অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যেই পেট্রোলের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাজ্যের গৃহস্থালির হিটিং বিলও (ঘর গরম রাখার খরচ) যে বাড়বে তা প্রায় নিশ্চিত। খবর বিবিসি

তবে এই সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানির ওপরই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক, গ্যাস এবং বিভিন্ন পণ্য যা আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের অংশ, সেগুলোও সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে।

বিবিসি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খাদ্য থেকে শুরু করে স্মার্টফোন এবং ওষুধ— সবকিছুর দামই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করত, এখন সেখানে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে।

তেল ও গ্যাস থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পাওয়া যায় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো প্রচুর পরিমাণে এটি রপ্তানি করে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো সার, যা বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার—যেমন ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া এবং ফসফেট—সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারাপার হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য দেখাচ্ছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে এই জলপথ দিয়ে সার জাতীয় পণ্যের রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত ধসে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সারের এই ঘাটতি কৃষি উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ উত্তর গোলার্ধে মার্চ এবং এপ্রিল মাস হলো বীজ বপনের মৌসুম। এই সময়ে কৃষকরা পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করতে না পারলে বছরের শেষ দিকে ফলন ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, অল্প সময়ের জন্য এই পথ বন্ধ থাকলেও তা পুরো একটি চাষের মৌসুম ব্যাহত করতে পারে, যার খাদ্য নিরাপত্তা জনিত প্রভাব পথটি পুনরায় খোলার অনেক পরেও স্থায়ী হতে পারে।

ইনস্টিটিউটটির অনুমান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল ও সবজির দাম ৫.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। খাদ্যদ্রব্যের সার্বিক দাম বাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে জাম্বিয়া (৩১ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা (১৫ শতাংশ), তাইওয়ান (১২ শতাংশ) এবং পাকিস্তান (১১ শতাংশ)।

রাশিয়া সাধারণত বিশ্বের ২০ শতাংশ সার সরবরাহ করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘাটতি মেটাতে ভ্লাদিমির পুতিন উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন।

হিলিয়াম (মাইক্রোচিপ)
বিশ্বের মোট হিলিয়াম গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ আসে কাতার থেকে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের একটি উপজাত (Byproduct) এবং এটি সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই ওয়েফারগুলো থেকেই কম্পিউটার, যানবাহন এবং গৃহস্থালির যন্ত্রপাতির মাইক্রোচিপ তৈরি করা হয়।

এছাড়া, হাসপাতালের এমআরআই (MRI) স্ক্যানারে ব্যবহৃত চুম্বককে ঠান্ডা রাখতেও হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়। কাতারের বিশাল রাস-লাফান প্ল্যান্ট, যা এই গ্যাস উৎপাদন করে, ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কাতার সরকার সতর্ক করেছে যে, এই ক্ষতি মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করেছিল যে, বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। এর ফলে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত সব ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেট্রোকেমিক্যাল ডেরিভেটিভস (ওষুধ)
পেট্রোকেমিক্যাল থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন উপাদান— যেমন মিথানল এবং ইথিলিন— ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিনের মতো ওষুধ তৈরির অপরিহার্য কাঁচামাল।

উপসাগরীয় দেশগুলো (সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন) বিশ্বের মোট পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা মূলত হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করেই এই রাসায়নিকগুলো রপ্তানি করে, যার অর্ধেক যায় এশিয়ায়।

ভারত বিশ্বের জেনেরিক ওষুধের রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদন করে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হয়। এই ওষুধগুলোর অনেকগুলোই সাধারণত দুবাইয়ের মতো উপসাগরীয় বিমানবন্দরগুলো দিয়ে আকাশপথে পরিবহন করা হয়, যা বর্তমানে যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সালফার (ধাতু/ব্যাটারি)
সালফার হলো অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের আরেকটি উপজাত। সমুদ্রপথে বিশ্বের মোট সালফার বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়।

কৃষি সারের পাশাপাশি এটি ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালফার থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করা হয়, যা কপার, কোবাল্ট, নিকেল এবং লিথিয়াম উত্তোলনে ব্যবহৃত হয়। এই সবকটি ধাতুই ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়— যা ইলেকট্রিক গাড়ি থেকে শুরু করে ড্রোনের মতো সামরিক হার্ডওয়্যারে ব্যবহৃত হয়।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, সালফার সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ব্যাটারিচালিত সকল পণ্যের দাম ভোক্তাদের জন্য বেড়ে যাবে।