‘হে মহাজীবন’! এক অনুপম জীবনালেখ্য!

0
51

ঋতু মীর
এক গভীর মনোযোগে দৃষ্টি আটকে থাকে বইয়ের প্রচ্ছদে, শিরোনামে। জনশুন্য প্রান্তরের পথে ত্রিশূল হাতে এক সন্ন্যাসী, গন্তব্য তাঁর অজানালোকের সত্য সন্ধানে, অথবা কোন অনন্তের পথে, অন্তর্জলী যাত্রায়! ‘হে মহাজীবন’ লেখক আকবর হোসেনের আত্মচেতনার বিশ্লেষণ, আত্মজীবনীমুলক এক উপাখ্যান। ঋতবাক প্রকাশনা, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বইটির ঝকঝকে মুদ্রণ, কাগজের মান ও প্রচ্ছদে পরিমিত রঙের ব্যাবহারে এক রুচিশীল শোভনতা। সহজ সরল ভাষায় লিখিত অসাধারণ এই জীবন আলেখ্য পাঠককে সমৃদ্ধ করে প্রতি অধ্যায়ে, প্রায় প্রতিটি ঘটনায়। জীবনকে নিবিড়ভাবে অনুভব করে নির্মোক এক সন্ন্যাসীর মত জীবন কাহিনীর যে চিত্র তিনি এঁকে গেছেন, তাঁরই মতে, “তা যেন কখনও হীরকখণ্ড, কখনও অশ্রু জল, কখনও বা জলন্ত অঙ্গার”!

বয়সের এই পরিণত প্রান্তে পৌঁছে ছেলেবেলার স্মৃতি, পারিপার্শ্বিকতা এবং জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা সবকিছুই যেন এক গভীর দর্শন বোধে উপস্থাপিত। ব্যাক্তি জীবনের চড়াই-উৎরাই, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, আনন্দ, বেদনার এই কাহিনী এবং এই সাথে দার্শনিক চিন্তা ভাবনার অভাবনীয় যোগসূত্রে সাধারণ গল্পগুলোও যেন অসাধারণ মহিমায় মুল্যবান হয়ে উঠেছে। ভারতীয় সনাতন ধর্ম দর্শনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা ও চেতনা লিপিবদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থে। পাঠক মনের অতল গভীরে যেসব প্রশ্ন উত্তরহীনভাবে ছিল আজ বুঝি তা খুঁজে পেয়েছে অলৌকিক কোন উত্তর। কি এক মন্ত্রবলেই যেন এই কাহিনী অনুভবের গভীর তলদেশ ছুঁয়ে গেছে। লেখনীর কোন উপাদানে মন জুড়ালে পাঠকের হৃদয় এমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে গল্পের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে! কোন ঐশ্বর্যের মনিমুক্তায় গাঁথা এই “আমার” কাহিনী যা পড়তে পড়তে একসময় “আমাদের” কাহিনী হয়ে যায়!

জীবন সায়াহ্নে পেছনে ফেলে আসা সময়ের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, অনুভব আর দৃষ্টির গভীরতায় জীবনকে প্রাণভরে দেখা, নির্ভীক সাহসিকতায় জীবন দর্শনের অমোঘ সত্য উচ্চারণ- “হে মহাজীবন” লেখকের সততার এমনি এক সত্য সুন্দর দলিল। আকবর হোসেনের ভাষায়- “জীবনের একটা বিশেষ সময়ে যখন দিগন্তে হেলান দিয়ে বসবার সময় আসে তখনই হয়তো মানুষ তাঁর নিজের মুখোমুখি সামনে এসে দাঁড়ায়। আনন্দ, বেদনা, জয়, পরাজয়, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ সব কিছুকে তখন নির্মোহ আর নির্বিকার দৃষ্টিতে দেখবার শক্তি আসে”।
১।
“ওগো পথের সাথী, নমি বারম্বার, পথিক জনের লহ লহ নমস্কার”- প্রস্তাবনা পর্বে এই বিনম্র শ্রদ্ধা দিয়ে শুরু করে ছেলেবেলা, বাবা, মা, ভাই, বোন, পারিপার্শ্বিকতা, প্রকৃতি, তিতাস নামের নদী এবং জীবনে নদীর অসামান্য ভ‚মিকাসহ তুলে ধরেছেন হরিহর মাঝী, শঙ্খ ও সমুদ্রের কথা। জন্ম, মৃত্যু, সংসার, ধর্ম, বিশ্বাস, ঈশ্বর, মহাশক্তি, মানুষ, জীবন রহস্য, সম্পর্ক দেশ এবং রাজনীতির মত বিষয়গুলো একের পর এক গ্রন্থিত হয়েছে হৃদয়ের অসামান্য আবেগে, জ্ঞানগর্ভ দার্শনিক চিন্তার বিচক্ষণতায়। অতীতে পরধর্ম সহিষ্ণুতা এবং বর্তমানে ধর্মীয় উন্মাদনার এই প্রলয় সময়, মানবতার বিচ্যুতি, পরম শক্তি, ঈশ্বর, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, আস্তিকতা, নাস্তিকতা, মানব ধর্ম, নিরীশ্বরবাদের মত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন অসীম সাহসিকতায়। মানুষের জন্ম মৃত্যুর দিন ক্ষণ খাতায় লিখে রাখা ললিতমোহন কাকার কাহিনি এবং তাঁর মৃত্যুর পর সেই দিন ক্ষণ আর খাতায় না ওঠার গল্প মনকে আদ্র করে তুলে। দলিল লেখক ক্ষেত্রমোহনের স্বপরিবারে গ্রাম ত্যাগের ঘটনায় লেখক মনে প্রশ্ন- “কি সেই দুর্দম প্রলয়, যা মানুষকে তার বাস্তু ভিটে ত্যাগ করতে বাধ্য করে? মানুষের আজন্মকালের অধিকারকে এক অসুর ধর্মের নির্যাতন সইতে হয়?”- এই অংশে পাঠক মনও যেন এক গর্জন মুখর প্রশ্নে আলোড়িত হয়।

হরিহর মাঝির খেয়াপারাপার প্রসঙ্গে “এ যেন কিছু রেখে, কিছু ফেলে যাওয়ার মত। এ যেন সসীম জীবনকে এক অসীমের ইশারা দেয়”- যা পাঠক মনকে এক উদাসী বাউল চিন্তায় আচ্ছন্ন করে। বিয়ের ঠিক পরের দিনই মিনতি দিদির বৈধব্য কিংবা সুবোধ-প্রভার পরিণতিহীন ভালোবাসা, ফটিক দা, মাবু কাকা, হত দরিদ্র বগা, পাহারাদার লোহা, বন্ধু পান্নালালের মৃত্যু, সদাশিব ও মালতীসহ আরও অনেক সম্পর্কের বর্ণনায় লেখকের আবেগিক অনুভুতির প্রকাশ পাঠক মন ছুঁয়ে যায় নিঃসন্দেহে। তুমি সংসারে থাকো, কিন্তু সংসার যেন তোমাতে না থাকে” অথবা “আমাদের থাকার সময়টা বেঁধে দেওয়া আর না থাকার সময়টা অনন্তকালের হাতে”, কিংবা “আমার যা নেই, তার চেয়ে যা আছে সেটা যে অনেক বেশি এই ভাবটি মেনে নিতে পারলে জীবনের অনেক বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়”, “যে দুঃখ দেখেনি, সে জীবন যাপন করেনি। জীবনের পরতে পরতে বেদনার অনুভব জীবনকে দেখার প্রসারিত দৃষ্টি দেয়, জীবনকে জীবিত রাখতে সাহায্য করে” -এইসব গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তির মধ্যে লেখকের মধ্যে এক নির্মোক দার্শনিক স্বত্বার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। আর সেকারণেই বুঝি তিনি এক ধ্যানমগ্ন ঋষি, নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন- “সত্য জীবন ধারনের এক পরম পন্থা, সত্য দিয়ে জীবন পরিশুদ্ধ হয়। সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ না করা এবং সত্যের ভিতরে থেকেই নির্মোহ জীবন যাপন করা”। মানুষ, সম্পর্ক, ভালোবাসা, ক্ষমা, বেদনা, সুখ, জন্ম, মৃত্যু বিষয়ে লেখকের বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় জ্ঞানের আলোকবার্তা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যেমন- “নিজেকে জানার আগে মানুষকে জানতে হয়। এক একটি মানুষ মহাসাগরে এক একটি নির্জন দ্বীপ যেন। জীবনের অন্তবিহীন গর্জনের মাঝে পলে পলে সে তৈরি হয়। সে কোটি মানুষের মাঝে ঘুরে বেড়ায়, অথচ একা”। “মানুষের বেঁচে থাকার পেছনে একটা নীরব নদী আছে, যার তলায় ভাঙ্গাচোরা, মরচে ধরা, পূর্ণ অপূর্ণ কত কিছু যে জমা থাকে”। “মনে হয় এ জগতে সবচেয়ে মহান গল্প মানুষেরই”।

২।
ধর্ম নিয়ে লেখকের অনুভুতির প্রকাশ দ্বিধাহীন, সাহসী, উদার এবং কুসংস্কার মুক্ত। তাঁর মতে- “মানুষ তাঁর মুক্ত চিন্তা আর নির্ভীক চিত্তে যা গ্রহণ করে, তাই তাঁর ধর্ম। প্রতিদিন আমরা যেভাবে জীবন যাপন করি, তাই আমাদের ধর্ম। মানুষ যখন ন্যায়, সত্য আর জ্ঞানকে ত্যাগ করে তখনি সে ধর্মচ্যুত হয়। ঈশ্বর কিভাবে কোথায় আছেন, তাঁর অনুভব জ্ঞানের স্তরের উপর নির্ভরশীল। কেউ ভাবে তিনি আছেন। কেউ আবার পরীক্ষা করে দেখতে চান। দ্বিতীয় ভাবটি উত্তম, কারণ সেখানে জ্ঞান কাজ করে। মানুষের জ্ঞানের একটি আনন্দদায়ক বলয় আছে, যাকে বলা হয় উদারতা। জ্ঞান সবার কাছেই আসে, তবে যিনি এই উদারতায় বিশ্বাস রাখেন, তাঁর কাছে সে ধরা দেয়। আবার- সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে একটি স্তর আছে, যার নাম দ্বিধা। এই স্তরটি পার হয়ে গেলে আমাদের জীবন সরল আর সহজ হয়। ঈশ্বর লাভের সাধনা নিজেকে জ্ঞানের এক অতি উচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার সাধনা। তুমি নিজেকে জানো তাহলেই পরম স্বত্বাকে জানতে পারবে (উপনিষদ)”। ধর্ম বিষয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য রাখা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের পরিবর্তে তিনি মানুষের অন্তর্জাত অনুভুতিকে সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন।

বোধগম্যতার এক উচ্চ মার্গে পৌঁছেই আকবর হোসেন কবি এবং কবিতাকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে- শব্দাবলী কাব্য নয়, শব্দের মাঝখানে যে নীরবতা, সেটা কাব্য। কবিতার মর্ম শব্দাবলীতে নয়, শব্দের পেছনে যে নিগুঢ় নীরবতা, সেখানেই। ‘হে মহাজীবন’ বইয়ে বিভিন্ন ভাষার কবিতার অনুবাদকৃত পংতি, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বরেণ্য কবিদের কথা খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে। লেখকের মতে- কবি জীবনানন্দ দাস তাঁর চোখে এক নির্মোক সন্ন্যাসী যিনি বেদনার অগ্নিকুণ্ডের মাঝেও শিশিরের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। এক দিগন্তপ্রসারী কবি রবীন্দ্রনাথ যিনি প্রেমে, ভালোবাসায়, আনন্দ, বেদনায়, শোকে, দুঃখে, সুরে, সংগীতে, কাছের, দূরের সব কিছুকে এক ভাবনার মালায় গাঁথতে পেরেছেন।
সুপ্রিয় পাঠক! নিরন্তর শুভ কামনা অথবা অলিখিত এক অধিকারবোধের তাড়না থেকেই “হে মহাজীবন” বইয়ের সামান্য কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরা হোল। যেহেতু বইটি বিভিন্ন অধ্যায়ে উপ-শিরোনামসহ উপস্থাপিত হয়েছে সেহেতু অধ্যায়গুলো পৃষ্ঠা নম্বরসহ সূচিপত্রে বিন্যস্ত হলে পাঠক উপকৃত হতো। “গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মৌলানা আজাদ একজন ভারতের গর্বিত সন্তান ছিলেন” (পৃষ্ঠা-৯০) এখানে “একজন” শব্দটি “ভারতের” এই শব্দের পরে আসাই বাঞ্ছনীয়। “আমাদের এখানে পাতা ঝরার সময় এসেছে” (পৃষ্ঠা- ৯১) বলদা গার্ডেন প্রসঙ্গে লেখক আসলে কোন স্থানের পাতা ঝরার উল্লেখ করেছেন তা স্পষ্ট নয়। পরিশেষে, যদিও যুক্তি কখনোই আবেগের কাছে পরাভূত নয়- এই উক্তি শিরোধার্য করেই আকবর হোসেন পথ দেখিয়ে গেছেন, তবুও নানা ঘটনার উল্লেখে মাঝে মাঝে আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশকে পাঠকের কাছে বাহুল্য মনে হতে পারে । এক্ষেত্রে “যুক্তিতে মুক্তি”- পাঠকের এই ভাবনায় দ্ব›দ্ব তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।

পাঠক! পাঠে আমার অনাবিল আনন্দ! “হে মহাজীবন” বইটি আমার ভাবনার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে, সমৃদ্ধ হয়েছি জীবন দর্শনের সুক্ষ, জ্ঞানগর্ভ আলোচনায়। লেখনীর প্রতি স্তরেই যত্ন, বাণিজ্যিক প্রবণতাহীন প্রকাশে পাঠকের প্রতি লেখকের এক সুক্ষ দায়িত্ববোধ, সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ মেলে। কালের নিরন্তর প্রবাহে কালজয়ী হয়ে “হে মহাজীবন” পাঠক সমাদৃত হয়ে যথাযোগ্য স্থানটি করে নিতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here