোনালী দিনগুলি চুপিসারে ঘুম ভাঙ্গানিয়া
গান শুনিয়ে যায় কানের কাছে।
রঙিন-মলিন স্মৃতিমাখা অবাধ স্বাধীনতার অসাধারণ কিছু দিনের কথা,
বাবা-মায়ের আদর-শাসনভরা মুহূর্তগুলো,
ভাই-বোনদের সাথে পড়ার টেবিলে করা খুঁনসুটি,
ছুটি হলেই নানাবাড়ি যাওয়ার তীব্র আনন্দ,
বিস্মৃত নাহত্তয়া শীত সকালের গরম মোয়া,
নানুর হাতের মজার মজার সব পিঠা,
সেকি মধুর সব দিনমান!
নানুর আগলে রাখা কাঠের আলমারিতে
সুযোগ পেলেই উঁকি দিয়ে বিস্কুট চুরির চেষ্টা
আরও কত কী!

সন্ধ্যা রাতে ক্ষেতের আলি ধরে বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যাওয়া,
ভূতের ভয়ে মায়ের গায়ের সাথে সেটিয়ে হাঁটা,
চাঁদনী রাতে উঠোনে বসে তন্ময় হয়ে দাদুর মুখে গল্প শোনা,
উঠোন জুড়ে জোনাকির আলোর নাচন অবাক হয়ে দেখা,
মুঠোবন্দী করার অবিরাম প্রয়াস।
কী নেই সেখানে!
বিকমা ও ছোট গাঙের বুকে বয়ে চলা পানসী,
কচি ধানের শীষে কিংবা ঝিঙে মাচায়
ফড়িঙের ওড়াওড়ি, মনের সুখে ছোট্ট পাখি টুনটুনি’র
এগাছ থেকে ওগাছে লাফালাফি!
ভোর বেলায় পেয়ারাগাছে কাঠবিড়ালীর
সানন্দে হৈচৈ!
ভোরের সবুজ ঘাসের বুকে স্বচ্ছ শিশির বিন্দুর
উপর নরম রোদ পড়ে চিকচিক করে ওঠা
আর কাজীর বাজার, চাতল মাঠ, হদরপুর মাঠসহ
প্রিয় জায়গাগুলোতে বন্ধুদের আড্ডা!
স্মৃতিভাণ্ডারের এমন হাজারো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে বেড়াতে
অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি।
এ যেন এক অন্য জগত!
বুকের সংগোপনে লুকিয়ে রাখা এক অনন্য কল্পলোক,
যেখানে আরেকটিবার ফিরে যাওয়ার জন্য
ব্যাকুল আকুতি সবার, কিন্তু চাইলেই কি সব হয়?
ছোট থাকতে কত ভাবতাম,
“ইস্, কবে যে বড় হব!”
সেই ‘বড় হওয়া’ আজ ধ্রæব বটে।
কিন্তু, এই বড় হওয়াই যেন নিয়ে গেল সেই বিমূর্ত প্রহরগুলো।
সময়ে-অসময়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে
জীবনের অবাধ স্বাধীনতার চিন্তাহীন নির্মল এক অধ্যায়।
তাই মাঝে মাঝেই ফিরে তাকাই, ফিরে তাকাতে হয়,
ভাবতে হয় সেই সব দিনের কথা।
কখনোবা ভাবতে ভাবতে ছলছল করে উঠে চোখ,
কখনোবা অকস্মাৎ ফেটে পড়ি হাসিতে।
তবুও সেসব মুহূর্তকে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে ভালোই আছি।
রচনাকাল: ২২ মার্চ, ২০১৮, টরন্টো, কানাডা।

শেয়ার করুন