অনলাইন ডেস্ক : সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জ¦লছে গোটা ইরান। ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার লোক নিহত হয়েছেন। এই হিসাব সরকারি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রকৃত হিসাব আরও বেশি। এই বিক্ষোভ শুরুর দিকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ‘উদ্ধার’ করতে আমেরিকা প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান সরকারকে আন্দোলনে বল প্রয়োগে হুশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংন। তবে নিহত দুই হাজারের কোটা ছাড়ালেও ট্রাম্প দেন-দরবারেই ব্যস্ত রয়েছেন। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, ট্রাম্প কী (ইরানে) করতে যাচ্ছেন, তা ট্রাম্প ছাড়া আর কেউ জানে না। তিনি আরও বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্ব।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলা যেমন ট্রাম্পের জন্য সহজ টার্গেট ছিল, ইরান তা নয়। এমনকি তার দুর্বল অবস্থায় এবং সাম্প্রতিক আমেরিকান এবং ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরও ইরান ভেনেজুয়েলা হয়ে যায়নি। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র একটি যুদ্ধ-কঠিন শাসনব্যবস্থা। একক ব্যক্তিত্বকে অপসারণ করলে পুরো দেশ ওয়াশিংটনের ইচ্ছার কাছে নত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এ ছাড়া গাজা যুদ্ধের সময় ইরানে শক্তিশালী বোমা হামলার অভিজ্ঞতাও রয়েছে ট্রাম্পের। অর্থাৎ বিশ্বের শক্তিশালী বোমারু বিমান দিয়েও তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের নিশ্চয়তা পাননি ট্রাম্প। এ কারণেই হয়তো গত রবিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী বিকল্প খুঁজছেন। কিন্তু পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কার্যত সাইবার হামলা অথবা ইরানের কমান্ডো কাঠামাতে মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হানতে চাইছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক থাকা যে কোনো দেশের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, অবিলম্বে এটি কার্যকর করা হবে এবং এই আদেশ চূড়ান্ত। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প হয়তো সামরিক সংঘাত এড়াতে চাইছেন।

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকা কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, ভয়াবহ সহিংসতার চক্র চলতে পারে না। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগচি বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি সামরিক পন্থায় আমাদের পরখ করতে চায়, তা হলে আমরাও তৈরি আছি।

ইরানে চলমান বিক্ষোভ দুই সপ্তাহে গড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইরান সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বিক্ষোভে প্রায় ২ হাজার লোক নিহত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে ওই কর্মকর্তা বলেনÑ বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাকর্মীÑ উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনে দায়ী ‘সন্ত্রাসীরা’। অন্যদিকে অগ্নিগর্ভ এ পরিস্থিতিতে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বেশকিছু বাড়ি থেকে মার্কিন অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের দাবি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এসব অস্ত্র ইরানের ‘সন্ত্রাসী সেলের’ সদস্যদের কাছে ছিল বলে জানিয়েছে ওই গোয়েন্দা সংস্থা। তেহরানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেনÑ সহিংসতা উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘এজেন্ট’ মোতায়েন করেছেÑ যেন

পরবর্তীতে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অজুহাত তৈরি করা যায়। এছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

প্রসঙ্গত, অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত এই দেশব্যাপী বিক্ষোভ ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে শাহকে উৎখাতের পর থেকে ইরানে শাসনকারী ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটিতে পরিণত হয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ অস্থিরতার জন্য বিদেশি হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছে এবং ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী পাল্টা সমাবেশ করেছে। সরকারপন্থি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন খোদ প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। এদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে যে, মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকার তথ্য ঢাকতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা করা হয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে যে, তারা বিক্ষোভের সময় ৬৪৮ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে নয়জন নাবালকও রয়েছে। তবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, মৃতের সংখ্যা সম্ভবত অনেক বেশি। ‘কিছু অনুমান অনুসারে ৬ হাজারেরও বেশি।’ আইএইচআর জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধের ফলে ‘এই প্রতিবেদনগুলো যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন’ হয়ে পড়েছে, আনুমানিক ১০ হাজার জনকে আটক করা হয়েছে।