অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত বিভিন্ন দেশের শত শত টন স্বর্ণ নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে নীরব অথচ অত্যন্ত সংবেদনশীল এক ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত বিভিন্ন দেশের শত শত টন স্বর্ণ নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ইউরোপের প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, রাজনীতিকদের মন্তব্য এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে এই দাবি এখন আর প্রান্তিক কোনো ভাবনা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আর্থিক নেতৃত্বের জন্য একটি নতুন শঙ্কার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্বের বহু দেশ ঐতিহাসিক কারণেই তাদের নিজস্ব স্বর্ণের রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রে রেখেছে। নিউইয়র্ক ফেড দীর্ঘদিন ধরে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ভল্ট’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত হুমকি, ইউরোপে যুদ্ধের আশঙ্কা কিংবা নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা-এসব কারণেই জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডসসহ বহু দেশ তাদের স্বর্ণ ওয়াশিংটনে স্থানান্তর করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরছে।

বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থানের অনিশ্চয়তা এই বিতর্ককে তীব্রতর করেছে। জার্মান অর্থনীতিবিদরা প্রকাশ্যে বলছেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রেখে দেয়া ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। শুধু জার্মানি নয়-অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ডেও নিজেদের স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে। এর আগে ভেনেজুয়েলা ও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ভল্ট থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে।

বিশ্বের অনেক বড় অর্থনৈতিক শক্তিরই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে বা অন্য নিরাপদ বিদেশি স্থানে রাখা আছে। জার্মানির প্রায় ৩ হাজার ৩৫২ টন স্বর্ণ নিউইয়র্কে রিজার্ভে রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ২২–২৩ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। দেশটির একটি বড় অংশই বিদেশি ভল্টে রাখা আছে। ইতালির প্রায় ২,৪৫২ টন, ফ্রান্সের ২,৪৩৭ টন, রাশিয়া ২,৩৩০ টন এবং চীনের ২,২৮০ টনের মত স্বর্ণ ফেডে রয়েছে। এগুলোর মূল্য স্বর্ণের বর্তমান বাজার দামে শত বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে। ভারত-এর রিজার্ভও প্রায় ৮৭৬ টন, যার মূল্যও প্রায় ৫০–৬০ বিলিয়ন ডলারের মতো। এই স্বর্ণগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ব্যাংক অফ নিউইয়র্ক/ফেডেরাল রিজার্ভ ভল্ট এবং বিশ্বের নানা নিরাপদ স্থানে জমা রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, বিশ্বব্যাপী সরকারি স্বর্ণ রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার টনেরও বেশি, যার বাজার মূল্য হাজার বিলিয়ন ডলারের উপর। এটি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

এদিকে স্বর্ণ সরিয়ে নেয়ার এই প্রবণতা যদি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকট তৈরি করবে না ঠিকই, কিন্তু এর প্রতীকী ও কাঠামোগত প্রভাব হবে গভীর। প্রথমত, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ (সেফ হ্যাভেন) ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশগুলো যখন বলে—‘আমাদের স্বর্ণ আমরা নিজের চোখের সামনে রাখতে চাই’-তখন সেটি মূলত ওয়াশিংটনের ওপর আস্থার ঘাটতির সুস্পষ্ট প্রকাশ।

দ্বিতীয়ত, ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য দীর্ঘমেয়াদে আরো বেশি চাপে পড়তে পারে। স্বর্ণ আর ডলার সরাসরি একই সূত্রে বাঁধা না হলেও, বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থার ভিত্তি মূলত বিশ্বাসনির্ভর। স্বর্ণ ফিরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি যদি দেশগুলো ডলার রিজার্ভও কমাতে শুরু করে, তাহলে বিকল্প আর্থিক কাঠামো-যেমন ইউরো, ইউয়ান বা স্বর্ণনির্ভর লেনদেন-ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে পারে।

তৃতীয়ত, ফেডারেল রিজার্ভের এক ধরনের ‘অঘোষিত প্রভাবশক্তি’ দ্রুত কমে যাবে। বহু দেশের স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মানে সংকটকালে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় এক ধরনের নীরব প্রভাবক হিসেব কাজ করা। সেই স্বর্ণ সরে গেলে ওয়াশিংটনের দরকষাকষির ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। অর্থনীতিতে অনেক সময় ধারণাই বাস্তবতা তৈরি করে। যদি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত শিরোনাম হতে থাকে-‘দেশের পর দেশ ফেডের ভল্ট থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে’—তাহলে বিনিয়োগকারী, বাজার ও দেশগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়বে।

এ বিষয়ে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্ডেসব্যাংকের সাবেক প্রধান গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ইমানুয়েল মোন্‌খ বলেন, ‘বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা কমাতে চাইলে বুন্ডেসব্যাংকের উচিত স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।’

আইএফও ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ক্লেমেন্স ফুয়েস্ট বলেন, ‘এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলে তা অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এমন পদক্ষেপ বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালার মতো হবে।’

সব মিলিয়ে বলা যায়, ফেডারেল রিজার্ভ থেকে স্বর্ণ প্রত্যাহারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ডেকে আনবে না, কিন্তু এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলের একটি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে। এই দাবি যত বাড়বে, ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ততই প্রশ্নের মুখে পড়বে।