মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, জীবনের সেরা অর্জন : সাইফুল আলম চৌধুরি

0
29

মোশাররফ হোসেন, টরন্টো : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, রোববার, তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানে রব উঠল চল চল, ঢাকা চল …। লক্ষ লক্ষ জনতা বাঁশের লাঠি আর ব্যানার সহকারে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উপস্থিত হয়ে শ্লোগান তুললো, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা …। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর …। তুিম কে, আমি কে, বাঙালি … বাঙালি…।

ঠিক এরকম একটি অবস্থায় মঞ্চে উঠে সাড়ে আঠারো মিনিট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একক বক্তা হিসেবে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। আজি হতে ৪৯ বছর আগে তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জয় বাংলা …। এই ভাষণ সেদিন আামার রক্তে প্রলয় নাচন সৃষ্টি করেছিল।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর উক্ত ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারা আমার জীবনের সেরা অর্জন। এজন্য আমি গর্বিত।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল আলম চৌধুরি একান্ত সাক্ষাতে উক্ত কথা বলেন। এ বীর মুক্তিযোদ্ধা কানাডার অন্টারিও স্টেটের বোমেন ভিলে পুত্র শাকিল ও পরিবারসহ বসবাস করেন। কন্যা সারাহ রয়েছেন একই এলাকায়। তিনি ১৯৯১ সালে নিউইয়র্কে আসেন। ১৯৯৮ সাল থেকে কানাডায় রয়েছেন।
যুদ্ধযাত্রা : ১৯৬৮ সাল থেকে ছাত্রলীগ করতাম। একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বদেশ গোষ্ঠীর একজন সক্রিয় কর্মী ছিলাম। চট্টগ্রাম কলেজের বন্ধু রবিউল আলম কচি, কামরুল ইসলাম, ফখরুল আহসান মনি, বোরহান আহমেদ মিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও চট্টগ্রাম কলেজ ও শহরের মহান একুশের অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নিতাম। তখন থেকেই আমাদের মধ্যে সংগ্রামি চেতনাবোধ জাগ্রত ছিল। উল্লেখিত সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে চট্টগাম কলেজ মিলনায়তনে কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমেদের পরিচালনায় লেডি গ্রেগরির নাটক ‘রিভার অফ দ্য মুন’ অনুষ্ঠিত হয়। এ নাটকে মমতাজউদ্দিন আহমেদ, আসমা হোসেন, সদরুল পাশা অভিনয় করেন। নাটকটি ছিল সংগ্রামি চেতনার। এ নাটক, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ৭ মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাকে দেশমাতৃকার যুদ্ধে যাবার জন্য উদ্ধুদ্ধ করে। অবশেষে ২৩ মার্চ, ১৯৭১ চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী ট্রেনে কমলগঞ্জের ভানুগাছ পৌঁছে চা বাগান, ধলই চাগান, কুরমা, পাত্রখলা চা বাগানে এপ্রিল মাস পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সংগ্রাম পরিষদের অধীনে যুদ্ধে যাবার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এসময় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী চম্পা রায়। সেখান থেকে বিলোনিয়ার পরশুরামে নানাবাড়িতে পৌছে যাই। এখানে কয়েকসপ্তাহ থেকে জুলাই মাসে রামগড় সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলার সাব্রæমের হরিনা মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ শিবিরে রিপোর্ট করি। সঙ্গী ছিলেন বড়ভাই লতিফুল আলম।

অতপর ত্রিপুরার আমবাসা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইকো কোম্পানীর অধীনে অস্ত্রচালনার কলাকৌশল বিষয়ে পুর্ণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিন আহমেদ ছিলেন আমাদের কমান্ডিং অফিসার। এই রেজিমেন্টে ছিলেন ক্যাপ্টেন কাইয়ুম চৌধুরি, ক্যাপ্টেন বজলুল গনি পাটওয়ারি, ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন, ক্যাপ্টেন ওয়াককার হাসান বীর প্রতীক, ক্যাপ্টেন শহীদ মাহবুবুর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানসহ অনধিক এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা।

সম্মুখ যুদ্ধ : আসামের করিমগঞ্জ সীমান্ত অতিক্রম করে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইকো কোম্পানী একাত্তুরের নভেম্বর মাসে সিলেটের জকিগঞ্জ এলাকার ধলই চা বাগান যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে আমরা অক্ষত থাকলেও বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান শহীদ হন।
এতে নেতৃত্ব দেন ইকো কোম্পানী কমান্ডার ক্যাপ্টেন কাইয়ুম চৌধুরি। এরপর আমাদের কোম্পানী একে একে জকিগঞ্জের আটগ্রাম, চারগ্রাম, গৌরিপুর, কানাইরঘাট, সিলেট এমসি কলেজ যুদ্ধশেষে সিলেট শহর মুক্ত করে ১৭ ডিসেম্বর। গৌরিপুরের যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বীর উত্তম।

অস্ত্র সমর্পন : ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ আমাদের কোম্পানীর সুবেদার মেজর আবদুল মজিদ মিয়া বীর বিক্রমের কাছে যুদ্ধে ব্যবহার করা আমার চাইনিজ রাইফেলটি জমা দিয়ে ফিরে আসি সদ্য মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম আমার শহর বীর চট্টলায়। যেখানে উড়ছিল আমাদের অর্জিত লাল সবুজ পতাকা। যার মধ্যে ছিল আমাদের দেশের মানচিত্র।
সর্বত্র চলছিল বিজয়োল্লাস। আর বাজছিল ‘আমার সোনার বাংলা … আমি তোমায় ভালোবাসি …, জাতীয় সঙ্গীত। দেখা হলে সকলে বলতেন, জয় বাংলা। বিধ্বস্ত ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামও তখন জেগে ছিল দিনরাত। ১৯৭২ সালে আমি ফিরে যাই চট্টগ্রাম কলেজে। পড়াশোনা শুরু করি।

পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি চট্টগ্রামসহ আমাদের প্রিয় দেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ দীর্ঘ ৪৯ বছরে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে দেখে আমি অভিভূত। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্বনেত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here