অনলাইন ডেস্ক : দুই সপ্তাহ আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেওয়ার পরপরই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল। গত মঙ্গলবার তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তেও তিনি বোমা বর্ষণের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেন।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও হরমুজ প্রণালিসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। গতকাল বুধবার তিনটি পণ্যবাহী জাহাজে গুলির পর দুটি জব্দের কথা জানিয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যা সরু জলপথটি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নিলে তেহরান পুনরায় আলোচনায় বসবে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তাঁর দেশ রাজনৈতিক ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজন হলেই কেবল কূটনৈতিক হাতিয়ারের আশ্রয় নেওয়া হবে।
এর আগে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সংলাপ আয়োজনের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও দুই দেশের কেউই গতকাল সেখানে যাননি। মার্কিন প্রতিনিধি দল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও তেহরানের পক্ষ থেকে অংশ নেওয়ার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় যাত্রা বাতিল করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘ইরানের শাসকদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হওয়ায় তারা আলোচনায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।’ বিষয়টি নিয়ে গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ইরান সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি ট্রাম্পের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প অসমর্থিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এমন দাবি করেছেন। বরং নিজের প্রয়োজনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন।
ফুয়াদ ইজাদি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের আওতায় ৬০ দিনের ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ থাকে। অর্থাৎ এ সময়ের অতিরিক্ত দিন কোথাও সেনা মোতায়েন রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হয়। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এ ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবে আগামী সপ্তাহে। মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে কংগ্রেসে নতুন করে ভোটাভুটি হলে অনুমোদন না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এর আগেরবার ইরান যুদ্ধের বিষয়টি মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পাস হয়েছিল।
কেন অনির্দিষ্ট মেয়াদ
ইরানের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা ঠিক করতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অংশ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বৈঠকের পর ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে এই মেয়াদ কতদিন চলবে, তা উল্লেখ করেননি। শুধু লেখেন, ‘আলোচনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলো।’
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের ধারণা, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে ইরানের ওপর চাপ কমে যাবে। তখন তারা আলোচনা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেতে পারে। একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, খুব শিগগির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকদের বসার একটি সম্ভাবনা আছে। তবে সেটা কবে, তা নিশ্চিত নয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের আলোচনায় ফেরার সংকেত পাওয়া গেলে ফের পাকিস্তান সফরের ব্যবস্থা করা সম্ভব। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তারা আশা করছেন, দুই দেশ দ্রুতই একটি সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহ দেখাবে।
তবে ইরানি কর্মকর্তাদের কণ্ঠে এখনও পরিবর্তনের কোনো সুর শোনা যায়নি। তাদের প্রতিনিধি দলের প্রধান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মাহদী মোহাম্মদী বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণার কোনো মূল্য নেই। পরাজিত পক্ষ কোনো শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। অবরোধ জারি রাখা আর বোমাবর্ষণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর জবাব অবশ্যই সামরিকভাবে দেওয়া হবে।
ইরান কেন সাড়া দেয়নি
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের বৈঠক চলার সময়ই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ফোন করা হয়েছিল। তাঁকে অনুরোধ করা হয়, মার্কিন প্রতিনিধি দল রওনা দেওয়ার আগেই ইরান যেন অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেহরান থেকে সাড়া মেলেনি।
তিনটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে থেকে পাওয়া বার্তার ওপর ভিত্তি করে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ধারণা জন্মেছে। সেটি হলো, ইরানিদের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ার একটি প্রধান কারণ বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যকার বিভেদ। বিশেষ করে মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে আলোচনায় দরকষাকষির জন্য তারা মধ্যস্থতাকারীদের কতটা ক্ষমতা দেবে– তা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী, এই জটিলতার অনেকটা কেন্দ্রে আছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তাঁর অন্তরালে থাকার প্রচেষ্টা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধারণার বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্টেও ফুটে উঠেছে। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন– ইরানের সরকার ‘মারাত্মকভাবে বিভক্ত’।
আলজাজিরা জানায়, ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় বলেছে, তাদের নেতৃত্বে কোনো বিভাজন নেই। শত্রুরা রাজনৈতিক অপপ্রচার শুরু করেছে। ইরানের বর্তমান ঐক্য ‘নজিরবিহীন’ ও ‘উদাহরণ সৃষ্টিকারী’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
তবে ইরান যে আলোচনায় অংশ নেবে না– সে ঘোষণা তারা দুদিন আগেই দিয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছিলেন, হুমকির পরিবেশের মধ্যে তেহরান কোনো আলোচনা মেনে নেবে না। আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইরান প্রতিনিধি দল পাঠাবে না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ, হুমকি ও ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘প্রকৃত আলোচনা’র প্রধান বাধা। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান ‘সংলাপ ও চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখবে’। তিনি বলেন, ‘সারাবিশ্ব আপনাদের অন্তহীন ভণ্ডামিপূর্ণ বাগাড়ম্বর এবং দাবি ও কাজের মধ্যকার বৈপরীত্য দেখছে।’
বিবিসি জানায়, তাঁর এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার ঘোষণা করেন, তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবেন, কিন্তু ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
হরমুজে জাহাজ জব্দ
পারস্য উপসাগরে গত রোববার তুসকা নামে ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করে মার্কিন নৌবাহিনী। এর জবাবে গতকাল দুটি জাহাজ জব্দ করেছে আইআরজিসি। এগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের বরাত দিয়ে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ করা দুটিসহ অন্তত তিনটি জাহাজ লক্ষ্য করে আইআরজিসি গুলি ছোড়ে। এগুলোর মধ্যে দুটি পানামা ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, এগুলোর সর্বশেষ অবস্থান ছিল হরমুজ প্রণালির ইরান উপকূলের কাছে। তৃতীয় জাহাজটির অবস্থান ছিল ইরান উপকূল থেকে আট নটিক্যাল মাইল দূরে।
ইরানে অস্ত্র সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা
ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে গত মঙ্গলবার ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়। ইরানে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করার অভিযোগে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আলজাজিরা জানায়, সংঘাত বন্ধে বড় ধরনের ছাড় পেতে ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর যে কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়েছেন, এ নিষেধাজ্ঞা তারই অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় ‘হুমকি ও প্রতিশ্রুতি’ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে আলজাজিরা এ খবর জানায়। লাভরভ বলেন, ‘আমরা ইরানের অবস্থান বুঝতে পারছি। তারা যথার্থভাবেই বলছে, তারা আগেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়েছে।’






